সংসার চালাতে ৪৭% পরিবার ঋণগ্রস্ত, বেশি চাপে গ্রামের মানুষ
· Prothom Alo

জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা।
জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা।
Visit palladian.co.za for more information.
ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে দেশের অর্ধেকের কাছাকাছি পরিবারকে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আয় স্থবির হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিশেষ এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপের তথ্যে উঠে এসেছে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। এর মধ্যে শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলো বেশি চাপে রয়েছে। নবম জাতীয় বেতনকাঠামোর সুপারিশ তৈরির আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই জরিপ করা হয়। জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে জরিপটি করা হয়েছিল গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর।
বিবিএসের দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল ‘জীবনযাত্রার মান জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন তৈরি করে। তার আগে কম্পিউটারের সহায়তায় ডিজিটাল সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিবিএস। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় গ্রাম, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫০টি প্রাথমিক নমুনা এলাকা থেকে মোট ৩ হাজার পরিবারের।
বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে গ্রামাঞ্চলের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। আর পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা।
বিবিএসের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি, ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর শহরাঞ্চলে প্রতি পরিবারের মাসিক ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেমদারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের শ্লথগতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার এই সময়ে বিবিএসের জরিপে উঠে আসা ঋণগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যাটা খুবই উদ্বেগের।জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের অর্ধেক খাবার এবং অর্ধেক খাবারবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। তবে অঞ্চলভেদে এই চিত্র আলাদা। যেমন গ্রামাঞ্চলে খাবারের পেছনে ব্যয় বেশি, আর শহরাঞ্চলে ব্যয় বেশি খাবারবহির্ভূত খাতে। সিটি করপোরেশন এলাকার পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই হয় খাবারবহির্ভূত খাতে।
এদিকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল। বিবিএসের মজুরির সূচক অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তার আগের মাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশায় কম বেতন পাওয়া দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরি পর্যবেক্ষণ করে এই সূচক তৈরি করে বিবিএস।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক চাপের পেছনে প্রধান কারণ চার বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, যা ধারাবাহিকভাবে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্থরতা, শ্রমের চাহিদা দুর্বল থাকা এবং মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় পরিবারের জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই সময়ে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া জ্বালানিসংকটে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। তাতে দেশের শিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার চলতি বছর শেষে বেড়ে সাড়ে ২২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২২ সালের এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে এদেশীয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত শনিবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০২৫ সালে দেশের ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। সংসার চালানোর ঘাটতি মেটাতে পরিবারগুলোকে হয় ঋণ করতে হচ্ছে, নয়তো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।
বিবিএসের জরিপের তথ্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। বিবিএসের জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্বাসযোগ্যই মনে হচ্ছে। একটু ভালো থাকা মানুষেরাও এখন ঋণ করছেন। তবে তার কারণ ভিন্ন।
সেলিম রায়হান বলেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গরিব মানুষেরা ঋণ করেন খাওয়াদাওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচের জন্য। দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের শ্লথগতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার এই সময়ে বিবিএসের জরিপে উঠে আসা ঋণগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যাটা খুবই উদ্বেগের।