হুতির হামলা: সৌদিকে রক্ষায় মক্কা চুক্তি যখন প্রশ্নের মুখে

· Prothom Alo

গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যখন ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছিল, তখন আমাদের অনেকেই এটাকে স্রেফ মনোভাবের একটি ঘোষণা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। তবে মাত্র দুই মাসে পরিস্থিতি বদলে গেছে।

৫ অক্টোবর রিয়াদে তিন দেশের মন্ত্রী ও সামরিক কমান্ডারদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সৌদি আরবে দ্রুত সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই বৈঠকে পাকিস্তানি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নোমান মাহমুদকে তিন বছরের জন্য এই জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

Visit turconews.click for more information.

এরপর এল বৃহস্পতিবার। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি হুতি হামলা আঘাত হানে। একটি অবকাঠামোর ওপর, অন্যটি সাউদিয়া এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে। এতে এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন এবং বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হন। বার্তাটি পরিষ্কার, রাজধানী রিয়াদ এখন তাদের হামলার নাগালের মধ্যেই রয়েছে।

আমার মতে, এই মুহূর্তেই জোটটিকে সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, যা তারা এত দিন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই চুক্তিটির কাঠামো ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর আদলে তৈরি, অর্থাৎ কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবু তিনটি দেশই একে স্রেফ একটি ‘আত্মরক্ষামূলক জোট’ হিসেবে দাবি করে আসছে।

ইয়েমেনে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত উড়োজাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি বিদ্রোহীরা। তাঁদের দাবি, এটি সৌদি আরবের একটি যুদ্ধবিমান। মারিব, ইয়েমেন, ১৬ সেপ্টেম্বর

এটি কেবল ইয়েমেনকেন্দ্রিক বিষয় নয়
রয়টার্স এই উত্তেজনাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী বৃহত্তর দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত করে সংবাদ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। এক মাস আগে হুতিরা ওই উপকূলীয় অঞ্চলে কিছুটা আগিয়ে আসে। জবাবে রিয়াদও সানাসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বিমান হামলা চালায়। আর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারি বাহিনী একটি বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু করেছে, যার মূল লক্ষ্য হুতিদের দখলে থাকা সব এলাকা ফিরিয়ে আনা।

জোটের দাবি, তারা ৩২৪টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং সরকারি বাহিনীকে আকাশপথে সুরক্ষা দিয়েছে। সুতরাং এই জোট যে রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি করে মাঠে নেমেছে, সেই রাষ্ট্রটি নিজেও কিন্তু পুরোদমে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে সৌদি আরবের অবস্থান বেআইনি হয়ে যায় না, কারণ তারা নিজেরাও কঠোর হামলার শিকার হচ্ছে। তবে এর অর্থ হলো-কেবল ‘আত্মরক্ষামূলক’ বলেই দায় সেরে ফেলা যাবে না; এটি বাস্তবেও প্রমাণ করতে হবে।

হুতির হামলায় মক্কা চুক্তি কি কার্যকর হবে

ভাষা যেখানে অস্পষ্ট

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ বিন সালমান বলেছেন, জোটের বিশেষ কমিটি এই হামলা এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ব্যবস্থা নেবে। এই ‘এর পেছনে দায়ী সবার বিরুদ্ধে’ কথাটি নিয়ে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। এটি দিয়ে হুতিদের বোঝানো হতে পারে, আবার তাদের পেছনে থাকা মূল ইন্ধনদাতাদেরও বোঝানো হতে পারে। বিবৃতিতে কিন্তু বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি।

এ ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কেবল সহায়ক ভূমিকায় থাকবে এবং সৌদি সেনারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নেবে। তিনি এই সহায়তাকে আকাশপথ পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর মতে, কোনো প্রকার উসকানি ছাড়া আক্রমণ বা ইয়েমেন থেকে সৌদি ভূখণ্ডে যুদ্ধের আঁচ এলেই কেবল এই চুক্তি কার্যকর হবে, যা একটি যুক্তিসংগত মানদণ্ড। ৯ অক্টোবর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রও জোর দিয়ে বলেন, মিত্রবাহিনী ইয়েমেনের ভেতরে গিয়ে বা সেখান থেকে কোনো হামলা চালাবে না। এতে পাকিস্তানে বিমান হামলা-সংক্রান্ত যাবতীয় খবরকে তারা স্রেফ জল্পনা বলে উড়িয়ে দেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান বা তুরস্কের সৈন্যদের ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ‘সহায়তামূলক’ কথাটির পরিধি অনেক বড়, আর বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর এই নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করছে। মিডল ইস্ট আই (রয়টার্সের বরাতে) জানিয়েছে যে পাকিস্তান চারটি বিমানে করে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য এডেনে অস্ত্র পাঠিয়েছে।

আমি এর কোনো অফিশিয়াল বা দাপ্তরিক সত্যতা খুঁজে পাইনি, তাই আপাতত একে অপ্রমাণিত খবর হিসেবেই ধরা যাক।

সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের দৃশ্য। ১০ অক্টোবর ২০২৬, রিয়াদ

ঠিক কত সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে?

সংবাদমাধ্যমে আসা সৈন্যসংখ্যার তথ্যগুলো সাংবাদিকদের থেকে পাওয়া, কোনো সরকারি সূত্রে নয়। গত মে মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, পাকিস্তান ৮ হাজার সেনা, একটি ফাইটার স্কোয়াড্রন এবং একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে।

আবার ২ অক্টোবর তারা এক পাকিস্তানি কর্মকর্তার বরাতে জানায়, সৌদি সীমান্ত পাহারা দিতে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসে সহায়তা করতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা কাজ করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এখন নিশ্চিত করেছেন যে পাকিস্তানি বাহিনী সৌদি আরবে ‘বিভিন্ন সামর্থ্য ও কার্যক্রমে’ নিয়োজিত রয়েছে এবং এটি কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে। এই তথ্যটি সত্য, তবে কিছুটা কৌশলীও বটে।

কয়েক দশক ধরে চলা একটি সাধারণ প্রশিক্ষণ ও পরামর্শমূলক মিশনের সঙ্গে
সীমান্তে হাজার হাজার সেনা মোতায়েনের পার্থক্য কিন্তু আকাশ-পাতাল।
আঙ্কারা এখনো তাদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করেনি কাগজে-কলমে এই জোটে রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী, মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি। সেই হিসেবে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অক্ষ।

তবে বাস্তবে তিনটি দেশ কিন্তু একই অবস্থানে নেই। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, আঙ্কারা এখনো পর্যালোচনা করছে তারা কীভাবে সহায়তা করতে পারে, এবং তুর্কি সংসদে এই চুক্তিটি এখনো অনুমোদন পায়নি।

খবরে বলা হয়েছে, সরকার চুক্তিটি পার্লামেন্টে পেশ করার পরিকল্পনা করছে, যা সেনা মোতায়েনের পথ সুগম করবে। কিন্তু তা না হওয়া পর্যন্ত আঙ্কারার ভূমিকা কেবল নির্বাহী আদেশের ওপরই নির্ভর করছে। আর সেনা নিহতের ঘটনা ঘটলে স্বদেশে আইনি অনুমোদনহীন কোনো চুক্তি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

সৌদি বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলা, যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে

পাকিস্তানের কঠিন অবস্থান

এই জোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে পাকিস্তানকে।কয়েক বছর আগে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো যোদ্ধা সেনা না পাঠানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল, এবং সেই সিদ্ধান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রদ করা হয়নি। তা ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে হুতিদের সমর্থক ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দেশের ভেতরেও বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠী বাস করে।

পাকিস্তানের পদক্ষেপ যদি প্রতিরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে আক্রমণের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে হয়, তবে দেশটিকে দেশে ও বিদেশে বড় ধরনের মাশুল গুনতে হতে পারে।ইসলামাবাদের অবশ্য চিন্তার অন্যান্য বিষয়েরও অভাব নেই। পূর্ব সীমান্তে ভারত, পশ্চিমে আফগানিস্তান এবং ভেতরে বেলুচিস্তানের উগ্রবাদ-সব মিলিয়ে পাকিস্তানের অর্থ ও সামরিক শক্তি ইতিমধ্যেই চাপের মুখে। কিন্তু এর কোনোটিই অবশ্য রিয়াদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও কি এই জোটে যোগ দেবে? পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই মুহূর্তে জোটের সম্প্রসারণের বিষয়টি ‘বিবেচনায় নেই’। আমি এটাকে সাময়িক বিরতি হিসেবে দেখছি, স্থায়ী প্রত্যাখ্যান নয়।

সৌদি আরব কেন হুতিদের হারাতে পারবে না

জোটের কাছে প্রত্যাশা

এই মুহূর্তে জোটের কাছে আমার তিনটি মৌলিক প্রশ্ন বা দাবি রয়েছে। প্রথমত, একটি সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ করা হোক, যাতে বলা থাকবে জোট ঠিক কী রক্ষা করবে, যৌথ সামরিক পদক্ষেপ কখন শুরু হবে এবং তারা কখনোই কোন সীমারেখা অতিক্রম করবে না। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি নিজ নিজ দেশের আইনসভাকে জানাতে হবে।

পাকিস্তানের পার্লামেন্টকে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেনাসংখ্যা ও নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত করা উচিত এবং তুরস্কের উচিত তাদের পার্লামেন্টে চুক্তিটির আইনি অনুমোদন সম্পন্ন করা। তৃতীয়ত, স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা উচিত যে এই সব সামরিক প্রস্তুতি মূলত একটি আলোচনা বা সমঝোতার পরিবেশ তৈরির জন্য করা হচ্ছে, এবং তার পাশাপাশি ওমান, জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

মক্কা জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল আঞ্চলিক শক্তির নিজ নিরাপত্তা নিজে নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তবে বৃহস্পতিবারের বিমানবন্দর হামলা সেই নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।

জোটের মূল্যায়ন সেনাসংখ্যা বা পতাকার বহরে নয়, বরং রিয়াদের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা, যুদ্ধ সীমিত রাখা এবং নাগরিকদের কাছে অঙ্গীকারের স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করবে। যদি এই জোট সত্য বলতে পারে, তবে এটি আঞ্চলিক সহযোগিতার মাইলফলক হয়ে থাকবে; অন্যথায় এটি কেবল বড় প্রতিশ্রুতির ব্যর্থ জোট হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।

  • মনসুর কায়সার ইসলামাবাদভিত্তিক সাংবাদিক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

Read full story at source