একাকী ইউরোপে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা
· Prothom Alo

একা ঘুরে বেড়ানোর প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয় ২০১৭–১৮ সালের দিকে। তবে বাংলাদেশ থেকে শেনজেন ভিসা পাওয়া বেশ জটিল হওয়ায় তখন আবেদন করা হয়ে ওঠেনি। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর ছয়-সাত মাসের মাথায় প্রথমবার গ্রিসের জন্য ভিসার আবেদন করি। কিন্তু সে সময় পার্টটাইম কোনো চাকরি না থাকা এবং সেমিস্টার চলাকালীন আবেদন করায় ভিসা পাইনি। তবে আমি হাল ছাড়িনি। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরাসরি অন্য কোনো দেশের অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পেয়ে মাল্টার মাধ্যমে আবার আবেদন করি। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই ভিসা পেয়ে যাই। তবে ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র আট সপ্তাহ। হাতে খুব বেশি সময় না থাকায় দ্রুত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ১২ দিনের জন্য বেরিয়ে পড়ি।
ইউরোপের প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের বৈচিত্র্য। শহরভেদে এই আবহ সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। বার্লিন তার বহু সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জন্য পরিচিত, প্রাগের প্রাচীন শহর পথচারীকে এক নিমেষে এক হাজার বছর আগের ইতিহাসে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, আর আমস্টারডামের সরব সাইক্লিং সংস্কৃতি, নৈশজীবন ও নান্দনিক ক্যানেল ক্রুজ যে কাউকে বিমুগ্ধ করতে বাধ্য। ভ্রমণের ক্ষেত্রে থাকার জায়গা খুঁজতে সাধারণ সময়ে বুকিং ডটকম ব্যবহার করলেও এ সফরে বাজেট–সাশ্রয়ী ও বৈচিত্র্যময় সুযোগ থাকায় এক্সপিডিয়ার মাধ্যমে হোস্টেল নির্বাচন করেছি।
Visit casino-promo.biz for more information.
ইউরোপে কম বাজেটের হোস্টেলগুলো একক ভ্রমণকারীদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন। আমস্টারডামে কোনো হোটেলে থাকতে যেখানে রাতপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ পাউন্ড ব্যয় হতো, সেখানে হোস্টেলে মাত্র ৫০ পাউন্ডের মধ্যেই থাকা সম্ভব হয়েছে। যাতায়াতের ক্ষেত্রে আগে থার্ড পার্টি অ্যাপের ওপর নির্ভর করলেও এবার সরাসরি এয়ারলাইনসের অ্যাপ থেকে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছি। পাশাপাশি ট্রেনের টিকিটের জন্য ওমিও বা ট্রেনলাইনের মতো অ্যাপ ব্যবহার করেছি। সার্বিক বাজেটের ক্ষেত্রে প্রতিদিন বা দুই দিনের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের জন্য থাকা, খাওয়া, ঘোরাঘুরি ও ক্যানেল ক্রুজের মতো এক-দুটি নির্দিষ্ট কার্যক্রমসহ ২০০ পাউন্ডের মধ্যে ব্যয় সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছিলাম।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তাই যেকোনো দেশে গেলে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় খাবার খাওয়া এবং সুযোগ থাকলে তাদের স্থানীয় পোশাক পরিধান করে সংস্কৃতিকে ভেতর থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। ইউরোপ সফরের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল ইতালির একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সময় কাটানো। বার্লিন থেকে উড়োজাহাজে মিলান মালপেনসা বিমানবন্দরে নেমে এক ঘণ্টার ট্রেনে ভারসিলিতে পৌঁছাই এবং সেখান থেকে আমার এক ইতালীয় বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে যাই। মূল শহর থেকে গণপরিবহনে সেখানে যেতে প্রায় আট ঘণ্টা লেগে যায়, কারণ গ্রামটি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। আমার পৌঁছানোর পরদিন বন্ধুটি আমাকে তাদের ৬৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী এক ঐতিহাসিক ওয়াইন ফেস্টিভ্যালে নিয়ে যায়, যা প্রতিবছর কাসালেতে উদ্যাপিত হয়। সান জার্মানো নামের সেই গ্রামটি উচ্চমানের পানীয় উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। চার দিনব্যাপী এই উৎসবে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছিল। উৎসবে প্রায় ৬০টি স্টলে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ও বিভিন্ন ধরনের পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছিল, যা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ ও অনন্য এক অভিজ্ঞতা।
এই সফরে আমার বহু চমৎকার স্মৃতি জমেছে। আমস্টারডামের হোস্টেলের পাশের একটি ক্যাফেতে রাত ১০টার দিকে ঐতিহ্যবাহী স্ট্রুপওয়াফেল খেতে গিয়ে চমৎকার এক আড্ডার সূচনা হয়। সেখানে কর্মরত দুজন তরুণীর সঙ্গে দেখা হয় যাদের একজন ইতালীয় এবং অন্যজন গ্রিক। তাদের সঙ্গে গল্পে গল্পে রাত দুটো বেজে যায়। আড্ডার বিষয় ছিল বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশিল্প ও দক্ষিণ এশীয় খাবার। দীর্ঘ কথোপকথনের পর স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তারা আমাকে আমস্টারডামে পরখ করার মতো কিছু বিশেষ খাবারের সন্ধান দেয়।
তাদের পরামর্শ অনুযায়ী পরদিন সকালেই এখানকার অত্যন্ত জনপ্রিয় ফিব এবং পেস্তাচিও-নুটেলা প্যানকেক খাই, যা খাবারের স্বাদে এক দারুণ অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছিল। দারুণ সব স্মৃতি নিয়ে লন্ডনের বাড়িতে ফিরে এই লেখা লিখছি। সবাইকে জীবনের কোনো একটা সময় অচেনা শহরে ঘুরে আসার অনুরোধ রইল।