সৌদি বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলা, যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার পর ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। হামলার কারণে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

Visit grenadier.co.za for more information.

গতকাল শনিবার হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এতে যুক্ত হতে পারি। বিষয়টি পর্যালোচনা করব।’ টেনেসিতে একটি জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার আগে তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক হামলার খবর তাঁরা মাত্রই পেয়েছেন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

গতকালের সর্বশেষ হামলায় সৌদি আরবের দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তিন ও চার নম্বর টার্মিনাল ভবনসমৃদ্ধ এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এতে ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। সপ্তাহের শুরুর দিকে বিমানবন্দরটিতে হামলার দায় হুতিরা স্বীকার করলেও সর্বশেষ হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি তারা।

গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। ৪ অক্টোবর ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এসব হামলা শুরু হয়।

মঙ্গল ও বুধবারও দুটি হামলার ঘটনা ঘটে। তবে সেসব হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলীয় আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় আলজেরিয়া ও মরক্কোর দুই নারী নিহত হন। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরেক হামলায় সুদানের এক ব্যক্তি নিহত হন।

ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করার সময় দেশটির ভেতরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে জনমতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধটি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ১ অক্টোবর পরিচালিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার হুতিরা আবারও কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবি করে। ওই ঘটনায় একজন পাইলটসহ সৌদি আরবের তিন নাগরিক নিহত হন।

গত এক সপ্তাহের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই সৌদি নাগরিক। তবে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, মিসর, জর্ডান, মরক্কো, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সুদান ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন।

ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, এসব হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং হামলাকারীদের শাস্তি এড়ানোর সুযোগ নেই।

বিমানবন্দরে হামলা হুতিদের পরিচিত সামরিক কৌশলগুলোর একটি। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দরে একই ধরনের হামলার ঘটনাকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছিল।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সৌদি আরবের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার আগের সতর্কবার্তা আবারও দেন। সোমবার সৌদি আরবের আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের জন্য উন্মুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো থেকেও কর্মীদের দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনাও হুতিদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুর অন্তর্ভুক্ত। সেখানে কর্মীরা অবস্থান করলে তাঁদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

গতকাল রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু হয়। উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের হিসাবে, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আসা-যাওয়ার ৪০০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছিল।

রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও গতকাল নিরাপত্তাসংক্রান্ত সতর্কতা জারি করে। এতে মার্কিন নাগরিকদের বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ এবং যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই যাত্রীদের নিজ নিজ বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত কেন বাড়ছে, তার পেছনে রয়েছে বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক পরিবহনে কয়েক মাস ধরে বাড়তে থাকা হুমকি।

জুলাই মাসে হুতিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, ইরানের একটি উড়োজাহাজ যাতে সেখানে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

গত মাসে হুতিরা ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপ দখল করে নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যে ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী দাবি করে, তারা হুতিদের দখল করা দুটি এলাকাই পুনরুদ্ধার করেছে। তবে এ দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা নিয়েও বিরোধ রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও সংকীর্ণ প্রণালিগুলোর আশপাশে হুতিদের প্রভাব বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে তিনি এ অনুরোধ করেন।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের মিত্র হলেও গত মাসে ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, ইয়েমেনের এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িত হওয়ার পরিকল্পনা নেই। পরিস্থিতির পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য জানতে টাইম সাময়িকী হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করার সময় দেশটির ভেতরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে জনমতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধটি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ১ অক্টোবর পরিচালিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হয়নি।

টি মিশেল মারফি টাইম সাময়িকীর সাপ্তাহিক ছুটির দিনের বার্তা সম্পাদক।

টাইম থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

Read full story at source