অপ্রতিমের অকালপ্রয়াণ: আমাদের শিশুদের এমন করুণ পথ কে গড়ে দিল!
· Prothom Alo

মানুষের পৃথিবীতে সন্তান হলো ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠতম আশীর্বাদ। ১৩৮০ কোটি বয়সী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমাদের নীল গ্রহ পৃথিবীর বয়স ৪৫৪ কোটি বছর। এর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হোমো স্যাপিয়েন্স তথা মানবপ্রজাতির বয়স তিন লাখ বছর। যে মানুষ ৩ লাখ বছর ধরে তার পূর্বপুরুষের জিন বয়ে চলেছে, যেই মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ক্রমবর্ধমান এই ইউনিভার্স কিংবা কসমসকে চিনে নিচ্ছে—সেই মানুষকে সবার ওপরে রেখেছেন মহামহিম ঈশ্বর। মায়ের উদর থেকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত নিজের প্রিয়তর সন্তানকে কত যত্ন, আদর, আহ্লাদই না করেন মা–বাবা। ওই মা–বাবা যদি দেখেন তাঁর অল্পবয়সী কোমলমতি শিশুটি অপঘাতে প্রাণ হারিয়ে ফেলল, কেমন লাগে তাঁদের? পুরো আকাশ মাথায় ভেঙে পড়ে না? পৃথিবীর তাবৎ মেঘ কারুণ্যের বৃষ্টি হয়ে ঝরে না?
Visit betsport24.es for more information.
কী দোষ ছিল শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের? কেন তার প্রাণ এভাবে অকালে কেড়ে নেবে সমাজচ্যুত পতিত পাবনেরা? এর পেছনে কি কেবলই একটি আইফোনের লোভ? নাকি ভেঙে পড়া সমাজ বাস্তবতার অমোঘ উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া?
অপ্রতিমের দুঃখী মা–বাবা কী নিয়ে বাঁচবেন এখন? কোন আশায় সন্তানহারা পৃথিবীর আলো–বাতাস একাকী গ্রহণ করে ফুল, পাখি, লতাপাতা, হেমন্তে প্রভাত সূর্যের বিপরীতে দূর্বাঘাস কিংবা মাকড়সা জালে শিশিরের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করবেন? জলহীন লাউয়ের ডগার মতো নুইয়ে পড়া জীবনকে কী জবাব দেবে ওরা?
এই দেশে যবে থেকে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া সহজলভ্য হয়ে গেছে এবং যবে থেকে ইয়াবা-মাদকব্যবসায়ীরা আইনপ্রণেতার চেয়ারে বসে গেছে; ঠিক তবে থেকেই এই জাতির চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত হয়ে গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে মাদক। আর মুর্খ, অশিক্ষিত ও বোধহীন নেশাখোরেরা ইন্টারনেট থেকে বিচিত্রসব অপরাধপ্রবণতা রপ্ত করে নিয়েছে।
খেয়াল করলেই দেখবেন, আপনার আমার সন্তান পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে খোলামেলা কোনো কথা বলে না। মা-বাবা মুঠোফোনে স্ক্রল করতে থাকেন। আর ছেলেমেয়েরাও মাথানিচু করে গেম খেলতে থাকে। এর মধ্যে ছেলেশিশুরা বয়োসন্ধিতে পৌঁছানোর আগেই দুষ্ট বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিচিত্র মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। ক্লাস ফাইভে ওঠার আগেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের জৈবিক সম্পর্কের আদ্যোপান্ত শিখে ফেলে শিশু ও কিশোরেরা।
এসব শিশু আর আপনার ভালোবাসার কাঙ্গাল থাকে না। ওরা বিকৃত আনন্দ পায় মুঠোফোনের স্ক্রিন আর বন্ধু সমভিব্যাহারে। মা ও বাবার প্রেমময় অভিভাবকত্বের সঙ্গে ঠিক এভাবেই সন্তানের বাঁধন কেটে গেছে। এর সর্বশেষ ও সবিশেষ করুণ পরিণতি দেখতে পেলাম কুমিল্লার লালমাই সানন্দা পাহাড়ে। শিশু অপ্রতিমের নিথর দেহ। বন্ধু অথবা এলাকার বড় ভাইয়েরা ছলচাতুরি করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে অপ্রতিমের প্রাণপাখিটা কেড়ে নিয়ে নিশ্চিত বুনোউল্লাসে মেতেছিল। খুনিরা না জানে বিচারের পরিণতি, না শিখেছে জীবনবোধ। এর মধ্যে যদি ওরা নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। সব শুভবোধ ও হিতাহিত জ্ঞান খেয়ে নিয়েছিল মাদকের নেশা।
আপনি এখন এর জন্য কাকে দায়ী করবেন? এই রাষ্ট্রকে? এই সরকারকে? রাষ্ট্র বা সরকার তো নিজে কিছু নয়। আমাকে আপনাকে ছাড়া তো তার কোনোই অস্তিত্ব নেই। আমরা পাকিস্তান বা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস সবাই জানি, ওদিকে তাই যাব না। পঞ্চান্ন বছরের বাংলাদেশে কোনো শাসকই কি এই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। একজন আরেকজনকে রাজনৈতিক শত্রু বানাতে গিয়েই সময় পার করেছেন। কেউ কাউকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা মহানুভবতার গল্প শোনাননি। এখানে পালে পালে সংখ্যায় দ্বিপদ প্রাণী বেড়েছে কেবল। মানুষ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব কেউই নেননি।
দেশের বিবদমান রাজনীতি ব্যক্তি মানুষকে বুদ্ধিদীপ্ত, মননশীল ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে না। অপরাধীদের কাছ থেকে অনুদান ভিক্ষা করে চলা ধর্মগুরুরা সামাজিক অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে একটা ওয়াজও করেন না, কার্যত এই দেশের মানুষ দিশাহীন উন্মাদে পরিণত হচ্ছে দিন দিন। কথায়–কথায় তেতে ওঠে যে কাউকে যখন–তখন মেরে ফেলছে। আজকের দিনেই খুলনায় ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুল হোসেন নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হোস্টেলের সতীর্থরা পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছেন।
পুলিশের হিসাবেই হাজারো শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই জানা যাচ্ছে, সংঘবদ্ধ চক্ররা শিশুদের চুরি করে নিয়ে হাত–পা কেটে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামাচ্ছে। এই সমাজে অমানুষ যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে মহাসড়কে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। রাস্তার ধারের একজন ক্ষুদ্র দোকানদার গাড়ি বাননোর মতো জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং করছে। রোজই ওসব গাড়ির ধাক্কায় মানুষ মারা পড়ছে। প্রাণঘাতী ভাইরাসের মতো ওই গাড়ি বন্ধ করা কেন যায় না? কারণ, মহাসড়কে ওই গাড়ি চলতে দিয়ে কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে ক্ষমতার কাছে থাকা কয়েকটি চক্র।
সুতরাং এই দেশে ভালো কিছু আশা করা পাপ। আপনি আমি গুড প্যারেন্টিং করতে পারব না। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, সেটি হয়তো মনিটর করতে পারব না। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া অমানুষেরা সারা দেশে ইয়াবার সরবরাহ চেইন ঠিক রাখবে। আমাদের শিক্ষার উন্নয়ন দিয়ে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন থেকে শিশুদের বাইরে রাখতে পারব না। গোঁড়ামি ও মূর্খতা ঘোচাতে পারব না। মানুষকে কাজে ব্যস্ত রাখতে পারব না। এমন বিশৃঙ্খল ও উদ্ভট এক জাতির শেষ পরিণতি হলো নিজেরাই নিজেদের নিঃশেষ করে দেবে। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গমাইল এলাকায় ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা সীমিত হয়ে এলে হয়তো এই জাতি রক্ষা পাবে।
তার আগপর্যন্ত আমরা সবাই একেকজন অপ্রতিমের মা–বাবা। ক্রমাগত ক্রন্দনই আমাদের ট্রাজিক নিয়তি।
ফুটনোটস: এমন বিয়োগান্ত দিনে এখনো যাঁরা অপ্রতিমের মায়ের রাজনৈতিক অতীত ঘেঁটে একটি নিষ্পাপ দেবশিশুর ন্যক্কারজনক খুনকে জাস্টিফায়েড করছেন, তাঁদের ধিক্কার জানাই আর প্রার্থনা করি, আপনাদের জীবনে যেন কখনো এমন দিন না আসে। শত্রুর জন্যও ফিলানথ্রোপিস্ট আমরা এতটুকু বদদোয়া করি না।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]