ইমাম মালেক ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাজহাবের কাহিনি
· Prothom Alo

তিনি ছিলেন মদিনার আলেম। সম্মান করে তাঁকে বলা হতো হিজরতের শহরের ইমাম। তাঁর বাবা আনাস। তিনি মদিনার ফিকহি ঐতিহ্যের প্রধান রূপকার এবং ইসলামের চার প্রধান মাজহাবের একটি ‘মালেকি মাজহাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা।
মদিনায় শৈশব
ইমাম মালেকের পূর্ণ নাম মালেক ইবনে আনাস ইবনে মালেক ইবনে আবু আমের ইবনে আমর ইবনুল হারিস আল-আসবাহি আল-হিমইয়ারি। কুনিয়াত ‘আবু আবদুল্লাহ’। বংশসূত্রে তিনি ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত হিমইয়ারি গোত্রের সদস্য হলেও তাঁর পূর্বপুরুষেরা বহু আগে থেকেই মদিনায় বসতি স্থাপন করেছিলেন।
Visit freshyourfeel.com for more information.
জন্মসন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সামান্য মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে তিনি ৯৩ হিজরি (৭১১-৭১২ খ্রিষ্টাব্দ) খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের শাসনামলে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। (ইমাম নববি, তাহজিবুল আসমা ওয়াল লুগাত, ২/৭৫-৭৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলও ছিল ইলমচর্চায় সমৃদ্ধ। দাদা মালেক ইবনে আবু আমের একজন বিশিষ্ট তাবেয়ি ছিলেন, যিনি খলিফা ওমর, ওসমান ও আয়েশা (রা.)-এর মতো শীর্ষ সাহাবিদের থেকে ইলম গ্রহণ করেন এবং খলিফা ওসমানের যুগে কোরআনের প্রামাণ্য মুসহাফ সংকলন কমিটির সদস্যও ছিলেন।
তাঁর চাচা নাফে ইবনে মালেক এবং আবু সুহাইলও হাদিস বর্ণনায় পরিচিত ছিলেন। এমন পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ইলমচর্চা তাঁর কাছে ছিল রক্তগত উত্তরাধিকার।
যদিও তিনি নিজে বলতেন যে শুধু সেসব শিক্ষকের কাছ থেকেই তিনি হাদিস গ্রহণ করেছেন, যাঁদের তাকওয়া ও ধার্মিকতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন।
ইলমের সন্ধানে সাধনা
জীবিকা বা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার প্রতি না ঝুঁকে ইমাম মালেক তাঁর সমগ্র জীবন হাদিস ও ফিকহের জন্য উৎসর্গ করেন। জীবনীকারদের মতে তিনি ৭০০ থেকে ৯০০ জন শিক্ষকের কাছ থেকে ইলম আহরণ করেছিলেন। (কাজি ইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক, ১/১১৮-১২০)
যদিও তিনি নিজে বলতেন যে শুধু সেসব শিক্ষকের কাছ থেকেই তিনি হাদিস গ্রহণ করেছেন, যাঁদের তাকওয়া ও ধার্মিকতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন:
ইমাম নাফে: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর আজাদকৃত গোলাম ও বিশিষ্ট ছাত্র। ‘মালেক—নাফে—ইবনে ওমর’ সনদটি মুহাদ্দিসদের কাছে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালি সনদ নামে পরিচিত।
ইবনে শিহাব জুহরি: প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস সংগ্রাহক ও তাবেয়ি।
রবিআ ইবনে আবি আবদির রহমান: যাঁর কাছ থেকে ইমাম মালেক ফিকহি ইজতিহাদ ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের পদ্ধতি শেখেন।
আস-সাখতিয়ানি, ইয়াহিয়া ইবনে সাইদ আল-আনসারি, আবদুল্লাহ ইবনে দিনার, যায়েদ ইবনে আসলাম প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। (ইমাম জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ১১/১৭৫, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)।
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজির বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইহাদিসের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান
ইমাম মালেকের কাছে হাদিস শুধু মুখস্থবিদ্যা ছিল না; বরং তা ছিল অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়। সাধারণ ফতোয়া প্রদানকালে তিনি স্বাভাবিক আচরণ করলেও নবীজির হাদিস বর্ণনার সময় অসাধারণ আদব প্রদর্শন করতেন।
হাদিসের দরসে বসার আগে তিনি পূর্ণাঙ্গ গোসল করতেন, পরিচ্ছন্ন পোশাক ও পাগড়ি পরতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং একটি উঁচু আসনে বসতেন; মজলিশে সুগন্ধি ধূপ জ্বালানো হতো।
এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, ‘আমি নবীজির পবিত্র বাণীর প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করাকে ভালোবাসি।’ (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/১৫০, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
শ্রুতি আছে, হাদিস বর্ণনাকালে দংশনকারী পোকার আঘাত সহ্য করেও তিনি নিজের আসন থেকে নড়তেন না।
ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.)আমি তত দিন মসজিদে নববিতে ফতোয়া ও হাদিসের দরসে বসিনি, যত দিন না মদিনার ৭০ জন শীর্ষ আলেম একবাক্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে আমি এই পদের যোগ্য।মদিনার আলেমদের স্বীকৃতি
ইমাম মালেক নিজে থেকে কখনো কোনো পদের দাবিদার হননি। তিনি বলতেন, ‘আমি তত দিন মসজিদে নববিতে ফতোয়া ও হাদিসের দরসে বসিনি, যত দিন না মদিনার ৭০ জন শীর্ষ আলেম একবাক্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে আমি এই পদের যোগ্য।’ (কাজি ইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক ওয়া তাকরিবুল মাসালিক, ১/১৪২)
মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি মসজিদে নববির রওজাতুল জান্নাহর নিকটবর্তী স্থানে দরস ও ফতোয়া দেওয়া শুরু করেন। এর ফলে তিনি প্রায় ষাট বছরেরও অধিক সময় ধরে (১১৩/১১৪ হি. থেকে ১৭৯ হি. পর্যন্ত) নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞানদান করে যান। জীবনের শেষভাগে বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তিনি নিজ বাড়ি থেকেই শিক্ষাদান অব্যাহত রাখেন।
মালেকি মাজহাবের ভৌগোলিক বিস্তার
মিসর, উত্তর আফ্রিকা, আন্দালুস (স্পেন), ইরাক, হেজাজসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে আসতেন। উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, আবদুল্লাহ ইবনে মাসলামা আল-কানাবি, আসাদ ইবনুল ফুরাত, ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া আল-লাইসি (মুয়াত্তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রিওয়ায়াতকারী), ইবনুল কাসিম ও আশহাব (রহ.)।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) মদিনায় এসে ইমাম মালেকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তির প্রশংসা করেছিলেন। এই বিশাল ছাত্রকাফেলার হাত ধরেই মালেকি মাজহাব ও মদিনার হাদিসচর্চা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে মালেকি মাজহাব মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, সুদান এবং পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে (নাইজেরিয়া, সেনেগাল, মালি প্রভৃতি) প্রধান ফিকহি ধারা হিসেবে অনুসৃত হয়ে আসছে; উপসাগরীয় অঞ্চলেও এর অনুসারী রয়েছে।
রাজনৈতিক পরীক্ষা
ইমাম মালেকের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ক্ষমতাসীনদের সামনে সত্য প্রকাশে তাঁর নিঃসংকোচ দৃঢ়তা। ১৪৭ হিজরিতে (আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের শাসনামলে) তিনি একটি হাদিস বর্ণনা করেন, ‘জবরদস্তিমূলক তালাক কার্যকর নয়’।
ইমাম জুওয়াইনির চিন্তায় আলেমদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাযা তৎকালীন মদিনার গভর্নর জাফর ইবনে সুলাইমানের রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, কারণ এটি আব্বাসীয়দের প্রতি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের শপথকে দুর্বল করে দিত।
এর ফলস্বরূপ তাঁকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করা হয় বলে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন, যাতে তাঁর কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়ে যায়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১০/১৭৪-১৭৫)
এই ঘটনার পরও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি, বরং পরবর্তীকালে খলিফা মানসুর নিজেই এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ইমাম মালেকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অব্যাহত রাখেন। (কাজি ইয়াজ, তারতিবুল মাদারিক, ২/৪১-৪৩)
পরবর্তী ইমামদের দৃষ্টিতে ইমাম মালেক
সমকালীন ও পরবর্তী যুগের ইমামগণ একবাক্যে তাঁর বিশ্বস্ততা ও অসাধারণ মেধার স্বীকৃতি দিয়েছেন:
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, ‘মালেক হলেন ইলমের ক্ষেত্রে একজন অবিসংবাদিত ইমাম ও সায়্যিদ; তিনি সুন্নাহ ও সাহাবিদের আমল অনুসরণে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য।’
আবদুর রহমান ইবনে মাহদি (রহ.) বলেন, ‘আমি জমিনের বুকে সুন্নাহর হেফাজতে ইমাম মালেকের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কাউকে দেখিনি।’
ইয়াহিয়া ইবনে মইন বলেন, ‘ইমাম মালেক আল্লাহর জমিনে তাঁর হুজ্জত বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।’
ইমাম বোখারি (রহ.) সহিহ বুখারির সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ হিসেবে ‘মালেক আন নাফে আন ইবনে ওমর’-কে চিহ্নিত করেছেন। (ইমাম মিজজি, তাহহিবুল কামাল ফি আসমাইর রিজাল, ১৮/২৬৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯২)
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) জমিনের বুকে আল্লাহর কিতাবের পর মালেকের আল–মুআত্তার চেয়ে বিশুদ্ধ ও কল্যাণকর কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি।‘আল-মুআত্তা’ ও ফিকহি পদ্ধতি
ইমাম মালেকের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি আল-মুআত্তা। হাদিস সংকলনের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। জীবনীকারদের বর্ণনামতে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এই গ্রন্থ পরিমার্জন করেন এবং বহুবার এটি মদিনার আলেমদের কাছে পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করেন, যাতে শুধু ব্যাপকভাবে গৃহীত বিষয়বস্তুই সংকলিত হয়।
গ্রন্থটির বিভিন্ন রিওয়ায়াত (বর্ণনাধারা) প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ইয়াহিয়া ইবনে ইয়াহিয়া আল-লাইসির রিওয়ায়াতটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও ব্যাপকভাবে মুদ্রিত হয়েছে; এতে প্রায় ১,৮০০-এর অধিক হাদিস, আসার ও ফতোয়া সংকলিত হয়েছে।
আল-মুআত্তা গ্রন্থের একটি স্বাতন্ত্র্য হলো, এতে শুধু হাদিসই নয়, বরং সাহাবা ও তাবেয়িদের ফতোয়া এবং মদিনাবাসীর নিয়মিত আমলকেও আইনি দলিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—যা মালেকি ফিকহের একটি মূলনীতি হিসেবে পরিচিত।
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ইমাম বোখারির সংকলনের পূর্ববর্তী যুগে এই গ্রন্থ সম্পর্কে ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, ‘জমিনের বুকে আল্লাহর কিতাবের পর মালেকের মুআত্তার চেয়ে বিশুদ্ধ ও কল্যাণকর কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি।’
মালেকি ফিকহের পদ্ধতিতে তিনি যেসব উৎস ব্যবহার করতেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, আমালু আহলিল মাদিনা, কিয়াস, ইসতিহসান, সাদ্দুজা জারায়ে (ক্ষতির পথ রুদ্ধ করা), এবং মাসলাহা মুরসালা (জনকল্যাণভিত্তিক বিধান); যা পরবর্তীকালে ইসলামি আইনশাস্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। (ওয়াহবা জুহাইলি, উসুলুল ফিকহিল ইসলামি, ২/৭৫২-৭৬৮)
আল-মুআত্তা ছাড়াও তাঁর ফতোয়া সংকলিত হয়েছে আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা গ্রন্থে। এ ছাড়া তাঁর তাফসিরু গারিবিল কুরআন ও রিসালাতুন ফির রদ্দি আলাল কাদরিয়্যাহ ওয়াল মুরজিয়াহ প্রভৃতি রচনাও উল্লেখযোগ্য।
ইন্তেকাল
জ্ঞান, তাকওয়া ও সুন্নাহর সেবায় প্রায় ৮৫ বছরের দীর্ঘ বরকতময় জীবন শেষে ১৭৯ হিজরির ১৪ রবিউল আউয়াল (৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) ইমাম মালেক (রহ.) ইন্তেকাল করেন, তখন আব্বাসীয় খলিফা ছিলেন হারুনুর রশিদ। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ১০/১৭৪)
মদিনার গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন এবং তাঁকে মদিনার ঐতিহাসিক কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’-তে সমাহিত করা হয়।
আহমাদ সাব্বির : প্রাবন্ধিক ও গবেষক