বিজেপি সরকারের চাপেই কি ভারতে আটকে যাচ্ছে সোনিয়ার আত্মজীবনী প্রকাশ

· Prothom Alo

কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ কি তবে শাসকের কোপে পড়ল? সেই কারণেই ভারতে বইটি প্রকাশ করা থেকে পিছিয়ে গেল পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস ইন্ডিয়া? আজ শুক্রবার ভারতীয় রাজনীতি ও গণমাধ্যমে দিনভর এই নিয়েই আলোচনা চলেছে। যদিও প্রকাশকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

Visit betsport.cv for more information.

সোনিয়া গান্ধীর লেখা এই আত্মজীবনী আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হতে চলেছে, এই খবর কিছুদিন আগে প্রচারিত হয়েছিল। সেই খবরেই বলা হয়েছিল, ভারতে বইটির প্রকাশ ও প্রচারের স্বত্ব নিয়েছে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস ইন্ডিয়া। প্রকাশিতব্য বইটি নিয়ে তখন থেকেই ভারতে যথেষ্ট কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এটি সোনিয়ার নিজের লেখা, তাঁকে নিয়ে লেখা অন্য কারও বই নয়।

তখনই জানা গিয়েছিল, সোনিয়ার আত্মজীবনীর প্রকাশক মার্কিন সংস্থা আলফ্রেড এ ক্নপ্ফ। ভারতে তা ছাপিয়ে বিক্রি করবে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস। তখনই জানা গিয়েছিল, শুরুতে এক লাখ বই ছাপানো হবে।

শুক্রবার সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস বইটি ছাপাতে চাইছে না। সূত্রের বরাতে কারণ হিসেবে বলা হয়, ভারতীয় প্রকাশক নাকি বইটির কিছু কিছু অংশ বাদ দিতে ও পরিমার্জন করতে বলেছে। কিছু অংশ সম্পাদনার প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু সোনিয়া তাতে রাজি হননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে মার্কিন প্রকাশক ক্নপ্ফ ও সোনিয়া গান্ধীর এজেন্ট ডেভিড গডউইনের অভিমত জানা যায়নি। পেঙ্গুইনের ইন্ডিয়া সিইও গৌরব শ্রীনাগেশের মতামতও পাওয়া যায়নি। মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কেউ এখনই কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাইছেন না।

আজ শুক্রবার সকালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর প্রকাশের পর বিকেলে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস ইন্ডিয়া এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেয়। তাতে প্রথমেই জানানো হয়েছে, তারা ভারতে এই বই প্রকাশ করছে না।

এ কথা বলার পর প্রকাশনা সংস্থাটি জানায়, কিছু তথ্য যাচাইয়ের পর তারা লেখককে কিছু পরামর্শ দিয়েছিল। প্রকাশক হিসেবে সেটা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব। বইয়ের স্বার্থে সেই পরামর্শ তারা দিয়েছিল। এটা প্রকাশকদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আলোচনার সময় লেখককে এটাই বলা হয়েছিল। বোঝানো হয়েছিল, বইটি প্রকাশে তারা মোটেই অনাগ্রহী নয়।

বিবৃতিতে পেঙ্গুইন আরও বলেছে, লেখকের সঙ্গে নিভৃত ও একান্ত আলোচনায় কী কী হয়েছিল, তা নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করা হবে না।

প্রশ্ন উঠেছে, সোনিয়ার জীবনের ঘটনার সত্যি–মিথ্যা তাঁর চেয়ে ভালো প্রকাশক কী করে জানতে পারে? এর সদুত্তর কোথাও নেই। কাজেই এমন ধারণা করা হচ্ছে, নিশ্চিতই কোনো মহলের চাপে পড়ে পেঙ্গুইনকে সরে আসতে হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস সরে দাঁড়াতে সোনিয়ার আত্মজীবনী তাহলে ভারতে কারা প্রকাশ করবে? প্রতিবেদনে সেই সম্ভাবনা নিয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। খবর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা হারপার কলিন্স নাকি দৌড়ে এগিয়ে।

প্রকাশক ক্নপ্ফ এই বইকে ‘পৃথিবীর বিশিষ্টতম রমণীর আকর্ষণীয় আত্মকথা’ বলে অভিহিত করে জানিয়েছে, ‘এখানে ভালোবাসা, পরিবার ও ভারত নামে এক অফুরন্ত চিত্তাকর্ষক দেশের মনোমুগ্ধকর কাহিনি বিধৃত হয়েছে।’

বইটির খবর ক্নপ্ফ প্রথম যখন জানিয়েছিল, তখন সোনিয়া গান্ধীর এক উদ্ধৃতি তারা প্রচার করেছিল। তাতে সোনিয়া বলেছিলেন, ‘আমার পরিবার নিয়ে অনেক কিছুই লেখা হয়েছে। কিন্তু খুব কম লেখাই সত্য ও অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে। ছয় দশক ধরে আমি এ দেশের যেসব সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছি, আমার এই আত্মজীবনী তার এক অনন্য দৃশ্যপট পাঠককে উপহার দেবে।’

তাহলে কি কোনো কোনো মহল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে সোনিয়ার উপলব্ধিতে আপত্তি জানিয়েছে? সেই কারণেই পেঙ্গুইনের সরে আসা? সোনিয়াকে জীবনের কোন কোন তথ্য বদলের প্রস্তাব দেওয়া হয়, পেঙ্গুইন তা জানায়নি।

সোনিয়া গান্ধীর প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচ্ছদ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের স্ক্রিনশট

কারও চাপে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস সোনিয়ার আত্মজীবনী প্রকাশ থেকে সরে গেল কি না, সেই উত্তরও অজানা। তবে সাম্প্রতিক অতীতে বিতর্কের মুখে সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়ার একাধিক উদাহরণ পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউসের রয়েছে।

যেমন ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুল নরবনের লেখা আত্মজীবনী ‘ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি’। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী সংসদীয় বিতর্কে ওই বইয়ের একাংশের উদ্ধৃতি দিতে গেলে সরকার পক্ষের সদস্যরা তীব্র আপত্তি তোলেন। তাঁরা বলতে থাকেন, যে বই প্রকাশিতই হয়নি, তা থেকে কী করে উদ্ধৃতি দেওয়া যায়?

অথচ রাহুল বিদেশে প্রকাশিত ওই বইয়ের একটি কপি দেখিয়ে বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান পূর্ব লাদাখের গলওয়ানে চীনা সেনাদের আগ্রাসন রুখতে কী করবেন, সেই নির্দেশের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছিলেন। তারপর তাঁকে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী উপযুক্ত সিদ্ধান্ত তাঁকেই গ্রহণ করতে বলেছেন। রাহুল বলেছিলেন, যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর নেওয়ার কথা, তার দায় তিনি সেনাপ্রধানের হাতে তুলে দায়মুক্ত হতে চেয়েছিলেন।

সেই বিতর্কের মধ্যে পেঙ্গুইন জানিয়েছিল, তারা ওই বইয়ের কোনো সংস্করণ আদৌ ছাপায়নি। অথচ রাহুলের অভিযোগের আগে এই দেশের একটি সাময়িকপত্রে ওই বইয়ের অংশ বিশেষ ছাপা হয়েছিল, রাহুলের ভাষণে তার উল্লেখও ছিল। স্পষ্টতই বোঝা গিয়েছিল, সরকারের চাপে ওই বয়ান দিতে পেঙ্গুইন বাধ্য হয়েছিল।

চলতি বছরের জুন মাসে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউস বিশিষ্ট গ্রাফিক ঔপন্যসিক জো সাকোর লেখা ‘দ্য ওয়ান্স অ্যান্ড ফিউচার রায়ট’ বইটি প্রকাশের দায়িত্ব থেকেও পিছিয়ে আসে। সাকোর ওই বই পশ্চিম–উত্তর প্রদেশের মুজফ্ফরনগরের দাঙ্গার ওপর লেখা। তাদের দাবি ছিল, ওই বইয়ে নাকি ভারতের ভুল মানচিত্র ছাপানো হয়েছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান নরবনের আত্মজীবনী এ দেশে আজও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তেমন হাল সোনিয়ার আত্মজীবনীও হতে পারে কি না, তা চর্চায় উঠে আসছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ‘আপত্তিকর’ মনে হলে সোনিয়া গান্ধীর ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ কি এ দেশে অপ্রকাশিত থেকে যাবে?

Read full story at source