ট্রাম্প-সি বৈঠকে অর্জন কম, তাতেও কেন খুশি চীন

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বৈঠক করেছেন। ওয়াশিংটনে বৃহস্পতিবার এ বৈঠকে দুই নেতা উপহার বিনিময় করেছেন, একে অপরকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, বাড়িয়েছেন বাণিজ্য নিয়ে সমঝোতার মেয়াদ। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিকাশের কারণে দেখা দেওয়া ঝুঁকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।

Visit freshyourfeel.org for more information.

মাস চারেক আগে সর্বশেষ একসঙ্গে বসেছিলেন ট্রাম্প–সি। আর সির এবারের সফরের মধ্য দিয়ে এক দশকের বেশি সময় পর চীনের কোনো নেতা ওয়াশিংটন গেলেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির মধ্যে উত্তেজনা কমাতে আয়োজিত এ বৈঠকে যদিও উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। সির উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিক দিয়ে দেখলে, এর বেশি কিছু চীনের প্রয়োজনও ছিল না।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়

বৈঠকের রাতেই হোয়াইট হাউসে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে ওয়াশিংটন–বেইজিং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন সি। নৈশভোজে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে এটাই উঠে এসেছে যে চীনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং উপকারী হতে পারে। সি বলেন, ‘দুই দেশের বন্ধুত্বের সামনে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আসুন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাই।’

বৈঠকে দুই নেতার বক্তব্যের সুর মোটামুটি একই ছিল। ট্রাম্পের যে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান রয়েছে, তার সঙ্গে নিজের ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ পরিকল্পনার তুলনা করেন সি। এটি কয়েক দশকের একটি পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য হলো বিশ্বমানের সামরিক বাহিনী, শিল্প ও প্রযুক্তি সক্ষমতা তৈরি করা, আর এর মাধ্যমে চীনকে একটি বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রে পরিণত করা।

চীনের প্রেসিডেন্টকে লাল গালিচা সংবর্ধনার সময় বি–১ বোমারু বিমানের শব্দে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখভঙ্গি

এই লক্ষ্য অর্জনে সি যেসব অসামান্য অগ্রগতি পেয়েছেন, তার কারণে মার্কিন কর্মকর্তারা সুরক্ষামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে চীন থেকে পণ্য আমদানি, দেশটিতে বিনিয়োগ এবং সেখানে মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ। তবে এসব করেও তাঁরা যে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারছেন না, তার বিভিন্ন প্রমাণ বাস্তবেই দেখা যাচ্ছে।

যেমন মার্কিন পদক্ষেপের পরও চীনের রপ্তানি রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। এআই ও রোবট খাতে দ্রুত এগোচ্ছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামাল—যেমন বিরল খনিজের ওপরও চীনের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ কারণে এবারের সফরে সি বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তাই আপাতত বাস্তব অর্জনের চেয়ে বাহ্যিক আয়োজন চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

এর আগে মে মাসে যখন ট্রাম্প বেইজিং সফর করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে বড় একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ছিল। তবে এবার ওয়াশিংটনে কোনো ব্যবসায়ী দল নিয়ে আসেননি সি।

কূটনৈতিক পুনরাবৃত্তি

যুক্তরাষ্ট্র–চীন দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও সরবরাহব্যবস্থাকে বড় পরিবর্তনের মুখে ফেলেছে। তাই চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হওয়াকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছিলেন। তবে এবার সির সফর যেন গত মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মতোই। সেবারও বড় বড় প্রতীকী আয়োজন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ছিল কম।

চীনের প্রেসিডেন্টের সফর চলাকালে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে তিব্বতের ‘মুক্তির’ দাবিতে বিক্ষোভ

তখন থেকে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েই চলেছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি। এরই মধ্যে সামনে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এদিকে আবার সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যমকে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি সম্প্রচার করেনি।

ইরানকে চীনের সহায়তা গ্রহণযোগ্য নয়, সিকে বললেন ট্রাম্প: মার্কিন রাষ্ট্রদূতহোয়াইট হাউসে বৃহস্পতিবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিন পিং

এর আগে মে মাসে যখন ট্রাম্প বেইজিং সফর করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে বড় একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ছিল। তবে এবার ওয়াশিংটনে কোনো ব্যবসায়ী দল নিয়ে আসেননি সি। বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক কুই হংজিয়ান সিএনএনকে বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশ এখনো কোনো বড় ধরনের অর্জন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে তাঁর দলের কিছু সদস্যের ইতিবাচক মনোভাব কম—এমন উদ্বেগ রয়েছে বেইজিংয়ের। সিএনএনকে এ কথা বলেছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা উ সিনবো নিজেই। আসলে ওয়াশিংটনে সিকে লালগালিচায় অভ্যর্থনা এবং দুই নেতার প্রশংসায় ভরা বক্তব্যের বাইরে দুই দেশের মূল বিরোধগুলো থেকেই গেছে।

সিকে কী খাওয়ালেন ট্রাম্প, নৈশভোজে কারা ছিলেন

যেসব বিষয়ে বিরোধ

সি চিন পিংয়ের অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমিয়ে আনা। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। এই দ্বীপ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে আনাটা সির ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি এসেছে বলে জানিয়েছে চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া।

বৈঠকে ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন সি—এমনটাই বলছে সিনহুয়া। আসলে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ইচ্ছা করেই দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে ওয়াশিংটন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ নামে যে আইন রয়েছে, সে অনুযায়ী তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য দ্বীপটির কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে বাধ্য ওয়াশিংটন।

হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিইউয়ানকে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানকুই হংজিয়ান, গবেষক, বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটিব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশ এখনো কোনো বড় ধরনের অর্জন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সঙ্গে সমন্বয় করে এআইয়ের উন্নয়ন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন সি। অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে এআইয়ের ওপর আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের কথা উঠছে। বিশেষ করে এআইয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের শীর্ষ দুই শক্তি হওয়ায় বিষয়টি তাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াইট হাউসে ভাষণ দেওয়ার আগে সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

উন্নত এআই মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় রাশ টানার বিষয়ে একমত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের নেতারা। তবে ট্রাম্প বলেছেন, এআই নিয়ে যে ভয় তৈরি করা হচ্ছে, তা একটি ‘ভাঁওতা’। আর এর মাধ্যমে চীনই লাভবান হচ্ছে। এআই খাতে চীন যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আসলেই মাকিন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তাঁদের এআই মডেল নকল করার অভিযোগ তুলেছেন। চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও বলছেন তাঁরা। চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার সি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে পরিস্থিতি সে পর্যন্ত গড়াবে না বলেই মনে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান বজায় রাখা উচিত।’

ট্রাম্পের চোখে ‘দারুণ বন্ধুত্ব’, সিও কি তা-ই মনে করেনপ্রেসিডেন্ট সিকে প্রথা ভেঙে স্বাগত জানালেন ট্রাম্প, সম্পর্কের বরফ কি গলবে

Read full story at source