চায়ের কাপে দেশভাগ
· Prothom Alo

দেশভাগ শুধু মানচিত্র বদলায়নি; বদলে দিয়েছিল পুঁজি, ক্ষমতা ও মানুষের জীবনযাত্রার গতিপথও। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সিলেটের চা-শিল্প।
ব্রিটিশ ভারতের পূর্বাঞ্চলে চা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল আসাম ও সিলেট। ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চা-অঞ্চল নবগঠিত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু প্রশাসনিক সীমারেখার এ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মালিকানা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস।
Visit bettingx.bond for more information.
রুশ অর্থনীতিবিদ এস এস বারানভের লেখা ‘পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৈশিষ্ট্য (১৯৪৭-১৯৭১)’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশভাগের সূচনালগ্নে পূর্ব বাংলায় বিনিয়োগ করা মোট পুঁজির প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল হিন্দু উদ্যোক্তাদের হাতে। তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল ১৭টি চা-বাগান। দেশভাগের পর অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তাঁদের বড় অংশ পূর্ব বাংলা ত্যাগ করলে চা-শিল্পে ক্ষমতার এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।
সেই শূন্যস্থান দ্রুত দখল করে পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পগোষ্ঠী এবং উত্তর ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী মুসলিম ধনিক শ্রেণি। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে আলোচিত ‘বাইশ পরিবার’-এর কয়েকটি গোষ্ঠী চা-শিল্পে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। বাওয়ানী (০২টি), আদমজী (০৫টি), চিনিয়ট শেখ (০৫টি) ও মেমন (০৭টি) ব্যবসায়ী পরিবারগুলো ক্রমে সিলেটের বহু চা-বাগানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
একসময় যে শিল্পে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, তা ধীরে ধীরে বহিরাগত পুঁজির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। চিনিয়ট শেখ সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ফজল এলাহি পরিবারের তত্ত্বাবধানে ‘চন্ডিচেরা টি কোম্পানি’, ‘হালদা ভেলি টি এস্টেট’, ‘পারকুল টি এস্টেট’, ‘কালিতি টি কোম্পানি’ ও ‘জগদীশপুর টি কোম্পানি’ পরিচালিত হতো। অন্যদিকে ইস্পাহানীর মালিকানায় ছিল গাজীপুর, মির্জাপুর ও জেরিন টি এস্টেট। আর এ কে খান প্রতিষ্ঠা করেন আন্ধারমানিক টি এস্টেট।
এই বৃহৎ পুঁজিকেন্দ্রিক বলয়ের বাইরে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক সীমিত। চট্টগ্রামের অমিতাভ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত সাংগু ভ্যালি টি এস্টেট যাত্রা শুরু করেছিল আশা জাগিয়ে। কিন্তু করের বোঝা সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সেটি নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। অন্যদিকে আমিনূর রশীদ চৌধুরীর পরিবার আমিনাবাদ, রশিদাবাদ ও সিরাজনগর চা-বাগানের মালিকানা ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং পরবর্তী সময়ে দেশীয় চা-উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে।
আশফাক হোসেন তাঁর গবেষণা নিবন্ধ ‘চেঞ্জিং ফেস অব গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল এন্টারপ্রেনিউরশিপ: আ কেস স্টাডি অন সিলেট টি প্ল্যান্টেশন’-এ আরও স্পষ্টভাবে মালিকানা পরিবর্তনের এ চিত্র তুলে ধরেন। ১৯৬৬ সালে ১১৪টি চা-বাগানের মধ্যে ৫৬টির নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। মাত্র চার বছর পর ১৯৭০ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪-এ। অর্থাৎ সময় যত গড়িয়েছে, সিলেটের চা-শিল্পের নিয়ন্ত্রণ ততই বাঙালিদের হাতছাড়া হয়ে বহিরাগত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
‘যুগভেরী’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে নামাঙ্কিত আমিনূর রশীদ চৌধুরীভেঙে পড়া বাজার, নতুন সংকট
১৯৪৯ সালের পাকিস্তান চা সম্মেলনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে সময় দেশে ১৩৩টি চা বাগানের আওতায় চাষ হতো ৭৪ হাজার ১০৮ একর জমিতে। উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল মূলত সিলেট, যেখানে চা-বাগানগুলো মানু, জুড়ী, বালিসিরা, লস্করপুর, সিলেট ও লংলা—এই ছয়টি ভ্যালিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি তদারকের জন্য ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান টি বোর্ড। এরপর ১৯৫২ সালে চা গবেষণার স্বার্থে পৃথক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানের চা-বাগানগুলোয় কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মচারীর মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ১৪৮ জন। দীর্ঘদিন ধরে এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাবি উঠলেও শ্বেতাঙ্গ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ১৯৫৯ সালে বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চা-বাগানগুলোর ৫৭ জন ব্যবস্থাপকের সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিক।
এ সিদ্ধান্ত ছিল সময়ের দাবি। কারণ, দেশভাগের আগে সিলেটের চা-শিল্প গবেষণার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল ছিল আসামের বিখ্যাত টোকলাই গবেষণা কেন্দ্রের ওপর। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন সুরমা ভ্যালির চা-বাগানগুলোকে বৈজ্ঞানিক সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু দেশভাগের পর সে সম্পর্ক কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে গবেষণা, রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ে।
তবে গবেষণার প্রশ্ন সামনে আসার আগেই শিল্পটি আরেক বড় সংকটে পড়ে। দেশভাগের ফলে ভেঙে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক চা নিলাম ও রপ্তানিব্যবস্থা। একসময় সিলেটের চা সরাসরি কলকাতা নিলামের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে যেত। সেই সুসংগঠিত বাণিজ্যকাঠামো ভেঙে পড়ায় পূর্ব পাকিস্তানের চা-শিল্প হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ভারতের মধ্য দিয়ে রপ্তানি নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও চট্টগ্রাম বন্দরের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চা-শিল্প কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল।
এ সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে দেশীয় মালিকদের ওপর। বিদেশি কোম্পানিগুলো নিজেদের পুঁজি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্কের কারণে ধাক্কা সামলে নিতে পারলেও স্থানীয় উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। একই সময়ে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ডানকান ব্রাদার্সের মতো প্রতিষ্ঠানেরও ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠন করতে হয়।
ঔপনিবেশিক আমলে চা-বাগানের শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় বিহার, যুক্তপ্রদেশ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ), মধ্যপ্রদেশ ও সাঁওতাল পরগনা থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে পূর্ববঙ্গে আনা হয়। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।আমিনূর রশীদ চৌধুরী
দেশভাগ শুধু ভূখণ্ড নয়, করপোরেট মালিকানার মানচিত্রও পাল্টে দিয়েছিল। বিভিন্ন মালিকানাধীন চা-বাগান ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হয়। পরবর্তীকালে ১৯৬৫ সালে ভ্যালোটিয়া পরিবার ডানকান ব্রাদার্সের নিয়ন্ত্রণাধীন পাত্রকোলা টি কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার অধিগ্রহণের মাধ্যমে কোম্পানিটির মালিকানাগত কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
দেশভাগ-পরবর্তী করপোরেট মালিকানার পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার স্থানান্তর নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন তীর্থঙ্কর রায় তাঁর গ্রন্থ ‘ট্রান্সফার অব ইকোনমিক পাওয়ার ইন করপোরেট ক্যালকাটা, ১৯৫০-১৯৭০’-এ। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে দেশভাগের ফলে করপোরেট পুঁজির পুনর্গঠন ও মালিকানার রূপান্তর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।
শ্রমের বাগান, বৈষম্যের ইতিহাস
চা-শিল্পের ইতিহাস কেবল পুঁজি, মালিকানা বা রপ্তানি বাণিজ্যের ইতিহাস নয়; এটি শ্রমের ইতিহাসও। এ শিল্পের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, বঞ্চনা ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপর।
ঔপনিবেশিক আমলে চা-বাগানের শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় বিহার, যুক্তপ্রদেশ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ), মধ্যপ্রদেশ ও সাঁওতাল পরগনা থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে পূর্ববঙ্গে আনা হয়। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। নিয়োগের নামে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের দূরবর্তী চা-বাগানে নিয়ে আসা হতো এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যত বাগানজীবনের সঙ্গে আবদ্ধ করে রাখা হতো। সময়ের প্রবাহে তাঁরা নিজেদের আদি ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেন এবং বাগানকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে তাঁদের নতুন জীবন, নতুন সমাজ।
এভাবেই জন্ম নেয় একটি স্বতন্ত্র ‘চা-শ্রমিক সমাজ’। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে এ জনগোষ্ঠী মূল ধারার বাঙালি সমাজ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। বহু প্রজন্ম ধরে একই বাগানে বসবাস ও শ্রমের অভিজ্ঞতা তাদের নিজস্ব এক সামাজিক পরিচয় নির্মাণ করে, যা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বহুত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০ মার্চ ১৯৬৩, যুগভেরীদেশভাগের পর এ জনগোষ্ঠীর অবস্থান আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে তারা স্থানীয় সমাজে পুরোপুরি একীভূত হতে পারেনি, অন্যদিকে পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ারও কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না। ফলে তারা যেন দুই জগতের মাঝামাঝি এক সামাজিক বাস্তবতায় আটকে পড়ে। পরিচয়ের এ দ্বৈততা ও প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতা আজও বাংলাদেশের চা-শ্রমিক সমাজের জীবন ও সংগ্রামে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
চা-বাগানই ছিল এই গোষ্ঠীর কর্মস্থল, আবাস ও সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা এ শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকত। বিশেষ করে চা-পাতা সংগ্রহের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। বাগানের উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা সমান মর্যাদা বা পারিশ্রমিক পেতেন না।
এ বৈষম্যের একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আবদালের জীবন থেকে। তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সাকিনা আবদালের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী ১৯৬০ সালে সিরাজুল আবদাল সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হবিগঞ্জ সদরের আউশপাড়া গ্রামের সন্তান সিরাজুল আবদাল যুক্তরাজ্যের বেলফাস্টের খ্যাতনামা সিরোক্কো ওয়ার্ক্সে চাকরির সুযোগ পেয়েও দেশপ্রেমের টানে দেশে ফিরে চা-শিল্পে যোগ দেন। কিন্তু যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও তিনি পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। সৈয়দা সাকিনা আবদালের ভাষ্যমতে, তাঁর স্বামীর সহকর্মী টি-প্ল্যান্টার নূর খান উর্দুভাষী হওয়ায় পদোন্নতি পেয়ে লাক্কাতুরা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হন, অথচ সিরাজুল আবদাল একই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন।
মজুরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য ছিল স্পষ্ট। কামরুদ্দীন আহমদের ‘লেবার মুভমেন্ট ইন ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৪৪ পয়সা, অথচ একই শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিক পেতেন মাত্র ৩৭ পয়সা। এ ব্যবধান কেবল আয়বৈষম্যের নির্দেশক নয়; এটি তৎকালীন চা-শিল্পে প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
অর্থাৎ সিলেটের চা-বাগানগুলো যেমন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, তেমনি এগুলোর অন্তরালে লুকিয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা শ্রম, বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্যের ইতিহাস। সবুজ চায়ের পাতার আড়ালে তাই রয়েছে এক দীর্ঘ মানবিক আখ্যান, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেই শ্রমিক সমাজ, যারা এ শিল্পের ভিত্তি নির্মাণ করলেও দীর্ঘদিন থেকেছে উন্নয়ন ও ক্ষমতার মূল ধারার বাইরে।
ক্ষমতার করিডরে বৈষম্য
চা-বাগানের বৈষম্য কেবল শ্রমিকজীবনে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার উচ্চপর্যায়েও তা ছিল স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে শিল্পটির মালিকানা যেমন ক্রমে বহিরাগত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তেমনি নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে থেকে যায়।
১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানের চা-বাগানগুলোয় কর্মরত প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মচারীর মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ১৪৮ জন। দীর্ঘদিন ধরে এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাবি উঠলেও শ্বেতাঙ্গ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ১৯৫৯ সালে বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চা-বাগানগুলোর ৫৭ জন ব্যবস্থাপকের সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিক।
ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার ইউরোপীয় আধিপত্য কমানোর লক্ষ্যে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশি টি-প্ল্যান্টার কামরান তানভিরুর রহমানের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ব্যবস্থাপকদের পরিবর্তে দেশীয় কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সংখ্যা বাড়ে এবং অনেক সহকারী ব্যবস্থাপক পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে ব্যবস্থাপক হন।
তবে এ পরিবর্তন ছিল মূলত মুখাবয়বের; ক্ষমতার কাঠামোতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ফিনলে, অক্টাভিয়াস স্টিল, শাহ ওয়ালেশ, ম্যাকলয়েড ও ডানকান ব্রাদার্সের মতো ইউরোপীয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলোই শিল্পটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা করপোরেট কাঠামো পাকিস্তান আমলেও প্রায় অক্ষুণ্ন ছিল। ফলে বাঙালিদের জন্য উচ্চপদে প্রবেশের সুযোগ সীমিতই থেকে যায়।
চা-বাগানে বাঙালি প্ল্যান্টারদের প্রবেশ শুরু হয়েছিল চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যদিও তাঁদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ এ পেশায় যোগ দিতে শুরু করলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দেশীয় জনশক্তির উপস্থিতি বাড়লেও পদোন্নতি ও দায়িত্ববণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি।
রিপোর্ট অন ইনভেস্টিগেশন ইনটু ইরিগেটিং টি ইন সিলেট অ্যান্ড চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্টসএ বৈষম্যের একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সিরাজুল আবদালের জীবন থেকে। তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সাকিনা আবদালের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী ১৯৬০ সালে সিরাজুল আবদাল সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হবিগঞ্জ সদরের আউশপাড়া গ্রামের সন্তান সিরাজুল আবদাল যুক্তরাজ্যের বেলফাস্টের খ্যাতনামা সিরোক্কো ওয়ার্ক্সে চাকরির সুযোগ পেয়েও দেশপ্রেমের টানে দেশে ফিরে চা-শিল্পে যোগ দেন। কিন্তু যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও তিনি পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। সৈয়দা সাকিনা আবদালের ভাষ্যমতে, তাঁর স্বামীর সহকর্মী টি-প্ল্যান্টার নূর খান উর্দুভাষী হওয়ায় পদোন্নতি পেয়ে লাক্কাতুরা চা-বাগানের ব্যবস্থাপক হন, অথচ সিরাজুল আবদাল একই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন।
১৯৬৪ সালে প্রকাশিত এম হাবিবুল্লাহর ‘টি ইন্ডাস্ট্রি অব পাকিস্তান’ গ্রন্থ থেকেও বিদেশি আধিপত্যের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়। বিশাল ভূমি-মালিকানা ও উচ্চ উৎপাদনক্ষমতার কারণে পাকিস্তান টি অ্যাসোসিয়েশনে বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রভাব ছিল নিরঙ্কুশ। দেশীয় মালিকানাধীন বাগানগুলোর তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি উৎপাদনশীল জমি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে দেশের মোট চা উৎপাদনের বেশির ভাগই আসত এসব প্রতিষ্ঠানের বাগান থেকে। দলইসহ সিলেটের বহু ঐতিহ্যবাহী চা-বাগান তখনো জেমস ফিনলের মতো ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছিল।
নিবন্ধের সঙ্গে সংযুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটিও সেই সময়ের বাস্তবতার মূল্যবান দলিল। বিজ্ঞপ্তি থেকে বোঝা যায়, চা-বাগানের ব্যবস্থাপক পদ তখনো বিদেশি নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এটি শিল্পটির ওপর ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও বিদেশি প্রভাবের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। একই সঙ্গে দেখা যায়, এলএমএফ (লাইসেনশিয়েট অব মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি) ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদেরও বাগান প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত মর্যাদা দেওয়া হতো, যা সে সময়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। এক দিকে দেশ স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে নিমগ্ন, অন্যদিকে চা-শিল্পের উৎপাদন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা অব্যাহত ছিল। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় সংকটের মধ্যেও চা-রপ্তানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার এ প্রচেষ্টা শিল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ইঙ্গিত বহন করে।
রিপোর্ট অন ইনভেস্টিগেশন ইনটু ইরিগেটিং টি ইন সিলেট অ্যান্ড চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্টসচায়ের কাপে বৈষম্যের স্বাদ
পূর্ব পাকিস্তানের চা-শিল্প শুধু রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত ছিল না; এটি ছিল দুই অংশের পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। উৎপাদন হতো পূর্ব পাকিস্তানে, কিন্তু বাজার, মুনাফা ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।
এ বাস্তবতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক পাকিস্তানের একটি শিরোনামে: ‘৭০ লাখ পাউন্ডের মধ্যে ৬০ লাখ পাউন্ড চা পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছে, চা নিয়ে কেলেঙ্কারী’। সংবাদটি তৎকালীন বাণিজ্যিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত বৈষম্যের দিকটি জনসমক্ষে উন্মোচন করেছিল।
স্বাধীনতার পর প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ‘প্রেজেন্ট সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রসপেক্টস ফর নন-জুট এক্সপোর্টস ইন বাংলাদেশ (১৯৭৪)’ প্রতিবেদন সে চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদিত প্রায় ৬৯ মিলিয়ন পাউন্ড চায়ের মধ্যে ৬১ মিলিয়ন পাউন্ডই পশ্চিম পাকিস্তানে সরবরাহ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে দেখা যায়, ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৯-৭০ সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো চায়ের পরিমাণ ৩৪ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় ৬৮ মিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছায়।
অর্থাৎ চায়ের বাগান ছিল সিলেট ও পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে, শ্রম দিত এখানকার মানুষ, কিন্তু ভোক্তা ছিল পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ। ফলে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শিল্পটির বিপণন ও বাজারনির্ভরতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান মুক্ত হতে পারেনি। উৎপাদনের কেন্দ্র ও ভোগের কেন্দ্রের এ বৈষম্য কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয় ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার অসম অর্থনৈতিক কাঠামোরও প্রতিফলন।
চা-শিল্পের এ অভিজ্ঞতা বৃহত্তর পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান সম্পর্কের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। পাটের মতো চায়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, উৎপাদনের মূল ভার বহন করছিল পূর্ব পাকিস্তান, অথচ বাজার, নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক সুবিধার উল্লেখযোগ্য অংশ কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে চা-শিল্পের ইতিহাস শুধু কৃষি-শিল্প খাতের বিকাশের ইতিহাস নয়; এটি অর্থনৈতিক অধিকার, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবির পেছনের বাস্তবতাগুলোকেও বুঝতে সাহায্য করে।
দৈনিক পাকিস্তান, ০৫ জানুয়ারি ১৯৭১ব্যতিক্রম এক বাঙালি উদ্যোক্তা
পাকিস্তান আমলে সিলেটের চা-শিল্প ছিল মূলত ইউরোপীয় কোম্পানি ও অবাঙালি পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণে। সেই বাস্তবতার মধ্যে আমিনূর রশীদ চৌধুরী ছিলেন এক ব্যতিক্রম উপস্থিতি। তিনি শুধু চা-বাগানের মালিক ছিলেন না, বরং দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার এক সংগঠক, নীতিনির্ধারক ও জনবুদ্ধিজীবী ছিলেন।
১৯৫১ সালে ক্ষুদ্র চা-বাগানগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে আমিনূর রশীদ চৌধুরী পাকিস্তান টি বোর্ডের সদস্য মনোনীত হন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তরের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ক্ষুদ্র চা-বাগানগুলো নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে ছিল এবং ধীরে ধীরে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও গুণগত মানের বিচারে এসব বাগান বৃহৎ বিদেশি মালিকানাধীন এস্টেটগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। এ পরিবর্তনের পেছনে আমিনূর রশীদ চৌধুরীর দূরদর্শী ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘সত্য ও তথ্য’-এ।
চা-শিল্পের নেতৃত্বের অঙ্গনেও আমিনূর রশীদ চৌধুরী নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ১৯৬৩ সালের ২০ মার্চ প্রকাশিত যুগভেরী পত্রিকায় তাঁকে পাকিস্তান টি অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; বরং এমন এক সময়ে চা-শিল্পের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একজন বাঙালি উদ্যোক্তার স্বীকৃতি ছিল, যখন শিল্পটির মূল ক্ষমতাকাঠামো ছিল বহিরাগতদের হাতে।
সিলেটে চা–বাগানের শ্রমিকদেশীয় চা-শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক পরিসরেও আমিনূর রশীদ চৌধুরী ছিলেন সক্রিয়। পাকিস্তান টি বোর্ড ও টি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জেনেভা সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশ নিয়ে তিনি দেশের চা-শিল্পের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি মেলে; তিনি বাংলাদেশি চা সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
তবে আমিনূর রশীদের পরিচয় শুধু উদ্যোক্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সমাজসচেতন নাগরিক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রভাবশালী। সিলেট প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ইস্টার্ন হেরাল্ড এবং সিলেটের প্রাচীনতম বাংলা সাপ্তাহিক যুগভেরীর সম্পাদক হিসেবে চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম, শিল্পের বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে জনমত গড়ে তোলেন। তাঁর লেখনি ছিল একই সঙ্গে প্রতিবাদী, মানবিক ও সমাজসচেতনতামূলক।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমিনূর রশীদ চৌধুরী দ্বিধাহীনভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। অর্থ সংগ্রহ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নজরদারির লক্ষ্যেও পরিণত হন। ১৯৭১ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাস অমানবিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। পরে যুক্তরাজ্যে গিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চা-শিল্পের আধুনিকায়নেও আমিনূর রশীদ চৌধুরীর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা তাঁর ‘মুক্তিপথের অভিযাত্রী আমিনূর রশীদ চৌধুরী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি পুরোনো চা-গাছের কলমায়ন, পতিত জমিতে অধিক ঘনত্বে চারা রোপণ, নালা সংস্কার ও পরিকল্পিত ছায়াগাছ রোপণের মতো আধুনিক কৃষি-কারিগরি পদ্ধতির পক্ষে জোরালো মত দেন। তাঁর এসব উদ্যোগ উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন এবং চায়ের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমিনূর রশীদ চৌধুরী ছিলেন সিলেটের চা-শিল্পে বাঙালির উপস্থিতির এক অনন্য প্রতীক। বিদেশি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে তিনি দেখিয়েছিলেন, দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব ও সাহস থাকলে স্থানীয় উদ্যোক্তারাও শিল্পের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
চা-শিল্পের ইতিহাস তাই কেবল অর্থনীতির ইতিহাস নয়। এটি পুঁজির পুনর্বিন্যাস, উপনিবেশোত্তর ক্ষমতার কাঠামো, শ্রমের সংগ্রাম, ভাষা ও পরিচয়ের সংকট এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসও। সিলেটের বিস্তীর্ণ সবুজ বাগানগুলো কেবল চা উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; তারা গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও নীরব সাক্ষী।
হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, গবেষক