৪৫তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও বাদ, রাষ্ট্রীয় অনাচারের অভিযোগ, রি–ভেরিফিকেশনের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর

· Prothom Alo

লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার পশ্চিম বেজগ্রাম। গ্রামের আত্মমর্যাদাশীল ও পরিশ্রমী নারী আলেয়া বেগম। কষ্টার্জিত উপার্জনে তিনি তাঁর তিন সন্তানকে শিক্ষিত ও সুনাগরিক করে গড়ে তুলেছেন। বড় মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে সংসারী হয়েছেন, ছোট মেয়ে কলেজে কেবল পা রেখেছে। আর মেজ ছেলে শামীম আল মাহাদী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

Visit turconews.click for more information.

কৃষিকাজের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় বাড়িতে নিজস্ব গরুর খামার গড়ে তোলেন আলেয়া বেগম। এক বছর আগে যখন খবর এল মেজ ছেলে ৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তখন সন্তানকে নিয়ে গর্ব অনুভব করেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, ছেলের মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয়েছে।

বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল

কিন্তু সেই স্বস্তির স্থায়িত্ব বেশি দিন হয়নি। গেজেটের প্রতীক্ষায় কেটে যায় দীর্ঘ ১১টি মাস। অবশেষে ১৪ অক্টোবর রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। পিএসসির সুপারিশ করা ১ হাজার ৮০৭ প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জনের চাকরি নিশ্চিত হলেও বাদ পড়েছেন ১০৫ জন। সেই তালিকা থেকে অন্যায্যভাবে বাদ পড়েছেন আলেয়া বেগমের ছেলে শামীম আল মাহাদী।

ছেলের নাম গেজেটে না দেখে অবাক ও ব্যথিত হয়েছেন এই স্বাবলম্বী নারী। মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরেন আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘সরকার বাহাদুরের যে কেউ এসে আমাদের এলাকা সরেজমিন যাচাই করুক। গ্রামের একটা লোকও যদি আমার ছেলের ব্যাপারে কোনো খারাপ কথা বলতে পারে, তবে তার চাকরি নিয়ে আমার আর কোনো দাবি থাকবে না। ওর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছেও খোঁজ নেওয়া হোক। সবখানে যদি সে নির্দোষ প্রমাণিত হয়, তবে কোনো অন্যায় না করে আমার ছেলে কেন বঞ্চিত হবে?’

রাষ্ট্রের জটিল আইনকানুন বা প্রশাসনিক হিসাব–নিকাশ বোঝেন না এই গ্রামীণ নারী। তবে তিনি চান, সত্যটা সবার সামনে আসুক এবং মেধার ভিত্তিতে অর্জিত অধিকার যেন অন্যায্যভাবে কেড়ে নেওয়া না হয়।

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, অধ্যাপক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য বা আদালতের দণ্ড না থাকলে তাঁকে রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো অজুহাতে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২৪–এর এত বড় ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থান থেকে আমরা তবে কী শিক্ষা নিলাম?সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, বেতন প্রায় দেড় লাখ টাকা

গেজেটে বঞ্চিত প্রার্থীদের প্রতিবাদ ও ‘আত্মাহুতি’র হুমকি

আলেয়া বেগমের ছেলে মাহাদীর মতো এমন গল্প দেশের অনেক মেধাবী প্রার্থীর। প্রার্থীদের ভাষ্য, পিএসসির সব ধাপে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তাঁদের গেজেটভুক্ত করা হয়নি। তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো ফৌজদারি মামলা বা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নেই।

স্বচ্ছ উপায়ে মেধার ভিত্তিতে অর্জিত চাকরি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে রাজপথে নেমেছেন এসব তরুণ। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। অনতিবিলম্বে সম্পূরক গেজেট প্রকাশ করে নিয়োগ নিশ্চিত করা না হলে শাহবাগে ‘আত্মাহুতি’ দেওয়ার চরম ঘোষণা দিয়েছেন বঞ্চনার শিকার প্রার্থীরা।

অবস্থান কর্মসূচিতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে গেজেটবঞ্চিত নূরে আলম বলেন, ‘আমি ৪৪তম বিসিএসে আনসার ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে বর্তমানে সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত আছি। কিন্তু ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নতুন করে সুপারিশ পেলেও এবার আমাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আগের চাকরির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র পেলেও এবার কীভাবে বাদ পড়লাম, সরকারের কাছে সেই ব্যাখ্যা চাই।’

আরেক প্রার্থী মনিরুজ্জামান মৎস্য ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘চার–পাঁচ বছর নিরলস পরিশ্রম করে বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছি। কোনো অপরাধ না করেও কেন আজ এই শাস্তি পেতে হবে? বাবা–মায়ের কাছে কী জবাব দেব, জানি না। আমরা কারও কাছে দয়া চাই না, নিজেদের মেধা দিয়ে অর্জিত চাকরিটি ফেরত চাই।’

প্রার্থীরা সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পুনঃ প্রজ্ঞাপনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, আইনগত বাধা না থাকা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সম্পূরক গেজেট প্রকাশ, বাদ পড়ার কারণ লিখিতভাবে জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রশাসনিক যাচাই–বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীদের তথ্য নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

কী এই পুলিশ ভেরিফিকেশন, শুরু কবে

বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের পর গেজেট প্রকাশের আগে প্রার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের জন্য ভেরিফিকেশন করা হয়। মূলত ব্রিটিশ আমলে ১৯২০–এর দশকে এই প্রথা চালু হয়েছিল। সে সময় ভারতবর্ষজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমন করা এবং চাকরির নিয়োগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয়তা আছে কি না, তা পরীক্ষা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

পুলিশের নীতিমালা অনুযায়ী, ভেরিফিকেশনের সময় প্রার্থীর নামে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি মামলা বা কোনো অপরাধের রেকর্ড রয়েছে কি না, কেবল তা যাচাই করার কথা। কিন্তু শত বছর আগের ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের এই নিয়ম ব্যবহার করে প্রার্থীর স্বজনদের রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক তথ্যের অজুহাতে মেধার নিয়োগ আটকে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

বিসিএসের এই দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভেরিফিকেশনের নামে অসংগতি ও রাজনৈতিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় বিনা মূল্যের অনলাইন কোর্স, যেভাবে আবেদন

‘রাষ্ট্রীয় অনাচার অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সেকেলে ব্রিটিশ আমলের ভেরিফিকেশন প্রথা দিয়ে তরুণদের মেধা ও ভবিষ্যৎ আটকে রাখা একটি বড় ধরনের পদ্ধতিগত ত্রুটি। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য বা আদালতের দণ্ড না থাকলে তাঁকে রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো অজুহাতে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২৪–এর এত বড় ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থান থেকে আমরা তবে কী শিক্ষা নিলাম? আমি বলব, পুরোনো রাজনৈতিক দলীয়করণটি বর্তমানে “বিশ্বাসের দলীয়করণে” রূপান্তরিত হয়েছে। সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তখন কোনো বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি বিরাগভাজন হওয়ার সুযোগ নেই, তা শপথভঙ্গের শামিল। মেধার স্বাক্ষর রাখা প্রার্থীদের ন্যায্য চাকরির নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা একটি “রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত দুর্নীতি”। এই রাষ্ট্রীয় অনাচার অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।’

রি–ভেরিফিকেশনের আশ্বাস জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর

সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াটি একটি নিয়মিত বিষয়, এটি সব সময়ই ছিল। এটি নতুন কিছু নয়। প্রজ্ঞাপনে যাঁদের নাম আসেনি, তাঁদের অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য আইনি নথিপত্রে ঘাটতি থাকার কারণে সাময়িকভাবে তাঁদের নাম বাদ পড়েছে। বাকি যাঁদের নাম আসেনি, তাঁদের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, দেশের একজন নাগরিকও যাতে রাষ্ট্রের আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। তাই বাদ পড়া প্রার্থীদের সব তথ্য পুনর্নিরীক্ষার (রি–ভেরিফিকেশন) উদ্যোগ নেওয়া হবে। আইনি কাঠামোর মধ্যে যাঁরা চাকরির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাঁদের প্রত্যেকেই নিয়োগ পাবেন। আপনারা ইতিপূর্বে ৪৯তম বিসিএসেও দেখেছেন, চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পরও রি–ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি পেয়েছেন।’

Read full story at source