অপটোজেনেটিকস: কী কেন কীভাবে
· Prothom Alo

ঘরের বাতি অন-অফ করার জন্য দেয়ালে সুইচের কথা তো জানোই। এবার কল্পনা করো, আমাদের মাথার ভেতরের নিউরন বা স্নায়ুকোষগুলোকে যদি সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে কেমন হতো? মানে, একটি বিশেষ নীল আলো ফেললেই অমনি একটা নিউরন জেগে উঠল, আর অন্য আলো ফেলতেই সেটা চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ল! অনেকটা রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম চেপে কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করার মতো।
ব্যাপারটা শুনতে সায়েন্স ফিকশন মুভির মতো লাগছে, তাই না? কিন্তু এটা এখন আর কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম রোমাঞ্চকর আবিষ্কার! জীববিজ্ঞানের এই জাদুবিদ্যার নামই হলো অপটোজেনেটিকস।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
এক অর্থে বলা যায়, মানুষের মস্তিষ্কে কোটি কোটি ছোট ছোট বৈদ্যুতিক বাতি আছে। প্রতিটি বাতিই আসলে একেকটি স্নায়ুকোষ। সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে কথা বলে। কোনোটি সক্রিয় হলে আমরা নড়াচড়া করি, কোনোটি সক্রিয় হলে ভয় পাই। আবার কোনোটি প্রিয় গান শুনে আনন্দ দেয়, কোনোটি পুরোনো কোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের জন্য একটা বড় সমস্যা ছিল, মস্তিষ্কের কোন স্নায়ুকোষটি ঠিক কোন কাজ করছে, সেটা কীভাবে বোঝা যাবে?
আলোর সাহায্যে কীভাবে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায়, জানালেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসারোথমানুষের মস্তিষ্কে কোটি কোটি ছোট ছোট বৈদ্যুতিক বাতি আছে। প্রতিটি বাতিই আসলে একেকটি স্নায়ুকোষ। সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে কথা বলে।
ধরা যাক, একটা ঘরে হাজারটা বৈদ্যুতিক বাতি থাকে। সবগুলো বাতি যদি একসঙ্গে জ্বালানো হয়, তাহলে কোন বাতিটি আসলে ঘরটা আলোকিত করছে, সেটা বোঝা কঠিন। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও অনেকটা এমনই। কোনো প্রাণী ভয় পেল, আনন্দ পেল বা কোনো কিছু মনে করল, তখন তার মস্তিষ্কের অসংখ্য স্নায়ুকোষ একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে জানতেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে এসব কাজের সম্পর্ক আছে। কিন্তু ঠিক কোন কোষটি কোন কাজের জন্য দায়ী, সেটা নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা করা ছিল ভীষণ কঠিন। মানে সাধারণ পদ্ধতিতে খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। কারণ ওষুধ দিলে তা পুরো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। আবার বিদ্যুৎ দিয়ে উদ্দীপিত করতে গেলে আশপাশের অনেক নিউরন একসঙ্গে কেঁপে ওঠে।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই বিজ্ঞানীরা এমন এক অভিনব প্রযুক্তির সন্ধান করছিলেন, যা দিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনকে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আলোর সাহায্যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত নিউরনকে সক্রিয় করার এই জাদুকরী কৌশলই স্নায়ুবিজ্ঞানে এক নতুন বিপ্লব এনে দিয়েছে। সে কৌশলকেই বলা হয় অপটোজেনেটিকস। সহজ ভাষায় বললে, অপটো (Opto) মানে আলো, আর জেনেটিকস (Genetics) মানে জিনতত্ত্ব। আলো আর জিনপ্রযুক্তির এই দারুণ মেলবন্ধনকে একসঙ্গে বলা হয় অপটোজেনেটিকস। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আলোর রশ্মি ব্যবহার করে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
মস্তিষ্ক কি নিজেই নিজের ডাক্তারি করতে পারেআলোর সাহায্যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত নিউরনকে সক্রিয় করার এই জাদুকরী কৌশলই স্নায়ুবিজ্ঞানে এক নতুন বিপ্লব এনে দিয়েছে। সে কৌশলকেই বলা হয় অপটোজেনেটিকস।
সোজা কথায়, বিজ্ঞানীরা কোষের ভেতরে এমন এক ধরনের ‘আলোর সুইচ’ বসিয়ে দেন, যা আলো দিয়ে চালু বা বন্ধ করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, কোষে আবার আলোর সুইচ বসানো যায় কীভাবে?
এই কাহিনির শুরু কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কে নয়। সেটা শুরু হয়েছিল একধরনের পুকুরের শ্যাওলা বা শৈবালের কাছ থেকে! হ্যাঁ, সবুজ একঘেয়ে শ্যাওলা। এই ক্ষুদ্র এককোষী শৈবালের নাম Chlamydomonas। সেটা এত ছোট যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিন্তু তার আছে আশ্চর্য ক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন, এই শ্যাওলাগুলোর গায়ে বিশেষ একধরনের প্রোটিন থাকে। সেই প্রোটিন আলোর স্পর্শ পেলেই সাড়া দেয় এবং বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি করে।
আসলে এই শ্যাওলার গায়ে থাকে চ্যানেলরোডপসিন নামের বিশেষ প্রোটিন। সেটাই আলোর স্পর্শ পেলে সাড়া দেয়। বিজ্ঞানীরা তখন বুঝলেন, ব্যাপারটা বেশ মজার। তাঁরা ভাবলেন, এই আলোর সেন্সরটা যদি কোনোভাবে নিউরনের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কী হবে?
মস্তিষ্ক কি সত্যিই মাল্টিটাস্কিং করতে পারে, বিজ্ঞান কী বলেবিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন, এই শ্যাওলাগুলোর গায়ে বিশেষ একধরনের প্রোটিন থাকে। সেই প্রোটিন আলোর স্পর্শ পেলেই সাড়া দেয় এবং বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি করে।
অনেক গবেষণা আর পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঠিক সেটাই করা হলো। শ্যাওলার সেই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিনের জিন ঢুকিয়ে দেওয়া হলো প্রাণীর নির্দিষ্ট কিছু নিউরনে। ফলে সেই নিউরনগুলোও হয়ে উঠল আলো-সংবেদনশীল! এবার মাথার ভেতর অতি সূক্ষ্ম ফাইবারের তার দিয়ে নীল আলো ফেলতেই নিউরনটি ‘অন’ হয়ে যায়, আর আলো সরাতেই ‘অফ’। যেন মস্তিষ্কের রিমোট কন্ট্রোল চলে এল বিজ্ঞানীদের হাতে!
মস্তিষ্কের জটিল সব মেকানিজম বা সার্কিট ডিকোড করার এই অভাবনীয় সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ নতুন একটি যুগে নিয়ে গেছে। পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের কাঁপুনি আলো জ্বালিয়ে থামিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে দৃষ্টিহীন চোখে আলো চেনার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কিংবা মস্তিষ্কে ভয় ও স্মৃতির গতিপথ মেপে ফেলা—সবই সম্ভব হচ্ছে এই প্রযুক্তিতে। অমানবিক কোনো প্রভাব ছাড়াই শুধু নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য বানিয়ে জটিল সব মস্তিষ্কের রোগের নিরাময় খোঁজার রাস্তা খুলে গেছে।
মস্তিষ্ক কি একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারেমাথার ভেতর অতি সূক্ষ্ম ফাইবারের তার দিয়ে নীল আলো ফেলতেই নিউরনটি অন হয়ে যায়, আর আলো সরাতেই অফ। যেন মস্তিষ্কের রিমোট কন্ট্রোল চলে এল বিজ্ঞানীদের হাতে!
আর এখানেই অপটোজেনেটিকসের আসল শক্তি। বিজ্ঞানীরা শুধু দেখতে পারেন না যে কোনো স্নায়ুকোষ কখন সক্রিয় হচ্ছে; তাঁরা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সেই কোষটি সক্রিয় করলে কী ঘটে। অর্থাৎ কারণ ও ফলের সম্পর্ক বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। ধরা যাক, বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষ ভয় পাওয়ার সঙ্গে জড়িত। আগে যা করা যেত, তা হলো—প্রাণী ভয় পেলে কোন অংশে বেশি কার্যকলাপ হচ্ছে, সেটি দেখা। কিন্তু এতে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে ওই কোষগুলোই ভয় তৈরি করছে।
আর এই অসাধারণ কৌশল উদ্ভাবণ করার কারণেই ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন: কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান ও গিওর্গ নাগেল। পিটার হেগেম্যান এবং গিওর্গ নাগেল শৈবালের সেই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন (চ্যানেলরোডপসিন) আবিষ্কার ও বিশ্লেষণ করেন। আর কার্ল ডাইসারোথ সেই প্রোটিন ব্যবহার করে স্তন্যপায়ী প্রাণীর নিউরনে আলোর সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করার পুরো প্রযুক্তিটি বাস্তবে রূপ দেন। ভেবে দেখো, তুচ্ছ এক শ্যাওলার প্রোটিন কীভাবে মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে জটিল রহস্য ভেদ করে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মান জয় করে নিতে পারে, অপটোজেনেটিকস তার এক অনন্য উদাহরণ!
মানসিক চাপে থাকলে মস্তিষ্ক শান্ত করতে পারে গানধরা যাক, বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষ ভয় পাওয়ার সঙ্গে জড়িত। আগে যা করা যেত, তা হলো—প্রাণী ভয় পেলে কোন অংশে বেশি কার্যকলাপ হচ্ছে, সেটি দেখা।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। অপটোজেনেটিকস এখনো এমন কোনো জাদুর চিকিৎসা নয়, যা দিয়ে মস্তিষ্কের রোগ সারিয়ে ফেলা যায়। এর বড় অংশ এখনো গবেষণাগারে ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। বিশেষ করে মানুষের গভীর মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কোষে নিরাপদে আলো পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এ বিষয়ে নোবেল পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আজ বা আগামীকাল থেকেই অপটোজেনেটিকস দিয়ে সব ধরনের মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসা শুরু হয়ে যাবে। বরং এর অর্থ হলো, বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ককে বোঝার জন্য একটি অসাধারণ নতুন হাতিয়ার পেয়েছেন।
কিন্তু এই হাতিয়ারটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝার জন্য আবার সেই বৈদ্যুতিক বাতির ঘরে ফিরে যাওয়া যাক। মস্তিষ্কে কোটি কোটি স্নায়ুকোষ। প্রত্যেকটির কাজ এক নয়। এত জটিল একটি ব্যবস্থায় বিজ্ঞানীদের দরকার এমন একটি সুইচ, যেটি দিয়ে তাঁরা একসঙ্গে পুরো ঘরের বাতি জ্বালাবেন না; বরং চাইলে শুধু একটি নির্দিষ্ট বাতি জ্বালাবেন।
অপটোজেনেটিকস সেই কাজটিই সম্ভব করেছে। তাই অপটোজেনেটিকস শুধু আলো দিয়ে মস্তিষ্ক চালানোর প্রযুক্তি নয়, এটি আসলে মস্তিষ্কের রহস্যের দরজা খোলার একটি চাবি।
সূত্র: নোবেল ডট অর্গউইকিপিডিয়াআমাদের মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলছে!