কলম্বোর পথঘাট ও নাগরিক জীবন যেমন দেখলাম
· Prothom Alo

কানাডা হতে কলম্বো এসেছি সপ্তাহখানেক হলো। কলম্বো শহরের দর্শনীয় স্থান যেমন ঘোরা হচ্ছে, তেমনই ঘুরছি কলম্বোর অলিগলি। উদ্দেশ্য একটা স্থানীয় সংস্কৃতি, মানুষ, জীবনাচার খুব নিকট হতে দেখা। যাহোক দিন যত যাচ্ছে, কলম্বো আমাকে তত মুগ্ধ করছে। প্রতিদিন কিছু না কিছু বিষয় চোখে পড়ছে এবং অনেক কিছুই বেশ ভালো লেগেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে—প্রায় প্রতিটি পাড়ামহল্লার মোড়ে বা ভেতরের গলিতে পরিচ্ছন্ন মাংস ও মাছের দোকান (মিট ও ফিশ শপ)। হালাল বা হারাম কি না জিজ্ঞেস করে নিজে বিব্রত হবেন না। সুপারশপ বা কাঁচা বাজারের পাশাপাশি এসব দোকানে মূলত মুরগি ও খাসির মাংস পাওয়া যায়। ক্ষেত্রবিশেষে মুসলিম–অধ্যুষিত এলাকায় গরুর মাংসও মিলবে। কাটাকাটির বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই, সবকিছু সুন্দর ও পরিষ্কার করে তৈরিই রাখা থাকে। পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশ দিলেই দোকানি বা সেলসম্যান মেপে বুঝিয়ে দেয়।
Visit chickenroadslot.pro for more information.
আমাকে প্রায় প্রতিদিন বাজারে যেতে হয়। কারণ, এয়ারবিএনবিতে আমি নিজে রান্না করে খাই। মাছের বাজার খারাপ না। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো এখানে মাছের দোকান মানেই পানি ও কাদায় মাখামাখি নোংরা পরিবেশ নয়। মাছের দোকানগুলো এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন যে স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করা যায়। বেশির ভাগই সামুদ্রিক মাছ, তবে ছোট-বড় সব ধরনের মাছই মেলে। দরদাম করার কোনো সুযোগ নেই, প্রতিটি দোকানেই দাম একদম নির্ধারিত।
মোড়ে মোড়ে লটারির বুথ...
কলম্বোর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির মোড়ে ছোট ছোট গুমটিঘরের মতো দোকান চোখে পড়ে। এগুলো মূলত সরকারি লটারি বিক্রির বুথ বা স্টল। প্রতিদিন সকালে বেশ কৌতূহল নিয়ে লক্ষ করতাম—অনেক বয়স্ক মানুষ এসব স্টলের সামনে কেন ভিড় জমিয়েছেন, আর স্ক্র্যাচ কার্ড ঘষে অধীর আগ্রহে কিসের নম্বর মেলাচ্ছেন!
দৃশ্যটি দেখে বেশ পরিচিত মনে হলো, কারণ কানাডার মন্ট্রিয়লেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখেছি। উৎসাহী হয়ে টিকিটের দিকে চোখ রাখতেই সিংহ চিহ্নিত একটি বিশেষ লোগো এবং সিংহলি ও তামিল হরফে লেখা চোখে পড়ে। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, এটি শ্রীলঙ্কার জাতীয় লটারি বোর্ডের সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত লটারি। সাধারণ মানুষ বেশ স্বল্প দামে—২০, ৩০ বা ৫০ রুপিতে এই টিকিটগুলো কিনে থাকেন। টিকিটের গায়ে বারকোড, নির্ধারিত নম্বর এবং ড্রর তারিখ উল্লেখ থাকে। নির্ধারিত দিনে ড্র অনুষ্ঠিত হয় এবং বিজয়ী নম্বর মিললে পুরস্কারের অর্থ দেওয়া হয়। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে এখানকার খেটে খাওয়া মানুষের বিরাট অংশ এসব দোকানে ভিড় জমায়।
সেলুনের প্রাচুর্যের শহর...
আরেকটি বিষয় বেশ চোখে পড়েছে—এ শহরে অসংখ্য সেলুন ও বিউটি পার্লার! আমি মন্ট্রিয়ল কিংবা ঢাকায় এত সেলুন কখনোই দেখিনি। কিছুটা হেঁটে গেলেই একটার পর একটা সেলুন চোখে পড়বেই। এই দৃশ্য দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, কলম্বোকে কি ‘সেলুনের শহর’ বললে খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে? নিশ্চয়ই না।
নাইটলাইফ জমজমাট...
একজন পর্যটক হিসেবে রাতের কলম্বোর অভিজ্ঞতা পেতে ঘুরে দেখতে গিয়ে শহরের এক রঙিন রূপ চোখে পড়েছে। এখানে নাইটলাইফ উপভোগ করার জন্য রয়েছে অসংখ্য ক্লাব, বার, ডিসকো ও আন্তর্জাতিক মানের ক্যাসিনো। কেউ বারের বাইরে পান করতে চাইলে সরকারি নির্দিষ্ট লিকার স্টোর থেকে সহজেই অ্যালকোহল কিনতে পারেন।
বিশেষ করে উইকএন্ডে তরুণ-তরুণী ও বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিতে বার ও ক্যাসিনোগুলো বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। এ ছাড়া শহরের নাইটলাইফের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো বিভিন্ন রুফটপ রেস্টুরেন্ট, যা গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। এসব রুফটপ থেকে রাতের কলম্বো শহরের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে সুন্দর কিছু সময় অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শ্রীলঙ্কা সরকার কলম্বোকে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে—বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক নগরী হিসেবে। কলম্বোর বাণিজ্যিক ও উপকূলীয় অংশে নাইটলাইফ বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। বেশির ভাগ ক্যাসিনো, আভিজাত্যপূর্ণ বার ও রুফটপ রেস্টুরেন্টগুলোর অবস্থান এই অংশে। কোল্লুপিতিয়া (Kollupitiya) সমুদ্রসংলগ্ন এলাকাটিতে চোখে পড়েছে প্রচুর নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো ও পাব। ক্যাসিনো ও লাক্সারি নাইটলাইফের জন্য এটিই নাকি কলম্বোর প্রধান কেন্দ্র। গালে ফেস গ্রিন, মেরিন ড্রাইভ কিংবা সিনামন গার্ডেনসে অসংখ্য বার, পাব, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাসিনো রয়েছে। অন্যদিকে কোট্টে হচ্ছে কলম্বোর প্রশাসনিক অঞ্চল, তাই সেখানে সন্ধ্যার পর সবকিছু ঝিমিয়ে পড়ে। নাইটলাইফের তেমন কোনো জৌলুশ সেখানে চোখে পড়েনি। এ অঞ্চলে থেকে থেকে আমিও নিরামিষাশী হয়ে গেলাম! হা হা হা।
শুক্রবার দুপুরে বিশেষ কাজ থাকায় যেতে হয়েছিল বাংলাদেশ দূতাবাসে। কাজ সেরে সারা বিকেল ও সন্ধ্যা কলম্বোর বাণিজ্যিক অংশে কেটেছে। লোটাস টাওয়ারের পাশে বিশাল ক্যাসিনোতে দেখলাম বিকেল হতেই মানুষের পদভারে মুখরিত। লাখো রুপির নেশায় মানুষ ক্যাসিনোর মেশিন কিংবা নানান পদের খেলায় বুঁদ হয়ে আছে।
আমরা ঘুরতে ঘুরতে কোল্লুপিতিয়ায় ভারত মহাসাগরের পাড়ে গালে ফেস গ্রিন চলে আসি। এখানে এসে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। প্রচুর হাইরাইজ বিল্ডিং আর আলোর রোশনাইতে চারদিক ঝলমল করছে। প্রায় হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো হয় চীন না হয় ভারতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের। চীন আর ভারতের বড় বড় বিজনেস গ্রুপের প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ছে। আর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির চাকাও শক্ত ভিত্তি পেয়ে দ্রুতলয়ে ভালো অবস্থানে চলে আসছে।
কোল্লুপিতিয়ায় ফাইভ স্টার ও তারকামানের হোটেলের ছড়াছড়ি। রাতের আলো-আঁধারিতে গালে ফেস গ্রিনের মেরিন ড্রাইভওয়েতে ভারত মহাসাগরের গর্জন আর শীতল হাওয়া মনকে সতেজ ও ফুরফুরে করে দেয়। রাত আটটায় গালে ফেসে দাঁড়িয়ে যত দূর চোখ যায়, চারদিকে কেবল আভিজাত্যপূর্ণ রেস্টুরেন্ট, বার, ক্যাসিনো আর পাব। চোখধাঁধানো আলোর ঝিকমিকি আর সুরের মূর্ছনায় তখন সবে জমতে শুরু করেছে রাতের কলম্বোর বাণিজ্যিক অংশ।
কলম্বো কেবল একটি শহর নয়। এর ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও নাগরিক জীবনের এক চমৎকার সংমিশ্রণ রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এ শহর খুবই ফ্রেন্ডলি। ভারত মহাসাগরের পাড়ে উদ্দীপ্ত নাইটলাইফ—সব মিলিয়ে এই শহরের প্রতিটি খণ্ডচিত্রই যেন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। বহুজাতিক বিনিয়োগের ছোঁয়ায় লঙ্কার অর্থনীতি যেমন গতি ফিরে পাচ্ছে, তেমনি দিনশেষে সাগরের ঠান্ডা হাওয়া আর রঙিন শহরের আলোঝলমলে রূপ যেকোনো ভ্রমণকারীর হৃদয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী ভালো লাগার ছাপ রেখে যায়। কলম্বোর পথঘাট আর মানুষের এই সহজ-সরল জীবনের ছন্দ দেখতে দেখতে সত্যিই মনে হয়—এ শহর যেমন চেনা, তেমনি রূপকথার মতো নতুন!