পেনশন ১৫ হাজার, ব্যাংক হিসাবে বাড়তি ৪ লাখ, সেই টাকা যায় কোথায়
· Prothom Alo

বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আক্তার হোসেন। চলতি বছরের জুনে পেনশন বাবদ ব্যাংক হিসাবে ১৫ হাজার ৪০৬ টাকা পাওয়ার কথা তাঁর। তবে ওই মাসে নিয়মিত পেনশনের পাশাপাশি আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত পান তিনি। পেনশন কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে হওয়া চুক্তির অংশ হিসেবে এই অতিরিক্ত অর্থ পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ থেকে কমিশন হিসেবে এক লাখ টাকা রাখেন। বাকি টাকা সিসিডিএফ কার্যালয়কেন্দ্রিক জালিয়াত চক্রের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেন।
Visit sport-tr.bet for more information.
এভাবে এক বছরের বেশি সময়ে পেনশনের বাইরে প্রায় ৭২ লাখ টাকা পেয়েছেন আক্তার হোসেন। এই অর্থ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন রেখে বাকি টাকা ওই চক্রকে ফেরত দিয়েছেন তিনি। অথচ ওই সময়ে পেনশন ও উৎসব ভাতা মিলিয়ে দুই লাখ টাকার কিছু বেশি পাওয়ার কথা ছিল তাঁর।
শুধু আক্তার হোসেন নন, সশস্ত্র বাহিনীর আরও অনেক অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ সরানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২৬ পেনশনভোগীর নামে ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে।
বকেয়া পেনশন পরিশোধের সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাস (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) ব্যবহার করে অভিনব এ জালিয়াতি করা হয়েছে। প্রথমে অনুমোদনহীন বকেয়া বিল তৈরি করে পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হতো। এরপর তাঁকে কমিশন দিয়ে বাকি টাকা নেওয়া হতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। পরে ভুয়া ট্রেজারি চালান দেখিয়ে অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে বলে নথিতে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়।
প্রথমে ২৩ পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে প্রাথমিক তদন্তে ২৬ জনের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরানোর তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২ সেপ্টেম্বর কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের (সিজিডিএফ) অধীন চিফ কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (পেনশন অ্যান্ড ফান্ড) বা সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, এটিই চূড়ান্ত হিসাব নয়। আইবাস প্লাস প্লাসের পুরোনো লেনদেন ও বকেয়া পেনশন বিলগুলো পরীক্ষা করলে একই কৌশলে সরকারি অর্থ সরানোর আরও ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমল থেকে হিসাবগুলো তদন্ত করা হলে এ রকম অন্তত শতকোটি টাকার জালিয়াতির তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘সবই তদন্ত করতে বলা হয়েছে’। যদিও যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে কেবল গত দুই অর্থবছরের (২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬) এ–সংক্রান্ত লেনদেন যাচাই করতে বলা হয়েছে।
প্রথমে ২৩ পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে প্রাথমিক তদন্তে ২৬ জনের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরানোর তথ্য পাওয়া যায়।
জালিয়াতি যেভাবে
সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পেনশনের বিষয়টি দেখভাল করে সিজিডিএফের অধীন সিসিডিএফ কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা পেনশনের নথি থেকে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে সরাসরি অথবা পরিচিত পেনশনভোগীদের মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো।
অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে কমিশন রেখে বাকি টাকা ফেরত দিতে রাজি হলে পরের মাস থেকেই তাঁদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো শুরু হতো। ‘বকেয়া মাসিক পেনশন’ খাত দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে এ অর্থ পাঠানো হতো।
কোনো পেনশনভোগীর সঙ্গে কমিশনের বিনিময়ে সমঝোতা করা হয়েছে, কাউকে পেনশন আটকে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। আবার কয়েকজনের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করে বলা হয়েছিল, অন্য একজনের বাবার বকেয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তাঁদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে।
সম্প্রতি এক পেনশনভোগী আয়কর বিবরণী তৈরির জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাঁর ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। পরে তাঁর সূত্র ধরে আরও অনেকের হিসাবে একই ধরনের লেনদেন পাওয়া যায়। অন্তত এক বছর ধরে এভাবে অর্থ সরানোর সুনির্দিষ্ট নথি মিলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কারসাজিটি অনেক আগে থেকে চলে আসছে।
নথিতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মাসিক পেনশন ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে; কিন্তু পাওনা পেনশনের বাইরে প্রায় প্রতি মাসেই তাঁদের হিসাবে একাধিকবার অর্থ পাঠানো হয়েছে। একবারে দুই লাখ টাকা লেনদেনের সীমা থাকায় প্রতিবার পাঠানো হতো ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা।
আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে প্রতি মাসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে পেনশনের টাকা পাঠানো হয়। মাসিক পেনশন ও তিনটি উৎসব ভাতা মিলিয়ে একজন বছরে সাধারণত ১৫ বার অর্থ পান। কোনো কারণে বকেয়া পেনশন বা অতিরিক্ত অর্থ পাঠাতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন সাপেক্ষে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩০টি লেনদেন করা যায়।
অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই কারও কারও হিসাবে ২০টি বা তার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
নথিতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মাসিক পেনশন ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে; কিন্তু পাওনা পেনশনের বাইরে প্রায় প্রতি মাসেই তাঁদের হিসাবে একাধিকবার অর্থ পাঠানো হয়েছে। একবারে দুই লাখ টাকা লেনদেনের সীমা থাকায় প্রতিবার পাঠানো হতো ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা।
আক্তার হোসেন ছাড়াও নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য জি এম সাজ্জাদ হোসেনের হিসাবে এক বছরের বেশি সময়ে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। আট মাসে ২২টি লেনদেনে মো. হারুন অর রশিদ মৃধার হিসাবে প্রায় ৪৪ লাখ এবং ছয় মাসে ২০টি লেনদেনে মো. শাহিনুর ইসলামের হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ টাকা পাঠানো হয়।
তিন মাসে আটটি লেনদেনে মো. শাহার আলীর হিসাবে প্রায় ১৬ লাখ, তিন মাসে ছয়টি লেনদেনে আমজাদ হোসেনের হিসাবে প্রায় ১২ লাখ এবং এক মাসে দুটি লেনদেনে খন্দকার আবুল হোসাইনের হিসাবে প্রায় চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। এক বছরের মধ্যে কেবল এই সাত পেনশনভোগীর হিসাব ব্যবহার করেই আড়াই কোটি টাকার বেশি সরানো হয়েছে।
সম্প্রতি এক পেনশনভোগী আয়কর বিবরণী তৈরির জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাঁর ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। পরে তাঁর সূত্র ধরে আরও অনেকের হিসাবে একই ধরনের লেনদেন পাওয়া যায়। অন্তত এক বছর ধরে এভাবে অর্থ সরানোর সুনির্দিষ্ট নথি মিলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, কারসাজিটি অনেক আগে থেকে চলে আসছে।
টাকা ফেরত তিন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে
অস্বাভাবিক লেনদেন হওয়া পাঁচ পেনশনভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের এই চক্রে জড়ানোর ক্ষেত্রে অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান, জি এম সাজ্জাদ হোসেন এবং এম শাহিন নামের আরেক পেনশনভোগী যুক্ত ছিলেন।
সাধারণত দুই ধাপে প্রায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হতো। এর মধ্য থেকে কখনো ১ লাখ, কখনো ৮০ হাজার টাকা কমিশন হিসেবে রাখা হতো। বাকি অর্থ আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি—তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে করা ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া হতো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু গত মার্চ ও এপ্রিলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের খুলনা ও রাজশাহী শাখা থেকে আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার ওই হিসাবের মালিক জি এম সাজ্জাদ হোসেন। অর্থ জমা দেন এম শাহিন।
এ ছাড়া আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে আদনান এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি এবং টাঙ্গাইল শাখা থেকে তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবে তিন লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। দুটি জমার রসিদেই অর্থ জমাদানকারী হিসেবে এম শাহিনের নাম রয়েছে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সাধারণত দুই ধাপে প্রায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হতো। এর মধ্য থেকে কখনো ১ লাখ, কখনো ৮০ হাজার টাকা কমিশন হিসেবে রাখা হতো। বাকি অর্থ আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি—তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে করা ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া হতো।
জি এম সাজ্জাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অডিট অফিসের শাহীনুর রহমান আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অ্যাকাউন্টস অফিসার ইশরাত জাহানও এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত। মূলত তাঁরা দুজন মিলে এই কাজ করেছেন। সরলভাবে তাঁদের কথা বিশ্বাস করে এখন বিপদে পড়েছি।’
সাজ্জাদ বলেন, ‘মাসে প্রায় চার লাখ টাকা করে অ্যাকাউন্টে দিত। টাকা আসার সঙ্গে সঙ্গে শাহীনুর রহমান যোগাযোগ করতেন। কখনো টাকা হাতে হাতে নিতেন, আবার কখনো অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হতো। আমাকে কখনো ২০ থেকে ২৫ হাজার, কখনো এক লাখ টাকা দিয়েছেন।’
নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আমজাদ হোসেন জানান, পূর্বপরিচিত এম শাহিন তাঁর বাবার বকেয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আসবে বলে আমজাদের ব্যাংক হিসাব নম্বর নেন। তিন মাসে ওই হিসাবে ছয়টি লেনদেনে প্রায় ১২ লাখ টাকা পাঠানো হয়। আমজাদের দাবি, তিনি কোনো কমিশন নেননি। পেনশন বন্ধ হওয়ার পর তিনি জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারেন।
অডিট সুপার জি এম সাজ্জাদ হোসেনঅডিট অফিসের শাহীনুর রহমান আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অ্যাকাউন্টস অফিসার ইশরাত জাহানও এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত। মূলত তাঁরা দুজন মিলে এই কাজ করেছেন। সরলভাবে তাঁদের কথা বিশ্বাস করে এখন বিপদে পড়েছি।ভুয়া চালানে অর্থ ফেরত দেখানো
সিসিডিএফ সূত্র জানায়, কোনো পেনশনভোগীর হিসাবে ভুল করে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হলে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে সমন্বয় করার নিয়ম রয়েছে। এ সুযোগ ব্যবহার করে ভুয়া ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত এসেছে বলে দেখানো হয়েছে।
শাহিনুর ইসলামের নামে ২৫ মার্চের একটি চালানে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকা জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অনলাইনে যাচাই করে দেখা গেছে, চালানটি ইকবাল হাসান রবিন নামের আরেক ব্যক্তির। প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত চালানের অঙ্ক মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকা।
শাহিনুরের নামে ৮ জুলাইয়ের আট লাখ টাকার আরেকটি চালানে অর্চনা রানী দত্ত নামের এক নারীর মাত্র ৪৯৪ টাকার চালান ব্যবহার করা হয়েছে।
জি এম সাজ্জাদ হোসেনের নামে প্রায় ১৬ লাখ টাকা জমা দেখানো একটি নথিতে শাহ আলম কবিরের ৩ হাজার ৬ টাকার চালান পাওয়া গেছে। আক্তার হোসেনের নামে প্রায় ১২ লাখ টাকা ফেরত দেখাতে ব্যবহার করা হয়েছে মিরাজ উদ্দিনের ১২ হাজার ১২২ টাকার চালান।
হারুন অর রশিদ মৃধার নামে প্রায় ১২ লাখ ও ১৬ লাখ টাকার দুটি ভুয়া চালান পাওয়া গেছে। একটিতে প্রকৃত জমা ছিল ১ হাজার ও অন্যটিতে ১২ হাজার ১২২ টাকা।
শাহিনুর ইসলামের নামে ২৫ মার্চের একটি চালানে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকা জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অনলাইনে যাচাই করে দেখা গেছে, চালানটি ইকবাল হাসান রবিন নামের আরেক ব্যক্তির। প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত চালানের অঙ্ক মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকা।
দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত
দুই সপ্তাহ ধরে পেনশন জালিয়াতির বিষয়টি অনুসন্ধান করেছে প্রথম আলো। তথ্য অধিকতর যাচাইয়ে সিজিডিএফের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সিএজি মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় ১ সেপ্টেম্বর। তিনি বলেন, জালিয়াতির কথা জানার পর তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এর আগেও বিভিন্ন কার্যালয়ে জালিয়াতি ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিএজির বক্তব্য নেওয়ার পরদিনই সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত আদেশে তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, শাহীনুর রহমান খান ও ইশরাত জাহানের ব্যবহারকারী পরিচয় (ইউজার আইডি) থেকে পেনশন ও ভাতার বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট অনুমোদন, বিল অনুমোদন এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁদের ইউজার আইডির মাধ্যমে ২৬ পেনশনভোগীর ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অর্থ আত্মসাতের জন্য দুজনকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করা হয়।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার এক সপ্তাহ আগে শাহীনুর রহমান খানের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তখন তিনি দাবি করেন, ‘আমি এসবের কিছুই জানি না। তদন্ত কমিটি হয়েছে। কে বা কারা করেছে, কমিটি খুঁজে বের করুক।’
তবে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে শাহীনুর রহমানের আইডি থেকে বিল অনুমোদন এবং ইএফটি করার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া আরেক কর্মকর্তা ইশরাত জাহানের বক্তব্য জানতে নানাভাবে চেষ্টা করা, কিন্তু যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, শাহীনুর রহমান খান ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (আর্মি) পে-১-এর জি এম মামুনুর রশিদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। গত ১২ জুলাই শাহীনুরকে বদলি করে মামুনুর রশিদের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তাঁরা দুজনই সিএজি মো. নুরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে সূত্রগুলোর দাবি। অন্যদিকে ইশরাত জাহানকে গত জুলাইয়ে ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (আর্মি) পে-২ কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিএজি মো. নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আওতাধীন অফিসে কর্মরত সবাই আমার ঘনিষ্ঠ। যাঁরা কাজে ভালো, তাঁদের রাখা হয়। আমি সবার সঙ্গে কথা বলি। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অফিসটি চালাই। বসগিরি করা আমি কখনো পছন্দ করি না।’
সদস্যসচিব মফিজুর রহমানকর্তৃপক্ষ হয়তো চিন্তা করেছে, এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা আছে। ওখানকার কারিগরি বিষয়গুলো আমি ভালোভাবে দেখতে পারব। এ কারণে হয়তো আমাকে দিয়েছে।তদন্ত কমিটি নিয়েও প্রশ্ন
বকেয়া মাসিক পেনশনের নামে জালিয়াতির এ ঘটনায় ১৭ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটি পুনর্গঠন করে এ কে এম হাছিবুর রহমানকে আহ্বায়ক, মো. মফিজুর রহমানকে সদস্যসচিব ও মোছা. বিউটি খাতুনকে সদস্য করা হয়।
কমিটি সিসিডিএফ কার্যালয়ের ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পেনশন বিবরণী, পরিশোধিত বকেয়া বিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইবাস প্লাস প্লাসের ইউজার আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়েছে।
তবে সদস্যসচিব মফিজুর রহমান ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ওই কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তদন্তের আওতাধীন সময়ের প্রায় ১৩ মাস তিনি ওই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই এটা স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে পড়ে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ হয়তো চিন্তা করেছে, এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা আছে। ওখানকার কারিগরি বিষয়গুলো আমি ভালোভাবে দেখতে পারব। এ কারণে হয়তো আমাকে দিয়েছে।’
সিসিডিএফ কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ২০২৩ সালের পর থেকে পেনশন কার্যক্রমের নিয়মিত নিরীক্ষা (অডিট) হয়নি। ফলে ভুয়া ট্রেজারি চালান জমা দেওয়া হলেও সেগুলো যথাসময়ে যাচাই করা হয়নি।
আইবাস ব্যবহার করে অন্যত্রও অনিয়ম
আইবাসের মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরানোর আরেকটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে বগুড়ায়। ৩১ আগস্ট হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস রাজশাহী কার্যালয়ের একটি চিঠিতে বলা হয়, ছয় পুলিশ সদস্যের নামে ১৯৫টি ভ্রমণ ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা বিলে ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৬ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
কিন্তু পরিদর্শনের সময় অধিকাংশ বিলের মূল কপিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনলাইনে দাখিলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চিঠিতে দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি কাজে লাগিয়ে বিলের কোড ও কর্মচারীর ধরন পরিবর্তন এবং পরে বিল অনুমোদন এবং ইএফটি করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ভুয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে তিনটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। এ ছাড়া বেশ কিছু ভুয়া পেনশন পেমেন্ট অর্ডার এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের আইডি ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের সব ঘটনার আপাদমস্তক তদন্ত করা উচিত। যাঁরা এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।আপাদমস্তক তদন্ত করা উচিত
এ বিষয়ে ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যেহেতু নিজেদের অনুসন্ধান বা তদন্তেই জালিয়াতির বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে। এটি অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। আবার এ ধরনের একাধিক ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এ ধরনের সব ঘটনার আপাদমস্তক তদন্ত করা উচিত। যাঁরা এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।