ভারতে ভোট চুরির অভিযোগ: প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত বিরোধীরা
· Prothom Alo

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন সাফাই দিলেও বিরোধীরা খড়্গহস্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে বিরোধী নেতাদের কেউ কেউ তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন। কেউ বলেছেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হোক।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে পুরোনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী নতুন করে ভোট গ্রহণ হোক।
Visit esporist.org for more information.
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন সার্বিক বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়ে। এভাবে কমিশন আগে কখনো বেআবরু হয়নি।
বুধবার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে পুরো দেশ নড়ে যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি ক্ষেত্রে তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। আপত্তি জানিয়েছেন। সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি এ কথাও লেখা হয়, এক দিনে তাঁরা চারবার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কখনো তাঁদের ওজর–আপত্তি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, কমিশনে আলোচনা চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা গেলেও সব সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। বলা হয়, নির্বাচন কমিশন এক বহু সদস্যবিশিষ্ট সাংবিধানিক সংস্থা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ভিন্নমত বা মতপার্থক্য উঠে আসা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আংশিক তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের একাংশ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
নির্বাচন কমিশনের এই ব্যাখ্যা আদৌ আমলে নিচ্ছে না বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। সবাই নিজের মতো করে দাবি তুলতে শুরু করেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী অনেক আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের ‘ভোট চুরি’ নিয়ে সরব। বুধবার এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘ভোট চুরি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে ঘটা এক অপরাধ। এটা আমাদের সংবিধানের ওপরেও সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস ও নির্বাচন কমিশন এই ভোট চুরি করেছে। তারা দেশদ্রোহী। তাদের বিচার হবেই।’ ভিডিও শেয়ার করে রাহুল বলেছেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী কর্তাদের বলতে চাই, আপনারা যা করেছেন, তা অপরাধ। দেশদ্রোহিতা। দেশবিরোধী কাজ। ভুলে যাবেন না, সময় আসবে। আমরা আপনাদের ধরব। কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না।’
ছেড়ে দেননি আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার নিজের ইচ্ছেমতো নির্বাচন কমিশনকে পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা রুজু করা হোক। এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করা হোক এবং দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় বিধানসভার ভোট বাতিল করে পুরোনো তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন হোক। প্রায় একই দাবি জানিয়েছেন শিবসেনা (উদ্ধব) নেতা উদ্ধব ঠাকরে। বুধবার তিনি বলেন, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে আবার ভোট করানো হোক।
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মুখর হন। তিনি বলেন, এমনটাই যে হবে, সেই আশঙ্কা তাঁরাই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন। সে কারণেই জ্ঞানেশ কুমারের ইমপিচমেন্ট (অভিশংসন) চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, জ্ঞানেশের জন্যই বিজেপি ২০২৪ সালের ভোটে জিতেছে। পরের দুই বছর যত ভোট হয়েছে প্রতিটিতেই কমিশনের বদৌলতে তারা জয় পেয়েছে। ২০২৬ সালেও পশ্চিমবঙ্গে ভোট লুট করে জিতেছে। মমতার দাবি, যেসব ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাঁদের তালিকাভুক্ত করতে হবে। যে রাজ্যে বিজেপি জিতেছে, সেখানে পুরোনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোট করাতে হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার যতক্ষণ সিইসি (প্রধান নির্বাচন কমিশনার) পদে বহাল থাকবেন, ততক্ষণ ভারতজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলবে। তাঁকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো প্রয়োজন। এই পদটি তাঁর মতো কোনো ব্যক্তির জন্য নয়। এটা স্বাধীনতার জন্য আরেকটি লড়াই, এবার এই আপসকারী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং ভারতকে ধ্বংস করে দেওয়া বিজেপির হাত থেকে মুক্তির লড়াই।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন শেয়ার করে মমতার ভাতিজা ও সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এখনই বরখাস্ত করা দরকার। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দলের সুবিধার জন্য লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।’ অভিষেক লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটের পর বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার সব নেতা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিদের চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়নি। তিনি জানতে চান, প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এখন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবেন কি না।
পশ্চিমবঙ্গের দুই বামপন্থী দল সিপিআইএম এবং সিপিআই-এমএল পৃথক বিবৃতিতে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ দাবি করেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনে অভাবনীয় দ্বন্দ্ব, শক্ত হলো বিরোধীদের হাতককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে একদিন আগেই বলেছিলেন, জ্ঞানেশ কুমার নিরপেক্ষ নন। তাঁর উচিত সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করা। সেই দলেরই অন্য নেতা সৌরভ দাস বুধবার বলেন, প্রমাণিত হয়ে গেছে, নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি আপসকারী সংস্থায় পরিণত। ভোট দেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন সেই অধিকার হরণ করেছে। সৌরভ বলেন, জ্ঞানেশ কুমার দেশের জনগণের এক নম্বর শত্রু। তিনি প্রকৃত দেশবিরোধী।
প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বালও অনেকের মতো জ্ঞানেশের অপসারণ দাবি করে বলেছেন, অবিলম্বে এসআইআর (ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় পরিমার্জন) প্রক্রিয়া বাতিল করা দরকার। এই প্রক্রিয়ার দরুন এখনই ১৩ কোটি ভোটারের নাম কাটা গেছে। কমিশনের বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।