পুরস্কার নয়, শেখার পথে আরও এক ধাপ

· Prothom Alo

কিছু অর্জন আনন্দ দেয়, কিছু অর্জন দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আবার কিছু অর্জন মানুষকে নিজের পথের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়। প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার ২০২৬’-এ সেরা পাঁচ লেখকের একজন হওয়ার স্বীকৃতি আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি অর্জন। এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়; আমার সাহিত্যচর্চার পথে পাওয়া একটি আয়না, যেখানে নিজের লেখার ভালো-মন্দ, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে নতুন করে দেখার সুযোগ পেয়েছি।

Visit truewildgame.online for more information.

প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ আমার কাছে লেখালেখিকে আরও গভীরভাবে বোঝার একটি শিক্ষাযাত্রা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তরুণ লেখকদের এক জায়গায় এনে তাঁদের লেখার সঙ্গে অভিজ্ঞ লেখক, কবি, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

আয়োজনের শুরুটাও ছিল ভিন্নধর্মী। জুম অ্যাপের মাধ্যমে অনুবাদ, কথাসাহিত্য, ফিচার ও কবিতা বিষয়ে তিনটি অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। সারা দেশের প্রায় ৩০০ তরুণ লেখক ক্লাসে যুক্ত হন। তাঁরা নিয়মিত প্রথম আলো বন্ধুসভার ওয়েবসাইট ও পাতায় লেখেন এবং নিজেদের লেখালেখির চর্চাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশায় ‘সেরা লেখক বন্ধু’ মনোনয়নের জন্য আবেদন করেন। এরপর মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে নির্বাচিতদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত পর্ব।

গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই আয়োজন যেন ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য-শিক্ষালয়ে রূপ নেয়। প্রতিটি সেশনেই ছিল আলাদা বিষয়, আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি এবং শেখার নতুন দরজা।

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন-বিষয়ক সেশনটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। অল্প পরিসরে কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাবনা, চরিত্র, আবহ ও অভিঘাত তৈরি করা যায়, সেটি নিয়ে তাঁর আলোচনা ছোটগল্প লেখার প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তাঁর বক্তব্য থেকে উপলব্ধি হয়েছে, শব্দ কম হলেই লেখা ছোট হয় না; বরং সীমিত শব্দের ভেতরে বড় একটি অনুভূতি ধারণ করাই লেখকের দক্ষতা।

অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন অনুবাদ ও ভ্রমণবিষয়ক আলোচনায় লেখকের দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করেছেন। অনুবাদ যে কেবল এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় রূপান্তর নয়; বরং সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও অনুভূতিকে ধারণ করার একটি সৃজনশীল কাজ, তাঁর আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একইভাবে ভ্রমণলেখায় শুধু স্থান দেখলেই হয় না; সেই স্থানের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনকে দেখতে হয়।

লেখক-সম্পাদক-প্রকাশক আলাপচারিতায় সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ এবং বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদের বক্তব্য তরুণ লেখকদের জন্য ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্যবান পাঠ। বই প্রকাশের আগে প্রস্তুতি, ধৈর্য, পাণ্ডুলিপির মান এবং প্রকাশকের কাছে লেখা পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁদের পরামর্শ অনেক ভুল ধারণা দূর করার মতো। লেখক হিসেবে শুধু ভালো লিখলেই হবে না; নিজের লেখাকে প্রকাশযোগ্য করে তোলার দায়িত্বও লেখকের, এই উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীনের সংবাদ ও ফিচারবিষয়ক আলোচনা আমার নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। ফিচারে তথ্যের নির্ভুলতা, বাস্তব জীবন থেকে উপাদান নেওয়া, পাঠককে নতুন কিছু জানানো এবং আকর্ষণীয় শিরোনাম তৈরির বিষয়গুলো একজন লেখককে একই সঙ্গে সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও তাঁর বক্তব্যে এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

ছিল অংশগ্রহণকারী ও জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত আলোচনা। এই পর্বটি আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। এই পর্বে শুধু বক্তারা কথা বলেননি; তরুণ লেখকদের ভাবনা, প্রশ্ন ও অভিজ্ঞতারও জায়গা তৈরি হয়েছিল। একটি সংগঠনের কার্যক্রম তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেখানে একমুখী বক্তব্যের পরিবর্তে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ থাকে।

লেখকসত্তাকে আবিষ্কার করার এক অনন্য যাত্রা

দুপুরের বিরতির পর কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন ফিকশন ও নন-ফিকশন নিয়ে নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। লেখার কোনো একক সূত্র নেই—এই উপলব্ধির পাশাপাশি প্রচুর পড়া, পর্যবেক্ষণ, সংবেদনশীলতা ও অনুভবের প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁর আলোচনায় উঠে আসে। এরপর কবি সাজ্জাদ শরিফ কবিতা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। তাঁর আলোচনায় কবিতাকে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে না দেখে অনুভূতিকে ভাষার মাধ্যমে সর্বজনীন করে তোলার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবিয়েছে।

সবশেষে কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকের আলোচনা যেন পুরো আয়োজনের শিক্ষাগুলোকে অন্য এক মাত্রা দেয়। লেখালেখির পথ যে সহজ নয়, প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনা ও ব্যর্থতাও যে একজন লেখকের যাত্রার অংশ—তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়গুলো উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য আমাকে সবচেয়ে বেশি মনে করিয়ে দিয়েছে লেখালেখির মূল উদ্দেশ্য পুরস্কার, খ্যাতি বা স্বীকৃতি নয়; বরং নিজের ভেতরের কথাকে অর্থপূর্ণভাবে প্রকাশ করা এবং মানুষের জন্য সৌন্দর্য ও উপকারের কিছু সৃষ্টি করা।

পুরো আয়োজনের পেছনে সাংগঠনিক সমন্বয়ের বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো। আয়োজনের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে নিষ্ঠা, পরিকল্পনা ও দক্ষতার সঙ্গে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। এতজন তরুণ লেখক, একাধিক সেশন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণকারী এবং বিশিষ্ট অতিথিদের নিয়ে একটি দিনব্যাপী আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়। সময়ের শৃঙ্খলা, সেশনগুলোর ধারাবাহিকতা, অতিথিদের সঙ্গে সমন্বয় এবং অংশগ্রহণকারীদের সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।

একই সঙ্গে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সামগ্রিক সাংগঠনিক উদ্যোগও প্রশংসনীয়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কীভাবে সাহিত্যচর্চাকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে তরুণদের জন্য শেখার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ তার একটি সুন্দর উদাহরণ। এখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে শেখার সুযোগ, পরিচিতির পরিসর এবং লেখকদের পারস্পরিক সংযোগ।

আমার জন্য সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল পুরস্কার ঘোষণার সময়টি। সেরা পাঁচ লেখকের মধ্যে আমার নামও ঘোষণা হওয়ায় আনন্দের সঙ্গে নীরব দায়িত্ববোধও অনুভব করেছি। মঞ্চে সম্মাননা ও সনদ গ্রহণের মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে গর্বের; কিন্তু তার চেয়েও বড় অনুভূতি ছিল—আমার লেখা কেউ পড়েছেন, মূল্যায়ন করেছেন এবং সেই মূল্যায়নে আমার সাহিত্যচর্চার একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।

আমি এই পুরস্কারকে কোনো চূড়ান্ত স্বীকৃতি হিসেবে দেখতে চাই না। এটিকে দেখতে চাই শেখার পথের একটি ধাপ হিসেবে। একজন লেখকের পথের শেষ বলে কিছু নেই। প্রতিটি লেখা নতুন করে শেখায়, প্রত্যেক পাঠক নতুন প্রশ্ন তৈরি করে, প্রতিটি সমালোচনা নিজের দুর্বলতা চেনার সুযোগ দেয়। এই পুরস্কার আমাকে আনন্দিত করেছে, একই সঙ্গে আরও ভালো লেখার দায় বাড়িয়ে দিয়েছে।

‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই আমার হাতে থাকা সম্মাননা নয়; বরং মাথার ভেতর জমে থাকা অসংখ্য নতুন প্রশ্ন। কীভাবে আরও ভালো লিখব? কীভাবে পাঠককে আরও গভীরভাবে বুঝব? কীভাবে নিজের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর মানুষের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করব? কীভাবে শব্দের আড়ালে জীবনের সত্যকে খুঁজে বের করব?

অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬

Read full story at source