পাহাড়ে দুর্গাপূজায় সাঁওতালদের ‘দাসাই’ নাচ, উপহার জমিয়ে দশমীর পর হয় যে আয়োজন
· Prothom Alo

পরনে সাদা ধুতি ও জামা। কানে গুঁজে রাখা হয়েছে ফুল। গান ও মাদলের তালে তালে নাচছেন একদল পুরুষ। নাচ-গান শেষ হতেই তাঁদের ঘিরে থাকা দর্শকদের উচ্ছ্বাস। উপহার হিসেবে পানীয়, টাকা, চালসহ নানা ফলমূল তুলে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের কাছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে পানছড়ির বড় সাঁওতালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এই চিত্র। প্রতিবছরই দুর্গাপূজায় পাড়াটিতে দেখা যায় ‘দাসাই’ নাচের এমন আসর। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নাচ পরিবেশনকারী দলের সদস্যরা জানান, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক উৎসবে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে তাঁরা এই নাচ করেন। তবে এর আগে নাচ আর পূজা করেন নিজেদের পাড়ায়।
Visit bettingx.bond for more information.
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি গৃহস্থবাড়ির উঠানে মাদলের তালে তালে চলছে নাচ। এর সঙ্গে পরিবেশিত হচ্ছে গান—‘আতো গাতি কুরি কোড়া, মায়া জালাং ছাড়া কিদেই, মায়া জালাং ছাড়া কিদেই, ইনদ ভেদ কান বোঙ্গা দেউড়ে।’ অর্থাৎ ‘গাঁয়ের যত যুবক-যুবতী, আটকা ছিলাম মায়ায় তাদের, এখন আমার যাওয়ার পালা, ছিঁড়ল মায়া।’ ওই উঠানে নাচ পরিবেশন শেষ করেই অন্য বাড়ির দিকে এগিয়ে যান নাচের দলের সদস্যরা। সেখানেও তাঁদের মাদল ও বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠে পুরো পাড়া।
স্থানীয় লোকজন জানান, দুর্গাপূজা ছাড়াও বিভিন্ন মাঙ্গলিক উৎসবে সাঁওতালদের এই নাচ পরিবেশিত হয়। সাঁওতালদের বিশ্বাস, নাচ ঐশ্বরিক দান। দেবতাদের সন্তুষ্টি ও মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে এ নাচের মধ্য দিয়ে তাঁরা ‘দাসাই বঙ্গা’ বা দাসাই দেবতার প্রতি ভক্তি নিবেদন করেন। এর মধ্য দিয়ে পরিবার, এলাকাবাসী ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি অটুট থাকে।
বাড়ির উঠানে মাদলের তালে তালে চলছে নাচ। আজ দুপুরেরীতি অনুযায়ী, নাচের দলটি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মাদল ও বাঁশি বাজিয়ে গান গায় এবং নাচ পরিবেশন করে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ দেখানোর পর গৃহস্থরা খুশি হয়ে তাঁদের টাকা, চাল, মুরগি, ফলমূল, শাকসবজিসহ নানা উপহার দেন। দুর্গাপূজার সময় কয়েক দিন ধরে এ ধরনের নাচের আয়োজন দেখা যায়।
পানছড়ির বড় সাঁওতালপাড়ায় নাচ পরিবেশনের সময় কথা হয় দলের প্রধান রাম সাঁওতালের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাড়ায় নাচ করতে গেলে গৃহস্থরা খুশি হয়ে টাকা, চাল, শস্য ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল উপহার দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তাঁরা দুর্গম তারাবনছড়া এলাকায় গিয়েছিলেন। সকাল আটটায় বের হয়ে রাত নয়টার দিকে ফিরেছেন। গৃহস্থরা খুশি হয়ে মনভরে উপহার দিয়েছেন।
বড় সাঁওতালপাড়ার কারবারি (পাড়াপ্রধান) আকাশ সাঁওতাল বলেন, একসময় পূজার প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে নাচ হতো। এখন পূজার এক দিন আগে শুরু হয়ে দশমীর দিন পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। আগের মতো সবাই নাচে অংশ নিতে পারেন না। সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তবে নাচ শুরু হলে ছেলে–বুড়ো অনেকেই এতে যোগ দেন।
আকাশ সাঁওতাল আরও বলেন, গৃহস্থদের কাছ থেকে পাওয়া উপহারসামগ্রী প্রতিদিন এক জায়গায় জমা করা হয়। দশমীর পর সুবিধাজনক একটি দিন দেখে পাড়ার সবাই মিলে খিচুড়ি রান্না করেন। পূজা দিয়ে মন্দিরে বসে সবাই মিলে সেই খাবার খান। উপহার থেকে পাওয়া টাকা খরচের পর অবশিষ্ট অর্থ মন্দিরের কাজে ব্যয় করা হয়। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে।