শিল্পখাতের চাহিদা মেটাতে প্রকৌশল শিক্ষায় পরিবর্তন চান বিশেষজ্ঞরা

· Prothom Alo

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রকৌশলশিক্ষার মান ধরে রাখা এবং আরও উন্নত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। এ জন্য কার্যকর নীতিমালা, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মানসম্মত মূল্যায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্প খাতের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

Visit esporist.com for more information.

আজ রোববার রাজধানীর শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রকৌশলশিক্ষার মান নিশ্চিতে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নীতিসহায়তার ভূমিকা নিয়ে আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে এ কথা উঠে আসে। ‘বিএইটিই জাতীয় সিম্পোজিয়াম ২০২৬’ শীর্ষক এ আয়োজন করে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের (আইইবি) অধীন প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার স্বীকৃতি বোর্ড (বিএইটিই)। এতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলের অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার প্রকৌশলীরা অংশ নেন।

‘মান ধরে রাখতে হবে’

সিম্পোজিয়ামে একটি উপস্থাপনা দেন মালয়েশিয়ার বোর্ড অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সদস্য ও মালয়েশিয়ান সোসাইটি ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির সভাপতি মেগাত জোহারি মেগাত মোহাম্মদ নূর। তিনি প্রকৌশলশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

মেগাত জোহারি বলেন, মানসম্মত প্রকৌশলশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের কারিগরি জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা থাকতে হবে। পাঠ্যক্রমে নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, নৈতিকতা ও জীবনব্যাপী শেখার বিষয়গুলোও যুক্ত করতে হবে।

মেগাত জোহারির মতে, স্নাতকদের অর্জিত যোগ্যতার সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। এ জন্য কার্যকর মূল্যায়নব্যবস্থা, যোগ্য শিক্ষক, শিল্প খাতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের চেয়ারম্যান ও সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক লক কাই সাং বলেন, বাংলাদেশ ২০২৩ সালে ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের পূর্ণ সদস্যপদ পেয়েছে। এখন এ স্বীকৃতিকে ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলশিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করতে হবে। তিনি স্বীকৃতিব্যবস্থার কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা, এর স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা, পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে স্নাতকদের যোগ্যতার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনের সামঞ্জস্য রাখার কথা বলেন।

অধ্যাপক লক বলেন, স্বীকৃতির ক্ষেত্রে শুধু নথিপত্র তৈরি ও নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিলে হবে না। শিক্ষার্থীরা কী শিখছেন এবং কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করছেন, তা প্রমাণভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষার মানের ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, স্বীকৃতিদানকারী সংস্থা ও শিল্প খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বিএইটিইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক তানভীর মনজুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রকৌশল পেশার বাস্তব কাজের মধ্যকার ব্যবধান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করেন। তবে কর্মক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা থাকতে হবে। অসম্পূর্ণ তথ্য ও বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করতে জানতে হবে।

তানভীর মনজুরের উপস্থাপনায় বিভিন্ন বিষয়ের প্রকৌশলীদের মধ্যে সমন্বয়, সফটওয়্যারের সঠিকতা যাচাই, নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ, বিধিমালা অনুসরণ ও ব্যয় বিবেচনার মতো বিষয় উঠে আসে। তিনি বলেন, বিএইটিইর স্বীকৃতিকাঠামো শিক্ষাক্রমের ফলাফল নির্ধারণ, জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাই এবং শিল্প খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এর মাধ্যমে জননিরাপত্তা ও অবকাঠামোর মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশি প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সিম্পোজিয়ামের আনুষ্ঠানিক পর্বে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। প্রকৌশলশিক্ষার মান নিশ্চিতে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নীতিসহায়তার ভূমিকা নিয়ে ‘বিএইটিই জাতীয় সিম্পোজিয়াম ২০২৬’-এর আয়োজন করে বিএইটিই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকা, ১১ অক্টোবর

নীতিসহায়তা দেবে সরকার

দিনব্যাপী সিম্পোজিয়ামের দুপুরের আনুষ্ঠানিক পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিষয়ে পড়েন। কিন্তু প্রকৌশল শিক্ষায় সব প্রতিষ্ঠানে একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না।

শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে স্বীকৃতি ও মূল্যায়নের অভিন্ন কাঠামো প্রয়োজন উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৌশল বিষয়ে চালু থাকা আরও বেশি ডিগ্রি প্রোগ্রামকে স্বীকৃতির আওতায় আনতে চায় সরকার। এ জন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) ও বিএইটিইর মধ্যে সমন্বয় করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিএসির সঙ্গে সমন্বয় করে বিএইটিই ভূমিকা রাখতে পারে। ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার নীতিগত সহায়তা দেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিএসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আখতার হোসেন খান বলেন, স্বীকৃতি পাওয়া মানেই কাজ শেষ নয়। এটি শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করার শুরু। শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করছেন কি না, তা যাচাই করতে হবে। এ জন্য সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিল্প খাত ও পেশাজীবী সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিএসি ও আইইবি অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বীকৃতিব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে।

প্রকৌশলশিক্ষার মান যাচাই করে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেন বিএইটিইর ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক শারমিন রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারি নিয়োগ, পেশাগত নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে এ স্বীকৃতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসম্মত প্রকৌশলশিক্ষা নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও পেশার মর্যাদা বাড়বে। এ জন্য পাঠদান ও মূল্যায়নে পেশাজীবী প্রকৌশলীদের যুক্ত করা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

Read full story at source