ভারতে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ এনে খ্রিষ্টান পুরোহিতকে আটক ও হয়রানি ঘিরে কেন এত বিতর্ক হচ্ছে

· Prothom Alo

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারভিত্তিক গির্জার প্রধান তিনি। হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার অভিযোগে আজ মঙ্গলবার ভারতের আদালতে তাঁর হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁকে এমন একটি আইনের অধীনে মামলার মুখোমুখি করা হচ্ছে, যা এখনো বলবৎই হয়নি।

পঙ্কজ দেবনুর নামের ম্যানচেস্টারভিত্তিক গির্জার এই প্রধান বর্তমানে অন্তর্বর্তী জামিনে মুক্ত আছেন। তবে তাঁর দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

Visit rhodia.club for more information.

এই পুরোহিত গির্জার এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে গিয়েছিলেন। সে সময় নতুন ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে পুলিশি মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি আদালতে হাজির করা হয়।

পরে জানা গেছে, পুলিশের এফআইআরে উল্লেখ করা আইনটি তখনো কার্যকর হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনাটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার পরিচালনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

কে এই পুরোহিত

৫০ বছর বয়সী দেবনুর ম্যানচেস্টারে ‘অ্যাংলিকান এপিসকোপাল চার্চ ইন্টারন্যাশনাল’-এর সঙ্গে যুক্ত। তিনি ৭ আগস্ট পশ্চিম ভারতের পুনেতে ‘পবিত্রনাম দেবালয়’ গির্জার ১৪১তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ১০ দিনব্যাপী ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠান খ্রিষ্টীয় ধর্মোপদেশ, প্রার্থনা ও ধর্মীয় গানের মতো কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দেবনুরের মেয়ে জানিয়েছেন, তাঁর বাবা অভাবনীয় দ্রুততায় এই মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।

মানালি দেবনুর দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘সবকিছু এত দ্রুত এবং এত আকস্মিকভাবে ঘটে গেছে...’ । তিনি বলেন, ‘তারা তাঁর ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাই আমরা তাঁর সঙ্গে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারিনি।’

দেবনুরের ছেলে পুনিত দেবনুর এক গোফান্ডমি (GoFundMe) আবেদনে এই খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ এনএইচএস হাসপাতালে রোগীদের কাছে গিয়ে সেবা এবং ধর্মীয় কাজের মাধ্যমে মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছেন।

তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল

সবকিছুর সূত্রপাত হয়েছিল ৭ আগস্ট। ওই দিন হিন্দু সম্প্রদায়ের একদল পুরুষ গির্জার অনুষ্ঠানে জোরপূর্বক ঢুকে পড়েন। তাঁরা গির্জার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন।

অভিযোগকারী একজনের নাম অমিত রাজু ভোসলে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তিনি একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখেন, দেবনুর খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে কথা বলছেন।

অমিত রাজু আরও অভিযোগ করেন, উপস্থিত দর্শকদের বিভ্রান্ত ও প্রলোভিত করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছিল।

তবে দেবনুরকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশ দেওয়া স্থানীয় আদালত বলেছেন, অন্য ধর্মের মানুষদের ধর্মান্তরিত করতে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালত উল্লেখ করেন, অভিযোগকারী ও অন্যরা এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন যে—এটি হিন্দুদের কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

পুলিশের দাবি, দেবনুরকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে তাঁর জামিনের শর্ত অনুযায়ী আদালতের অনুমতি ছাড়া ভারত ত্যাগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাঁকে এখন নিয়মিত স্থানীয় থানায় হাজিরা দিতে হচ্ছে।

নতুন আইন নিয়ে সমস্যা কী

মহারাষ্ট্র ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ২০২৬–এ গত ৩১ জুলাই রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেন। তবে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। আইনটি ২৮ আগস্টের আগে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল না।

মানবাধিকার আইনজীবী কোলিন গনসালভেসের মতে, দেবনুরকে এমন একটি আইনের অধীনে সন্দেহভাজন হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা তখনো বলবৎই হয় না।

আইনজীবী কোলিন দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘আইন যদি কার্যকরই না হয়ে থাকে, তবে সেখানে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাপারটা খুবই সহজ। কোনো বিচারক আইন তৈরি করতে পারেন না; এটি কেবল সংসদ তৈরি করতে পারে।’

পুলিশ জানিয়েছে, তারা ধরে নিয়েছিল আইনটি কার্যকর হয়েছে। তারা ধর্মান্তরবিরোধী অভিযোগটি প্রত্যাহার করে নেবে। তবে অভিবাসন নিয়মসহ অন্যান্য আইনের অধীনে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত তারা চালাতে পারে।

ভারতের পুনের স্থানীয় আদালতের অনুমতি ছাড়া দেবনুরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে

ভারতের একজন ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) হিসেবে দেবনুর প্রার্থনা সভায় যোগ দিতে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারলেও পুলিশের মতে তিনি অনুমতি ছাড়া ধর্মোপদেশ বা ধর্মীয় বক্তব্য দিতে পারেন না।

তা ছাড়া অভিযোগপত্রে বর্ণিত বিবরণ নতুন আইনের অধীনেও কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গনসালভেস বলেন, স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়া ও ধর্ম প্রচারের কাজ কোনো অপরাধ নয়। জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ প্রমাণের জন্য বলপ্রয়োগ বা প্রলোভনের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে।

গনসালভেস ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ধর্ম প্রচারের কাজ ব্যাপক একটি ধারণা। এটি আইনি ও বৈধ কাজ। শুধু জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা বেআইনি।’

দেবনুর খ্রিষ্টধর্মের ওপর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন—এই অভিযোগ প্রসঙ্গে গনসালভেস বলেন, ‘তিনি কারও মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে খ্রিষ্টান হতে বলেননি।’

এই আইনজীবী বলেন, ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ যদি হয়, তবে সেই বলপ্রয়োগটি কোথায় ছিল? কিংবা তিনি কি বলেছিলেন, “আপনি খ্রিষ্টান হলে আমি আপনাকে ১০ লাখ টাকা দেব?” না, দেননি। তাহলে প্রলোভন কোথায়? বলপ্রয়োগ কোথায় আর প্রলোভনই বা কোথায়?’

মামলাটি কেন খারিজ করা হয়নি

আইনজীবীদের মতে, এটিই এখন আদালতের প্রক্রিয়া ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনাস তানভীর বলেন, প্রকৃতপক্ষে কার্যকর আছে এমন আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল পুলিশের। যেহেতু তা ঘটেনি, তাই সেই দায়িত্ব আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর বর্তায়।

আইনজীবী আনাস বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটের পুলিশের রাবার স্ট্যাম্প হওয়া উচিত নয়।

এই আইনজীবী বলেন, আদালতের পরীক্ষা করা উচিত, অভিযোগ করা অপরাধটি আইনে অস্তিত্বশীল কি না, যেসব ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে তা বলবৎ আছে কি না, এফআইআরে সেই অপরাধের উপাদান প্রকাশ পায় কি না এবং গ্রেপ্তার সামাজিকভাবে ও আইনগতভাবে বিচার্য কি না।

গনসালভেস যুক্তি দেন, এই অভিযোগপত্রে আদৌ কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ আছে কি না, তা শুরুতেই যাচাই করা উচিত ছিল।

এই আইনজীবী বলেন, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের প্রথম কাজ হলো প্রাথমিকভাবে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা। আইন যদি কার্যকরই না হয়, তবে কোনো অপরাধও গঠিত হয় না।

তানভীর বলেন, দেবনুর পুলিশের এই মামলা এবং পুরো আদালত প্রক্রিয়াকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, বিশেষ করে যদি কার্যকর না থাকা কোনো ধারার ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হয়। গনসালভেস বলেন, বেআইনিভাবে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার বিরুদ্ধেও এই পুরোহিত আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তাঁর পরিবার কেন ভীত

দেবনুরের পরিবারের কাছে এই আইনি যুক্তির চেয়ে একটি উদ্বেগ সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা।

পরিবার বলছে, ভারতে তাঁর নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাঁরা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত ভীত ও চিন্তিত।

দেবনুরের মেয়ে মানালি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাজ্যে থাকি এবং ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়, তা আমরা সংবাদমাধ্যমে পড়ি। আর আমরা যা পড়েছি, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।’

মানালি বলছেন, ‘বর্তমানে এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় ভয়, বিশেষ করে যখন তাঁর নাম, তাঁর সঠিক অবস্থান, তিনি কোথায় থাকেন—সংবাদমাধ্যমে যেসব বিষয় প্রকাশ পাওয়া উচিত নয়—সেসব প্রকাশ করা হচ্ছে। এটি খুবই ভয়াবহ। আমাদের একমাত্র অগ্রাধিকার হলো তিনি যেন নিরাপদে বাড়িতে ফিরে আসেন। তারপর যা করার আমরা দেখব।’

বিদেশি মানুষের মধ্যে ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। গত মে মাসে, ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন সফররত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের আগে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

ডাচ প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটি কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয় নয়, সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়ও, যাঁরা তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন। এটি প্রথমত মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে অন্যান্য অনেক ছোট ছোট সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’

Read full story at source