১৪ অস্ত্রোপচারের পরও সুস্থ হননি, ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি জুলাই যোদ্ধা শাকিলের
· Prothom Alo

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং দেশ–বিদেশে ১৪টি অস্ত্রোপচারের পরেও সুস্থ হতে না পারার কথা ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন মো. শাকিল আহমেদ। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, দেশ–বিদেশে ১৪টি অস্ত্রোপচার করেও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। এখন প্রতিদিন ডাইলেশনের (মলদ্বার প্রসারিত করার পদ্ধতি) মাধ্যমে তাঁকে পায়খানা করতে হয়।
Visit goldparty.lat for more information.
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ রোববার শাকিল আহমেদ এই জবানবন্দি দেন। গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষী তিনি। শাকিল ‘ক’ গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা। গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এই মামলার আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন। এদিন তাঁদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
জবানবন্দিতে শাকিল আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। সেখানে দেখতে পান পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি করছে। তিনি মিরপুর ১০ নম্বরে ফুটপাতে থাকা হকারদের একটি খাটের নিচে লুকান। তখন একটি বিকট আওয়াজ শুনতে পান। পেছন ফিরে দেখতে পান একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেছেন। তখন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে ধরার জন্য তিনি খাটের নিচ থেকে বের হয়ে দাঁড়ালে তাঁর গায়ে একটি গুলি লাগে।
বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয় উল্লেখ করে শাকিল আহমেদ বলেন, সেখানে তাঁর পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়। পরে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় মাস চিকিৎসা নেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। থাইল্যান্ডে ছয় মাসে তাঁর ৯ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। তারপরও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। প্রতিদিন ডাইলেশনের মাধ্যমে তাঁকে পায়খানা করতে হয়। মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া নিষেধ। ডায়াবেটিস হলে তাঁর পা কেটে ফেলতে হবে। তিনি শক্ত খাবারও খেতে পারেন না। সব সময় তরলজাতীয় খাবার খেতে হয়।
এই মামলায় আনিসুল হক ও সালমান রহমান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘কুপরামর্শদাতা’ ছিলেন অভিযোগ করে শাকিল আহমেদ বলেন, আনিসুল–সালমানের কুপরামর্শের কারণে শেখ হাসিনা কারফিউ দিতে রাজি হন। কারফিউর কারণে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলি চালানোর সাহস পায় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ।
‘কামরুলের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে সাইফুল্লাহ নিহত হয়’
গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলায় রোববার জবানবন্দি দিয়েছেন আন্দোলনকারী মো. জাকির হোসেন।
আজিমপুরের বাসিন্দা জাকির বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বেলা তিনটার দিকে তিনি আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দেখেন, আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর গুলি বর্ষণ করছে পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ ও হেলমেট বাহিনী। তিনি জীবন বাঁচাতে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিপরীতে নির্মাণাধীন ভবনের তিনতলায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে একটি গলির ভেতরে দেখতে পান হাজি সেলিমের ছেলে সোলায়মান সেলিম, ইরফান সেলিমসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান করছে। তারা সবাই সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা পুলিশের সঙ্গে থেকে গুলি করছিল।
কামরুল ইসলামের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে আশরাফুল, খালেদ সাইফুল্লাহসহ অনেকে গুরুতর আহত হন উল্লেখ করে জাকির হোসেন বলেন, এক পর্যায়ে তাঁর ছেলের বন্ধু খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। তাঁর ছেলে ইফতিকে ঢাকা মেডিকেল থেকে ছাত্রলীগের ছেলেরা তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। রাত ১১টার দিকে ইফতিকে তাঁর দুই বন্ধু বাসায় দিয়ে যায়।
এই মামলার আসামি মেনন ও কামরুলকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
ছাত্রদল–জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার মামলার সাক্ষ্য
২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রোববার জবানবন্দি দিয়েছেন মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বরিশাল জেলা পুলিশ লাইনসের মোটরযান শাখায় কর্মরত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল–২–এ জবানবন্দিতে শহিদুল বলেন, ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ লাইনস মোটরযান শাখায় আসেন তিনি। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চালক ও দেহরক্ষীদের মাধ্যমে তিনি শুনতে পান, গত রাতে আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় দুটি ক্রসফায়ার হয়েছে। আগৈলঝাড়া থানার এএসআই রাজু তাঁকে বলেন, উজিরপুর থেকে দুজন এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিমকে এনে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ক্রসফায়ারে নিহত দুজন হলেন কবির মোল্লা ও টিপু হাওলাদার।
মামুন খালেদের বিষয়ে প্রতিবেদন ৬ ডিসেম্বর
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল–২। রোববার তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।