উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি আমাদের ভাবায়

· Prothom Alo

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস অনেকটা স্বপ্নের মতো। নতুন ক্যাম্পাস, নতুন বন্ধু, নতুন শিক্ষক, নতুন পরিবেশ—সবকিছুতেই থাকে উচ্ছ্বাস। মনে হয়, এত দিন যে জ্ঞানকে শুধু বইয়ের পাতায় দেখেছি, এবার সেটিকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাব।

Visit sport-tr.bet for more information.

কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্নের জায়গা নেয় বাস্তবতা। ক্লাস, পরীক্ষা, কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, রিপোর্ট, গবেষণা—একটির পর একটি একাডেমিক কাজ। এর সঙ্গে যোগ হয় ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা। কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ ব্যাংক বা করপোরেট চাকরির কথা ভাবছেন, কেউ গবেষণা বা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শেখার সুযোগ যেমন অনেক, তেমনি চাপও কম নয়।

কিন্তু এত কিছুর মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করছি, নাকি শুধু একাডেমিক চাপ সামলে একটি ডিগ্রির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা?
একজন বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীর সাফল্যকে প্রায়ই সিজিপিএ, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা সার্টিফিকেট দিয়ে বিচার করি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু ভালো ফলাফল?

একজন শিক্ষার্থী হয়তো চার বছরে অসংখ্য পরীক্ষা দিয়েছেন, শত শত পৃষ্ঠা লিখেছেন এবং অনেক কোর্স সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সে যদি একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে না পারে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে না পারে, গবেষণার মৌলিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে না পারে কিংবা নিজের যুক্তি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কি অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে না?

শিক্ষার মান তাই শুধু কতটুকু পড়ানো হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না; বরং শিক্ষার্থী কতটা বুঝল, কীভাবে চিন্তা করতে শিখল এবং সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই বিষয় নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নের জন্য ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল বা আইকিউএসি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউজিসির বর্তমান হিট প্রকল্পের উদ্যোগে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মান নিশ্চিতকরণব্যবস্থা, সেল্ফ–অ্যাসেসমেন্ট, মনিটরিং এবং লার্নিং আউটকাম উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, নীতিগত পর্যায়েও প্রশ্নটি এখন শুধু ‘শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কি না’ নয়; বরং শিক্ষার ফল কী হচ্ছে—সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চাপ কি সব সময় শেখার সমান?
একজন শিক্ষার্থীকে অনেক কাজ দেওয়া হচ্ছে মানেই সে অনেক শিখছে, এমনটি ধরে নেওয়া যায় না।

ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীকে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলো। সে হয়তো ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কিছু অংশ কপি করে সাজিয়ে জমা দিল এবং ভালো নম্বরও পেল। কিন্তু সে কি বিষয়টি সত্যিই বুঝেছে?

অন্যদিকে, যদি একই অ্যাসাইনমেন্ট তাকে একটি প্রশ্ন করতে শেখায়, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে শেখায়, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে শেখায় এবং নিজের বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে সাহায্য করে, তাহলে সেটি শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।

কাজের পরিমাণ এবং শেখার পরিমাণ এক বিষয় নয়
অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ কখনো কখনো শিক্ষার্থীকে গভীরভাবে শেখার পরিবর্তে দ্রুত কাজ শেষ করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে শিক্ষার্থী ভাবতে পারে, ‘কীভাবে ভালোভাবে শিখব?’–
এর বদলে ‘কীভাবে কাজটি দ্রুত শেষ করব?’ এখানেই শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

আউটকাম–ভিত্তিক শিক্ষা: পরিবর্তনের একটি চেষ্টা
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আউটকাম–ভিত্তিক শিক্ষা বা ওবিই-এর ধারণা নিয়ে কাজ হচ্ছে। ইউজিসি ২০২১ সালে সংশোধিত ওবিই কারিকুলামের খসড়া প্রকাশ করেছে। এর মূল ধারণা হলো—শিক্ষার্থী একটি কোর্স শেষে কী জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করবে, সেটিকে শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা।

এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী একটি কোর্স শেষ করে শুধু পরীক্ষায় একটি নম্বর পেল কি না, এটি একমাত্র প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়; বরং প্রশ্ন হতে পারে—
সে কি বিশ্লেষণ করতে শিখেছে? সে কি গবেষণা করতে শিখেছে? সে কি সমস্যার সমাধান করতে পারছে? সে কি নিজের বক্তব্য যুক্তিসহ উপস্থাপন করতে পারছে? সে কি বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিতে শেখা জ্ঞান ব্যবহার করতে পারছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার প্রকৃত ফলাফল বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু শিক্ষক নয়, শিক্ষার্থীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক বা প্রশাসনের দিকে তাকালে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

একজন শিক্ষার্থীকেও সক্রিয় হতে হবে। ক্লাসে প্রশ্ন করতে হবে। নিজের বিষয়ের বাইরে পড়তে হবে। গবেষণার সুযোগ খুঁজতে হবে। নতুন সফটওয়ার ও গবেষণা টুলস শিখতে হবে। নিজের লেখার দক্ষতা বাড়াতে হবে। ভুল তথ্য থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য আলাদা করতে শিখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো হবে, তার একটি বড় অংশ শিক্ষার্থীর নিজের ওপরও নির্ভর করে।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আরও বড়। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে মানসম্মত শিক্ষা শুধু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চেষ্টায় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ও কার্যকর কারিকুলাম, পর্যাপ্ত গবেষণাসুবিধা, লাইব্রেরি রিসোর্স, ল্যাব বা ফিল্ডওয়ার্কের সুযোগ, প্রযুক্তির সুবিধা এবং একটি সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ।

ইউজিসির কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ফ্রেমওয়ার্কেও শিক্ষা দেওয়া শেখা, গবেষণা, গভর্ন্যান্স, স্টুডেন্ট লার্নিং আউটকাম এবং ইনস্টিটিউশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটির মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, মানসম্মত শিক্ষা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া; যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পক্ষের ভূমিকা এখানে রয়েছে।

যে কাজ করছি, সেটিই কি আসলে আমাদের কাজ

আমরা আসলে কী চাই?
এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই না যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করবে। এমন শিক্ষা চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না। ভুল উত্তর দেওয়ার ভয় নয়; বরং নতুন প্রশ্ন করার আগ্রহ তৈরি হবে। গবেষণা শুধু থিসিসের শর্ত নয়; বরং জানার একটি মাধ্যম হবে। সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ হবে, কিন্তু এটাই শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে উঠবে না।

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে বের হবে না, সঙ্গে থাকবে চিন্তার স্বাধীনতা, গবেষণার দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং বাস্তব সমস্যাকে বোঝার সক্ষমতা।

শেষ প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বছর শেষ হয়ে একদিন হাতে সার্টিফিকেট আসবে। সেখানে লেখা থাকবে আমাদের নাম, বিভাগ, ডিগ্রি ও ফলাফল। কিন্তু সার্টিফিকেটে লেখা থাকবে না—
আমরা কতটা প্রশ্ন করতে শিখেছি। কতটা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শিখেছি। কতটা মানুষের কথা শুনতে শিখেছি। কতটা বাস্তব সমস্যাকে বুঝতে শিখেছি। কতটা নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা অর্জন করেছি।

তাই বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—
‘আমি কত নম্বর পেয়েছি?’ বরং প্রশ্নটি হতে পারে—
‘আমি আসলে কী শিখেছি?’

ডিগ্রি শিক্ষাগত পরিচয় দিলেও মানসম্মত শিক্ষা আমাদের সক্ষমতা তৈরি করে। সেই সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো বছরগুলো আমরা শুধু পার করেছি, নাকি সত্যিই সেগুলো থেকে কিছু অর্জন করেছি।

দপ্তর সম্পাদক, খুলনা বন্ধুসভা

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source