হাতে স্মার্টফোন থাকলেও দাঁড়িয়ে ছাপা পত্রিকা পড়েন তাঁরা
· Prothom Alo
হাতে স্মার্টফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। তবে কারও চোখ ফোনের পর্দায় নেই। সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন ছাপা পত্রিকা। নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী খবর বেছে নিচ্ছেন তাঁরা।
গাইবান্ধা শহরের মহুরীপাড়া কাঠপট্টি এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আসাদুজ্জামান পত্রিকাফলকের সামনে গত রোববার দুপুরে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। সেখানে পত্রিকা পড়ছিলেন শহরের পশ্চিমপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী সুজন প্রসাদ (৫৫)। তিনি বলেন, ‘ফোনে বেশিক্ষণ পত্রিকা পড়লে চোখ ক্লান্ত হয়ে যায়। ভালো লেখকের কলামগুলোও অনেক সময় পাওয়া যায় না। তাই ছোটবেলা থেকেই ছাপা পত্রিকা পড়ি। পত্রিকা পড়া নেশা হয়ে গেছে।’
Visit sportbet.rodeo for more information.
সুজন প্রসাদ জানান, আগে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পত্রিকা রাখতেন। গত ছয় মাস ধরে সংস্কারকাজের জন্য দোকান বন্ধ। কিন্তু পত্রিকা পড়া বন্ধ রাখেননি।
একই ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছিলেন গাইবান্ধা শহরের কলেজপাড়া এলাকার মো. মোদাচ্ছেরুজ্জামান (৫৭)। তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। মোদাচ্ছেরুজ্জামান বলেন, অফিসে পত্রিকা থাকলেও কাজের ব্যস্ততায় পড়ার সুযোগ হয় না। বিকেলে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে এখানে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়েন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আসাদুজ্জামান পত্রিকাফলক। সম্প্রতি গাইবান্ধা শহরের মহুরীপাড়া এলাকায়গাইবান্ধা শহরের পৌরপার্কের ভেতরেও রয়েছে আরেকটি পত্রিকাফলক। সোমবার সকালে সেখানে কথা হয় শহরের খানকাহ শরিফ এলাকার ব্যবসায়ী শাহ আলমের (৪৮) সঙ্গে। সকালে হাঁটতে বের হয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে পত্রিকা পড়েন তিনি। শাহ আলম বলেন, ‘ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসলে ক্রেতাদের চাপে পত্রিকা হাতে নিতে পারি না। তাই সকালে হাঁটাহাঁটির সময় এখানে পত্রিকা পড়ি। ফলকে পড়লে হাতে পত্রিকাও ধরতে হয় না, সহজেই পড়া যায়।’
পৌরপার্কে আসা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক হাসান আলী (৬০) ফলকে পত্রিকা পড়ছিলেন। তাঁর কাছে এটি বিনা মূল্যে খবর পড়ার সুযোগ। তিনি বলেন, ‘আমার ডায়াবেটিস আছে। পার্কে এসে হাঁটাহাঁটি করি। ক্লান্ত হলে ফলকের সামনে এসে পত্রিকা পড়ি, তারপর বাড়ি চলে যাই।’
মাজেদুর রহমান, উপদেষ্টা, বীরপ্রতীক এটিএম খালেদ দুলু স্মৃতি সংসদপৌরপার্কে প্রতিদিন নানা বয়সী মানুষের সমাগম হয়। তরুণ ও যুবকেরা বেশি আড্ডা দেন। ফলকটি থাকায় তাঁদের মধ্যে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠছে।যেভাবে গড়ে ওঠে দুটি পত্রিকাফলক
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আসাদুজ্জামান পত্রিকাফলকটি ১৯৭৬ সালে গাইবান্ধা শহরের মহুরীপাড়া কাঠপট্টি এলাকায় নির্মাণ করা হয়। ফলকটির অবস্থান বড় একটি কড়ইগাছের নিচে। এক পাশে পুকুর, অন্য পাশে গাইবান্ধা রেলস্টেশনে যাতায়াতের সড়ক।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘কর্মীর হাত’-এর সহসভাপতি রকিবুল হক চৌধুরীর উদ্যোগে ফলকটি নির্মিত হয়। এতে আর্থিক সহায়তা করেন ঢাকার নাহিদ কটন মিলস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নাহিদ ফাউন্ডেশনের পরিচালক আবদুল ওয়াহিদ। ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে ফলকটি নির্মিত হয়। প্রায় ৫০ বছর ধরে নাহিদ ফাউন্ডেশন পত্রিকার বিল ও লাগানোর খরচ বহন করে আসছে।
রকিবুল হক জানান, যাঁদের নিয়মিত পত্রিকা কেনার সামর্থ্য নেই, তাঁদের কথা মাথায় রেখেই ফলকটি করা হয়েছিল।
বীরপ্রতীক এটিএম খালেদ দুলু পত্রিকাফলক। সম্প্রতি গাইবান্ধা শহরের পৌরপার্কেপৌরপার্কের বীরপ্রতীক এটিএম খালেদ দুলু পত্রিকাফলকটি ১৯৯২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নির্মাণ করে বীরপ্রতীক এটিএম খালেদ দুলু স্মৃতি সংসদ। এতে তিন লাখের বেশি টাকা ব্যয় হয়। প্রায় ৩৪ বছর ধরে এখানে নিয়মিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা রাখা হচ্ছে। স্মৃতি সংসদের উপদেষ্টা মাজেদুর রহমান নিজ উদ্যোগে পত্রিকা কিনে দেন। শুরুতে পত্রিকা লাগানোর কাজ করতেন শহরের পূর্বপাড়ার বাদশা মিয়া। ২০০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রায় ২০ বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে পত্রিকা লাগাচ্ছেন স্থানীয় সৈয়দ নাছির উদ্দিন আহম্মেদ, স্থানীয়ভাবে যিনি কামরুল নামে পরিচিত। পৌরপার্কের সামনেই ছেঁড়া টাকা বদলের ব্যবসা করে সংসার চালান তিনি। প্রতিদিন সকালে তিনি পত্রিকাফলকে পত্রিকা আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেন। একটি জাতীয় দৈনিকের দুটি কপি লাগানো হয় যাতে সব পৃষ্ঠা পড়া যায়।
মাজেদুর রহমান বলেন, পৌরপার্কে প্রতিদিন নানা বয়সী মানুষের সমাগম হয়। তরুণ ও যুবকেরা বেশি আড্ডা দেন। ফলকটি থাকায় তাঁদের মধ্যে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠছে।
ছাপা পত্রিকার পাঠক কমেছে
গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশনসংলগ্ন ‘পত্রিকা বিতান’-এর মালিক ও সংবাদপত্রের প্রতিনিধি আবদুর রহমান জানান, ২০২০ সালের আগে জেলা শহরে সব দৈনিক মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার কপি পত্রিকা বিক্রি হতো। করোনা মহামারির পর বিক্রি কমে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার কপিতে নেমেছে। তাঁর মতে, অনলাইনে সহজে খবর পাওয়ায় ছাপা পত্রিকার প্রতি আগ্রহ কমেছে। তবে তিনি মনে করেন, প্রচারসংখ্যা কমলেও ছাপা পত্রিকা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।
সময় বদলেছে, বদলেছে খবর পাওয়ার মাধ্যমও। কিন্তু গাইবান্ধার দুটি পত্রিকাফলকের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায়, ছাপা পত্রিকায় মানুষের চোখ রাখার অভ্যাস এখনো রয়ে গেছে।