কবিতার ‘শহীদ কাদরী’ নাট্যমঞ্চে
· Prothom Alo

নাটকটি শহীদ কাদরীর জীবনীর ওপর ভিত্তি করে ঢাকায় ফেরার আকুল আকাঙ্ক্ষা ও আকুতি নিয়ে লেখা হয়েছে। এটি বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রে রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ৫৫২তম পাবলিক লেকচার হিসেবে নাট্যকার আসাদুল ইসলাম কর্তৃক গত এপ্রিলে পঠিত হয়।
(অন্ধকারের মধ্যে খুবই মৃদু স্বরে হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ সংগীত বেজে চলেছে। ধীরে ধীরে আলো ফুটে উঠবে। হাতে এক পিস কেক নিয়ে শহীদ কাদরীর প্রবেশ। টেবিলে রাখা পানির গ্লাস থেকে পানি খায়। টেবিলের ওপর ছড়ানো–ছিটানো চায়ের কাপ, কাগজ, ডায়েরি, খাতাপত্র, বই, পেনসিল, অ্যাশট্রেতে রাখা সিগারেট, কয়েকটা কমলালেবু)
Visit afnews.co.za for more information.
আজ রবিবার। নিউইয়র্কে এখন মধ্যরাত। ঠিক গত রবিবার ছিল আমার জন্মদিন, ১৪ আগস্ট, ২০১৬। ৭৫তম জন্মদিনে সবাই আমার বাসায় এসে কেক কাটল। খাওয়াদাওয়া করল। গান গাইল। নীরা তার সাধ্যমতো সবাইকে আপ্যায়ন করেছে। এই যে কেকটা খাচ্ছি, এটা জন্মদিনের কেক। আমি একজন খাদ্যরসিক মানুষ। আনন্দ নিয়ে খেতে পছন্দ করি। কিন্তু শরীরের যে অবস্থা তাতে মোটামুটি সব খাবারই এখন আমার জন্য নিষিদ্ধ। এই যে কেক, মাল্টিলেয়ার কেক, আমার জন্য বিষ। সেই বিষ চুরি করে খাচ্ছি, খেতে ভালো লাগছে। কিন্তু শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ১০ বছর ধরে শরীর ভালো যাচ্ছে না। ১০০ বছর ধরে শরীর ভালো যাচ্ছে না। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে শরীরটা এখন বেশি নাজুক, বেশি ভঙ্গুর, বেশি জর্জর।
আমার গুনাগার হৃদয়ের মধ্যে ছদ্মবেশী গেরিলারা খনন করছে গর্ত, ফাঁদ, দীর্ঘ কাঁটা বেড়া।
মগজের মধ্যে অনবরত বেজে চলেছে সাইরেন।
অ্যাম্বুলেন্স, সাইরেনের শব্দ, হুইলচেয়ার, হাসপাতাল, ডায়ালিসিস, ডিপ্রেশন, এগুলো আমার জীবনে অনিবার্য হয়ে গেছে। দুই দিন ধরে জ্বর। আগামীকাল সকালে আমাকে ভর্তি করানো হবে হাসপাতালে। হাসপাতালের বদান্যতাতেই বেঁচে আছি। এতবার হাসপাতালে গেছি, এত শতবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে, হাসপাতাল এখন আমার কাছে একটা সোনালি কিচেন। সেইখানে, সোনালি কিচেনে তুমি, বসন্তের প্রথম দিনেই হত্যা করেছিলে আমাকে, তোমার নিপুণ নিরিখে। কিন্তু হাসপাতালে এবারের যাওয়াটা আলাদা, একটু অন্য রকম। জন্মদিনে সবাই মিলে আমায় গান শোনাল। যেন গান গেয়ে সবাই আমাকে বিদায় জানাচ্ছে। ওগো দুখজাগানিয়া তোমায় গান শোনাব।
(সংগীত বাজবে, তোমায় গান শোনাব। গানের মধ্যেই বেজে উঠবে সাইরেন)
রাতটুকু ফুরালেই সকালে আমাকে বহন করে নিয়ে যাবে একটি অ্যাম্বুলেন্স, সাইরেন বাজাতে বাজাতে। আমাকে ভর্তি করানো হবে হাসপাতালে। নর্থ শোর ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় শুয়ে, আমি হয়ে যাব একটি সুন্দর রাজহাঁস। রাজহাঁসটি সাঁতার কাটতে কাটতে চলে যাবে; সাঁতার কাটতে কাটতে, সাঁতার কাটতে কাটতে...ডুবসাঁতার, চিতসাঁতার, উবুসাঁতার...
সাঁতার দিতে দিতেই আমার যেন বয়োবৃদ্ধি হলো
জলের ওপর আমার কৈশোর, আমার যৌবন
কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে
কী দারুণ সবুজ
এভাবে জলে জলে জলে
জল থেকে জলে কতক্ষণ
হে পানসি, হে ডিঙিনৌকো, হে যাত্রীবাহী লঞ্চ
আমাকে কি দেখতে পাচ্ছ না।
নিউইয়র্কের নক্ষত্রমণ্ডলী কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে?
কেন এসেছিলাম নিউইয়র্ক? বাঁচার জন্য? শেষ পর্যন্ত কি বাঁচা যায়? ইতিহাসের অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে আজ আমি জরাগ্রস্ত, বন্দী একটি বিদেশি বারান্দায়। পারসন্স বুলোভার্ডের এগারো বাই এফ অ্যাপার্টমেন্টে আমি একা জেগে আছি। পাশের কামরায় ঘুমুচ্ছে নীরা।
আর আমার মাথার মধ্যে চড়ে বেড়াচ্ছে একটি রাজহাঁস।
রাজহাঁসটি সাঁতার কাটতে কাটতে চলে যাবে বুড়িগঙ্গায়। বুড়িগঙ্গায় ভেসে বেড়ানো পালতোলা নৌকার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগে আমি, চায়ের কাপ হাতে বসব রিভার ভিউ ক্যাফেতে। শামসুর রাহমান হয়তো আসবে। শামসুর রাহমান এলে চায়ের সঙ্গে চকলেট বিস্কুট খাব। আল মাহমুদ। আমার গাঁইয়া বন্ধু। ওকে দেখলেই আমার সব সময় ওর ঢাকায় আগমনের ছবি ভেসে ওঠে। আল মাহমুদ এক হাতে তার ওই টিনের স্যুটকেস, আরেক হাতে মার্ক্সবাদ। ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে চলে এসেছে সওগাত অফিস। ওকি আসবে রিভার ভিউতে? আল মাহমুদ, দোস্ত, তুমি কি আসবা? মানুষ এটা ভাবতে ভালোবাসত যে বাংলা ভাষার তিন প্রধান কবির একজন শামসুর রাহমান, একজন আল মাহমুদ, আরেকজন ...
(কাশতে থাকে। ভায়োলিন বাজবে)
পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলার আঘাতে বিনষ্ট হয়েছে আমার বুকের অনিদ্র ভায়োলিন।
এখন আমার মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয়, কলম পক্ষাঘাতগ্রস্ত, ভাষা নড়বড়ে, বানান অস্থির।
শামসুর রাহমান আমার কবিতা পড়ে শুধু বানান ধরে। বলে, ভুল বানানটা ভূল লিখেছেন।
ভুল তো লিখবই! বাংলা কি আমার মাতৃভাষা, তবু আমি বাংলা ভাষার কবি।
কবিতা লিখতে গেলে বানান ভুল হয়, হাতের লেখা অপাঠ্য। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় আমার কবিতা পাঠানোর আগে শামসুর রাহমান তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষরে ‘এই শীতে’ কবিতাটি কপি করে দিয়েছিল, আমি সেটাই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কবিতা ভবনের ঠিকানায়।
রিভার ভিউতে শামসুর রাহমানের সঙ্গে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ব।
বাতাসে চুল উড়িয়ে
প্যান্টের পকেটে হাত রেখে আমি রাস্তায় নামব
দেয়ালের পোস্টারগুলো সকালের হিরণ্ময় রৌদ্রে নিবিষ্ট মনে পড়তে পড়তে চলে যাব চানখাঁরপুল, চলে যাব গুলিস্তান, কিংবা ওয়ারী, শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজার, নওয়াবপুর।
লন্ডন বা বার্লিনে আমার কেটেছে দিন, কিন্তু সেখানে আমার কোনো পদচিহ্ন নেই।
বোস্টন বা নিয়ইয়র্কে আমার পেরিয়েছি অনেক রাত্রি, কিন্তু কোনো দেয়ালে লেখা নেই আমার নাম।
আমার শহর একটাই ঢাকা,
পৃথিবীর সুন্দরতম শহর ঢাকা।
আমি বেঁচে ছিলাম ঢাকায়। আমি জীবনকে উদ্যাপন করেছিলাম ঢাকায়। বাকি জীবন শুধু ঢাকার স্মৃতিচারণা করেই পার করে গেছি। আর স্বপ্ন দেখেছি একদিন ঢাকায় ফিরব, হেঁটে বেড়াব ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। ফিরতেই হবে আমাকে।
চায়ের ধূসর কাপের মতো অনেক ঘুরলাম রেস্তোরাঁয় রেস্তোরাঁয়।
ধূসর কাপের মতো আমার স্মৃতিও এখন ধূসর। অনেক কথাই মনে পড়ে, এলোমেলোভাবেই মনে পড়ে, ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। গতকাল কোথায় ছিলাম, কী করেছি, কিছুই মনে নেই। কিন্তু ’৬৭ সালের কথা মনে আছে। অভয় দাস লেনের কথা মনে আছে। সমকাল অফিসের কথা মনে আছে। সমকাল অফিসের পেছনে ছিল আমাদের বাড়ি। উপরে থাকতেন সিকান্দার আবু জাফর, নিচে আমরা থাকতাম । ব্রিটিশ কাউন্সিলের উল্টো দিকে ছিল জ্যোতিদের বাসা। কে?
কেউ কি আমায় ডাকল, আমায় ডাকছে কেউ?
একা থাকলেই মনে হয় বাইরে থেকে কেউ আমায় ডাকছে নাম ধরে।
খুব চেনা গলা, পরিচিত কণ্ঠস্বর, কিন্তু চিনতে পারছি না। একি বুড়োর কণ্ঠ, জ্যোতি, বটু, সায়ীদ, ফজল, বেলাল, আল মাহমুদ। কে ডাকে আমায়, কেউ কি সত্যি আমায় ডাকছে এই গোধূলিতে। শহীদ, শহীদ!
না, শহীদ সে তো নেই; গোধূলিতে তাকে কখনো বাসায় কেউ কোনো দিন পায়নি, পাবে না।
এটা আমার একটি প্রাইভেট কবিতা। আমি চাইনি, এই কবিতাটি কোথাও ছাপা হোক। কিন্তু আল মাহমুদ, ওকে কি আমি দমাতে পারি। খাতায় কিছু একটা খসড়া লিখে রাখলাম, পরে কাটাকুটি করে ফাইনাল করব। আল মাহমুদ আসল, এবং খাতার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেল। সমকালে না হয় সওগাতে বা কাফেলায়, কোনো একটিতে ওই খসড়াই ছাপিয়ে দেবে।
অগ্রজের উত্তর, এই কবিতাটি আমি লিখেছিলাম বুদ্ধদেব বসুকে অনুকরণ করতে গিয়ে। বুদ্ধদের বসুর একটি কবিতা ছিল।
বুদ্ধদেব বসু, একদা ছিলেন শিশু, যখন তিনি যুবক হলেন, লোকে বলত পশু, বুদ্ধদেব বসু।
আমিও ভাবলাম, আমার নিজের নাম নিয়ে একটি কবিতা থাকুক। সেই মতো আমিও লিখলাম।
না, না, তার কথা আর নয়, সেই বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো, শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।
এটা প্রকাশের কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। ভেবেছিলাম কবিতাটি পড়লে লোকে হাসাহাসি করবে। সেই ভয়ে আল মাহমুদের হাত থেকে কবিতাটি অনেক চেষ্টায় গোপনও রেখেছিলাম, কিছুদিন।
কিন্তু সেই গোপনীয়তা নষ্ট হলো যখন আমার প্রথম বই উত্তরাধিকার প্রকাশের সময় একটি কবিতা শর্ট পড়ল। আল মাহমুদ তখন আমার খাতাপত্র ঘেঁটে গোপন কবিতাটি টেনে বের করল। প্রথম বইয়ের শেষ কবিতা হিসেবে ছেপে দিল অগ্রজের উত্তর। সভয়ে দরজা খুলি, এইভাবে দেখা পাই তার, মাঝরাতে;
জানি না কোথায় যায়, কী করে, কেমন করে দিনরাত কাটে।
আমার একটি প্রাইভেট কবিতা, আল মাহমুদের কারণে পাবলিক হয়ে গেল। আল মাহমুদ, প্রিয় বন্ধু আমার। ইদানীং আমার বন্ধুদের চোখ, আমার বন্ধুদের চোখ ইদানীং চোখে চোখে রাখে শুধু চোখে চোখে ঈগলচক্ষু বন্ধুরা আমার—
আমার বন্ধুরা মেলাতে চেয়েছে আমি আসলে কে, আমি কি আলবেয়ার কাম্যুর দ্য আউটসাইডার, আমি কি টিএস এলিয়টের দ্য হলো ম্যান, গ্রাহাম গ্রিনের দ্য থার্ড ম্যান। অনেক চেষ্টায়, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমি নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করেছি। এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর গোধূলির শেষ বংশজাত আমি, শহীদ কাদরী। এক সত্যসন্ধ দুরন্ত সন্তান।
আমার আব্বা খালেদ ইবনে আহমাদ কাদরী। যেন দামেস্কে তৈরি, কারুকাজ করা একটি বিশাল ভারী তরবারি। উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি, উন্নত নাসা, বর্ণ উজ্জ্বল, তুখোড় ইংরেজি জানা মানুষ। তাঁর ছেলে আমি। নামটা হ্রস্ব, শহীদ কাদরী। ছোট, খাটো, বেঁটে, ময়লা, রোদে পোড়া, কালো, নাক বোঁচা। প্রথমে ছিলাম বেকার, পরে বেকুব, তারপর বেল্লিক। অল্পস্বল্প বাংলা জানা কবিতা লেখা মানুষ। আব্বা যখন তখন যাকে তাকে চপেটাঘাত করতে পারতেন। আমি কেবল মাঝেমধ্যে একে ওকে চুম্বন ছুড়ে মারতে পারি।
আমার আব্বা একজন শিক্ষিত রুচিবান সংস্কৃতিমান মানুষ। ছিলেন স্টার অব ইন্ডিয়ার সম্পাদক, ব্রিটিশ আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের জাঁদরেল অফিসার। সেই বনেদি পরিবারে আমার জন্ম, অথচ আমি হয়েছি আজন্ম বাউন্ডুলে। আব্বার দুশ টাকা মূল্যের শখের দামি জুতো, ২৫ পয়সায় বিক্রি করে টফি খেয়েছিলাম। প্রথম সিগারেট কিনেছিলাম, আব্বার পকেট থেকে টাকা চুরি করে।
আমার দাদা আলি উদ্দিন আহমেদ কাদরী, ম্যান ফ্রম ময়মনসিংহ, চিত্তরঞ্জন দাশের ক্লোজ ফ্রেন্ড। তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ওয়ান অফ দ্য আর্লিয়েস্ট গ্র্যাজুয়েটস। দাদা বিএ পাস করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে বিবাহ করলেন। আমার দাদি ছিলেন বড় লাটের সেক্রেটারির সুন্দরী কন্যা, উর্দুভাষী। শি ওয়াজ ভেরি ডোমিনেটিং। দাদির কারণে আমাদের পরিবার হয়ে গেল উর্দুভাষী। যদিও আমার আম্মা ভালো বাংলা জানতেন। আমার আম্মা বর্ধমানের। শরত্চন্দ্র বর্ধমানের ছিলেন বলে আম্মার সেকি গর্ব। আম্মার ট্রাংক ভর্তি ছিল শরত্চন্দ্রের উপন্যাসে। বলতেন, বড় হয়ে পড়বি। আমি বাংলা শিখেছিলাম আম্মার কাছে, একটু বড় বয়সে।
আম্মা চাইতেন আমরা যেন বাংলা শিখি। আম্মা যখন আব্বাকে বললেন, মাস্টার সাহেবকে বলো ওদেরকে বাংলা শেখাতে, আব্বা বিস্ময়ে অবাক, হতভম্ব হয়ে গেলেন, কেন, বাংলা কেন, বাংলা শিখে কী হবে। আব্বা আমার দিকে না তাকিয়ে হুকুম বর্ষণ করলেন, তোমাকে দেরাদুন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে হবে, ইংরেজি ভালো করে শেখ। আব্বার কথামতো চেষ্টা ছিল ইংরেজি শেখার। আমি আট বছর বয়সেই পড়ে ফেলি অল কোয়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট।
আমি ছিলাম সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র। তখন ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজের মতো ইংরেজিতে কথা বলতাম, কাউবয় মুভি দেখতাম। ডাচ কেক, ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রি, সুইজারল্যান্ডের আইসক্রিম খেতাম। আনন্দময় দিন। ফুপুর মরিস টোয়েন্টিফাইভ গাড়িতে চড়ে বিকেলে ঘুরতে বেরুতাম খিদিরপুর ডক ইয়ার্ড, কলকাতা লাইট হাউস। দেখতাম পার্ক সার্কাস মাঠে আর্মিদের কুচকাওয়াজ, লেফট রাইট, লেফট রাইট, লেফট। সৈনিকরা রাস্তা পার হচ্ছে গণিকার হাত ধরে। ভোরবেলা ঘুম ভাঙত বিউগলের শব্দে। এরই মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই একদিন হুট করে, আব্বা মারা গেলেন।
(বিউগলের মিউজিক)
আমার পিতা এই গ্রহের অরণ্যে এক দীর্ঘ দেবদারু।
আমি যে কবি হতে পেরেছি, বাংলা ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবিতা লিখতে পেরেছি, আব্বা বেঁচে থাকলে এটা হতো না, ইম্পসিবল ব্যাপার ছিল। আব্বা বেঁচে থাকলে আমাকে কবিতা–টবিতার বদলে দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে লেফট রাইট বেড়াতে হতো। আব্বার অবর্তমানে আমি কবি হয়ে গেলাম। লিখে ফেললাম—
রাষ্ট্র মানেই নিহত সৈনিকের স্ত্রী
রাষ্ট্র মানেই ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে যাওয়া
রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা মানেই
লেফট রাইট, লেফট রাইট, লেফট।
জগতে দুই ধরনের কবি আছে। শুদ্ধচারী কবি। অমিতচারী কবি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব, কবির জীবন শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া দরকার। কবিদের শুদ্ধচারী হওয়া উচিত। নিয়মিত লেখালেখি করা উচিত। আমার বন্ধুরা সবাই নিয়মিত লেখালিখি করেছে।
তবে আমার কাছে লেখালিখির জগতে বুদ্ধদেব বসু হলেন ফরম্যাট।
বুদ্ধদেব সকালবেলায় উঠে, ক্ষৌরি করে, চা খেয়েই লিখতে বসতেন। দুপুর পর্যন্ত লিখতেন। লাঞ্চের পর ইজিচেয়ারে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, সন্ধ্যা অবধি পুনরায় লেখালেখি করতেন। সন্ধ্যার পর তরুণ লেখক, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দিতেন। আড্ডা শেষে কখনো কখনো রাতেও লিখতে বসতেন।
বুদ্ধদেবের মতো আমিও একটি ফরম্যাট বানিয়ে ফেলেছিলাম।
বেলা বারোটায় ঘুম থেকে ওঠা। কুলি না করেই চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি থেকে বের হওয়া। ওয়ারীর কোনো চায়ের দোকানে চা বিস্কুট খেতে খেতে মধ্যাহ্নকালীন আড্ডা দেওয়া। শেষ বিকেলের পড়ন্ত রোদে, ঝিরঝিরে হাওয়া শরীরে মেখে বাংলাবাজারের দিকে রওনা হওয়া। লক্ষ্য বিউটি বোর্ডিং, না হয় গোবিন্দ ধাম। সেখানে রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা। রাত দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত নওয়াবপুরের আরজু হোটেলে আড্ডা। রাত ১২টার পর ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের টি স্টলে আড্ডা। রাত তিনটায় আদর্শ হিন্দু হোটেলে আড্ডা। ভোর পাঁচটায় মুসলিম হোটেলে চা খেয়ে রাস্তায় নেমে আড্ডা। ভোরের আলো ফুটলে ফুটপাতে বসে জিলাপি খেতে খেতে আড্ডা এবং দিনের প্রথম কাপ চা খাওয়া। সকাল ছ’টায় সিদ্দিকবাজারের দিকে গমন। সকাল সাড়ে সাতটায় ঘরে ফিরে, সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়া।
আমার ঢাকার জীবন হলো আড্ডার জীবন, আমি সেটা প্রাণভরে উপভোগ করেছি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদরা যখন লিখছে, শব্দ খুঁজছে, পাড়ি দিচ্ছে অতল ভাবনার অনন্ত নৈসর্গিক পথ, আমি তখন পথে পথে আড্ডা দিচ্ছি, এক রেস্তোরাঁ থেকে আরেক রেস্তোরাঁয়। শহীদ মানেই ঢাকার অগুনতি ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকানে অখণ্ড নির্ভেজাল নিরুপদ্রব আড্ডা আর আড্ডা। সদলবলে অ্যাসফল্টের রাস্তা, অলিগিলি ভেঙে উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ানো দিনের পর দিন, রাতের পর রাত।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, ঢাকার রাস্তার মানচিত্র, কানে বাজে প্রিয় মুখগুলোর কলরব, কলহাস্য। আমি যেন এখনো তাদের সঙ্গে ভ্রমণ করে চলেছি। সিনেমার মতো আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে দৃশ্যের পর দৃশ্য, দশকের পর দশক।
(মিউজিক: সিনেমার রিলের সাউন্ড। লাইট: লাইট বিভিন্ন দিক শিফট করে এক জায়গায় ফোকাস হবে)
পঞ্চাশের দশক; ঢাকার রাসত্মায় একসঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, সায়ীদ আতিকুল্লাহ, বেলাল চৌধুরী, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। তাদের সঙ্গে ঘুরছে ঐ যে শহীদ কাদরী।
ষাটের দশক; ঢাকর রাস্তায় একসঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, সিকদার আমিনুল হক, মোহাম্মদ রফিক, অরুণাভ সরকার। তাদের সঙ্গে ঘুরছে ওই যে শহীদ কাদরী।
সত্তরের দশক; ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার, হাফিজুর রহমান, ইকবাল হাসান, মাহাবুব হাসান। তাদের সঙ্গে ওই যে ঘুরছে শহীদ কাদরী।
তিন দশক ঢাকার রাস্তায় শুধু ঘুরেছি আর ঘুরেছি।
দশকের পর দশক গিয়েছে চলে, কালো মাথাগুলি হতে থাকে ধু ধু শাদা, চিরযৌবনা লাস্যে লিখিয়ে নেয়, তার প্রশস্তি কবিতায় কবিতায়। এটা আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতা।
আমার প্রতি মান্নান সৈয়দের ছিল অগাধ টান। সে ভেবেছিল আমি বোধ হয় বাংলা কবিতার মাইলস্টোন জাতীয় কিছু একটা হয়ে টয়ে পড়েছি। সেই ভাবনা থেকেই সে একটি বই লিখল, ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী। আমার কবিতা সে হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ভেঙে দেখেছে ভেতরের কঙ্কাল ও কারুকার্য। তারপর বলেছে, কী বলেছে, বলেছে শহীদের উপমা ও প্রতিমা দুই-ই দাঁড়িয়ে আছে প্রতিতুলনার দক্ষতায়, দুই মেরুর একত্রনিবেশে, দুই স্তনের সন্দীপক যৌথ ভূমিকায়।
আমার কবিতার অনেক আলোচনা সমালোচনা আছে, অনেক, অনেক, কিন্তু মান্নান সৈয়দের মতো একটিও নয়।
মান্নান সৈয়দের বাইরে আমার দুই বিশেষ ভক্তকুল; আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ। এরা হলো দুষ্ট ছেলের দল। আমাকে সম্মান দেখায়, আমাকে ডাকে ওস্তাদ। ওস্তাদ আবার কী ধরনের ডাক। সিনেমাতে গুন্ডাপাণ্ডাদের সর্দারকে বলে ওস্তাদ। আমাকেও তাই বলে ডাকতে হবে। এই হলো ওদের গুরুভক্তির নমুনা। আমি না হয় ওদেরকে অলৌকিক অদ্ভুত সব দ্রব্যাদি খাওয়া শিখিয়েছিলাম। সুহৃদের তিরস্কার বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে এসে, লুটোয় টেবিলে, উল্টে দেয় সাধের গেলাস আর নীল বাক্সো ম্যাচিসের ময়ূরের বর্ণালী পালক। (নিরুদ্দেশ যাত্রা, উত্তরাধিকার)
আরেকজন লোক আমাকে বলত ওস্তাদ। বিউটি বোর্ডিংয়ে নর্মালি বিকেল থেকে আড্ডা চলত। রাত ১০টার দিকে উঠে যেত শামসুর রাহমানরা। ১২টার দিকে সৈয়দ হক যাবার সময় কানের কাছে মুখ নিয়ে বলত, রাতে বাসায় চলে আসেন ওস্তাদ। রাত বাজে ১২টা, আর সে বলে রাতে চলে আসতে। আবে রাতটা শুরু হবে কখন। আমার জন্য সৈয়দ হকের দরজা খোলা থাকত, রাত কি দিন, ঢাকা কি লন্ডন, সব সময়, সবখানেই।
প্রথম যেবার লন্ডন যাই, এক বন্ধুর বাসায় সাত দিন ঘুমটুম দিয়ে সৈয়দ হকের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। সৈয়দ হক আমাকে লন্ডন বিবিসিতে কাজ জুটিয়ে দিল। তাকে কিছু বলতে হয়নি, আমার মনকে পড়ে ফেলার সক্ষমতা তার ছিল। এ কারণেই তো সে সব্যসাচী।
তখন আমি সত্যিকার অর্থেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম, আমার মাথা ছিল অদ্ভুতভাবে শূন্য। বেশির ভাগ সময় নিজের কামরায় বসে সিগারেট টানতাম। ভাইয়া ঢাকা থেকে ফোন করে বলত, লন্ডনের সব খবরই পাচ্ছি। শুনলাম, তোমার নাকি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি শব্দ করে হাসতাম। অগ্রজের প্রশ্নে আমার কোনো উত্তর ছিল না। মর্মাহতের মতোন—
এমন চিত্কার করে ‘ভাই, ভাই ভাই, বলে ডাকে...
আমরা দুই ভাই। শাহেদ কাদরী, শহীদ কাদরী। আমাদের বাড়ির স্কলার হলো আমার ভাইয়া। লেখক হওয়া উচিত ছিল তারই। কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো, আমি কবি হয়ে গেলাম।
১৯৫৬ সাল। ভাইয়ার আইকম পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
কবিতা পত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। এক মাস গেল, দুই মাস গেল, কবিতা ভবন থেকে কোনো ডাক আসে না। আম্মা আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে, বুদ্ধদেবের পত্রিকা আর কবে আসবে? আমি কিছুই বলি না, চুপ থাকি। এক বিকালে আম্মা বলল, ডাক্তার ডেকে নিয়ে আয়, আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, কোরামিন লাগবে। আমি ছুটে বেরিয়ে গেলাম ডাক্তার আনতে। ডাক্তার নিয়ে যখন ফিরলাম, আম্মা আর নেই। ভাইয়া তখনো পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরেনি। আমি আম্মার কাছে বসলাম, যার কাছ থেকে আমি বাংলা শিখেছি, যার ট্রাংক ভর্তি হয়ে আছে শরত্চন্দ্রে, যে প্রতিদিন অপেক্ষা করত বুদ্ধদেবের পত্রিকায় ছেলের কবিতা ছাপা হবে বলে, সেই মা নেই। আমার মা কোনো এক উঠে যাওয়া বাগানের শান্ত চন্দ্রমল্লিকা। পরদিন আম্মার দাফন হলো। আম্মাকে কবর দিয়ে এসে বাসায় থাকতে পারলাম না। চলে গেলাম বিউটি বোর্ডিং। কেউ নেই, ফাঁকা। কোণের দিকে এক টেবিলে মাথা রেখে বসে আছি। কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না, হঠাৎ কে যেন পিঠে হাত রাখল। মুখ তুলে দেখি শামসুর রাহমান, হাতে কবিতা পত্রিকার নতুন সংখ্যা। বলল, আপনার কবিতা ছাপা হয়েছে। আমি পত্রিকা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছি, কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি বললাম, আম্মা, বুদ্ধদেবের পত্রিকা এসেছে। আম্মা কবরে, আমার কথা কি কবর পর্যন্ত পৌঁছাল, আম্মা কি শুনতে পাচ্ছে। মা, মা...
যুগল পিদিমের মতো মা’র চোখের আশ্বাসের আলোয়
তরুণ ঘোড়ার পিঠে দ্রুত পেরিয়েছি শৈশব কৈশোর।
বুদ্ধদেবের কবিতা পত্রিকার ৮৫তম সংখ্যায় (বর্ষ ২০, সংখ্যা ৩) আমাদের চারজনের কবিতা একসঙ্গে প্রকাশ পেল। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ হক আর শহীদ কাদরী। আমরা পরিণত হলাম ঈর্ষার পাত্রে। শামসুর রাহমান খবর নিয়ে আসত। উনারা তো জ্বলছেন। কারণ, উনারাও কবিতা পাঠান কিন্তু বুদ্ধদেব ছাপায় না। আমাদের কবিতায় কী এমন আছে যে বুদ্ধদেব পেলেই ছাপিয়ে ফেলে। উনাদের কাছে কবিতা ভবন থেকে পোস্টকার্ড যায়, কবিতা পেলাম, ছাপা গেল না। ন গু। নরেশ গুহ। আমাদের কাছে পোস্টকার্ড আসে। কবিতা মনোনীত হয়েছে। বু ব। বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেব হচ্ছেন কবিতার আইডল। তিনি যদি মনে করেন কবিতা, তাহলেই ওটা কবিতা। তা না হলে ওটা কবিতা নয়।
এ শীতে একা, উদ্ধত আমি,
আমি শুধু পোহাই না ম্লান রোদ
প্রতিবেশী পুরুষ নারী আর বিশাল
যে রিক্তগাছ, সে ঈর্ষায় সুখী
নিয়ত উত্তাপ দিই বন্ধু পরিজনে।
আমি কবি হব কোনো দিন ভাবিনি। ভাবতাম কবিতা লিখছি, আরও কিছু লিখব, তারপর ছেড়ে দেব। কিন্তু ছাড়তে পারিনি, কবিতার সঙ্গেই থাকতে হলো, এর জন্য দায়ী একজনই, বুদ্ধদেব।
বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় কবিতা ছাপা না হলে, আমি কি কখনো কবি হতে চাইতাম? বুদ্ধদেব আমার সর্বনাশা করে ছেড়েছে।
আমি শুধু একাকী সবার জরার মুখোমুখি
এবং আরও একজনের চোখে দেখি লক্ষ সূর্যের আসা যাওয়া এবং সেও একা
আমারই আত্মার মতো প্রাঙ্গণের তরুণ কুকুর।
আমাদের কেউ কবিতা লিখতে বলেনি কিন্তু কবিতা লিখে গেছি। আমরা অনুপ্রাণিত ছিলাম তিরিশের কবিদের দ্বারা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের কবিতা আমি পড়েছি। আমি তাদের কবিতার সঙ্গে বাংলা কবিতার তুলনা করতে পারি। বাংলা কবিতা যে দুর্বল নয়, তা প্রমাণ করেছে তিরিশের কবিরা।
তিরিশের পর চল্লিশের দশকে কবিতা আটকে ছিল স্লোগানধর্মী কবিতায়।
কবি শহীদ কাদরীপ্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। স্লোগানের উচ্চকণ্ঠ থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে শামসুর রাহমান আমাদের সামনে নিয়ে এল, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। শামসুর রাহমানের হাত ধরে বদলে যেতে থাকল বাংলা কবিতা।
কবিতার সেইসব উন্মাতাল দিনগুলোতে সব সময় মনে হতো বিপ্লব আসন্ন। তখন আমরা হাতে বুখারিনের এবিসি অব কমিউনিজম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর রাতে পড়ছি গোপনে জোগাড় করা বুদ্ধদেব বসুর গল্প কবিতা উপন্যাস প্রবন্ধ। আসন্ন বিপ্লবের কালে বুদ্ধদেব ছিলেন লেখক হিসেবে নিন্দিত, কবি হিসেবে অবৈধ। আমরা সেই অবৈধকে বুকের সঙ্গে টেনে নিয়ে রাত্রি যাপন করি।
কী ভালো আমার লাগল আজ এই সকালবেলায় কেমন করে বলি?
কী নির্মল নীল এই আকাশ, কী অসহ্য সুন্দর। বুদ্ধদেবের সব রচনাতেই রয়েছে বিশুদ্ধ কিন্নরকণ্ঠের গান, যা রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতোই অপ্রতিরোধ্য।
বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের বিরাট ও ক্লান্তিহীন প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তোমারে স্মরণ করি আজ এই দারুণ দুর্দিনে
হে বন্ধু, হে প্রিয়তম।
বুদ্ধদেব যেহেতু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন, তাহলে আমারও একটি লেখা উচিত। সেই ভেবে আমি লিখলাম—
আমাদের চৈতন্য প্রবাহে তুমি ট্রাফিক আইল্যান্ড
হে রবীন্দ্রনাথ। দাঁড়িয়ে আছ যেন
সোনালি, অক্ষম পুলিশ এক
সর্বদা জ্বলছে তোমার লাল, নীল, সবুজ সিগন্যাল।
সব সিগন্যাল অগ্রাহ্য করে রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। সেখান থেকে ঠিক ১ বছর, ১ সপ্তাহ পর। কত হয় তারিখ?
১৯৪২ সাল। ১৪ আগস্ট। দিনটি হলো, রোজ শুক্রবার। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। পুরো শহর অন্ধকার। জাপানি বোমার ভয়ে কলকাতায় চলছে ব্ল্যাক আউট। সেই ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই আমার জন্ম হলো। আমার জন্মের সময় আকাশে টহল দিচ্ছে বোমারু বিমান। চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। চারপাশে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে গ্রেনেড, ট্যাংক, গোলন্দাজ, সাবমেরিন, সাঁজোয়া বাহিনী, বেয়োনেট। চারিদিকে জ্বলছে দাউদাউ অন্তিম আগুন।
তিরিশের কবিরা কবিতায় নরকের কথা বলেছেন, কিন্তু সে নরক তারা দেখেনি, দেখেনি, দেখেনি। নরক দেখেছি আমরা, কারণ আমরা নরকেই জন্মেছিলাম। জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রুদ্ধচক্ষু সেই ব্ল্যাকআউটে আঁধারে।
(দাঙ্গার মিউজিক)
কলকাতায় তখন চলছে ভয়াবহ দাঙ্গা। কিছুদিন হলো আব্বাও মারা গেছেন। আমাদের পরিবার অভিভাবকহীন। সেই সুযোগে দাঙ্গাকারীরা আমাদেরকে বাড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দিল। আম্মা তো কিছুতেই বাড়ি ছাড়তে রাজি নয়। তখন হুমকি আসল, আমাদেরকে বাড়িসহ পুড়িয়ে মারা হবে। এবার আম্মা সত্যি ভয় পেয়ে গেল। মামারা বললেন, বর্ধমান চলে যেতে। ফুফু থাকতেন ঢাকায়, বললেন ঢাকায় চলে আসতে। আম্মা তো বুঝতে পারছে না, কী করতে হবে, কোথায় গেলে তিন ছেলেমেয়ের প্রাণ বাঁচবে। পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি ঘটলেও আম্মার মন থেকে ভয় দূর হয়নি।
একদিন খুব গোপনে, কাকডাকা ভোরে আমাকে ঘুম থেকে তুলে আম্মা বলল, চল। আমি চোখ মুছতে মুছতে চললাম। উঠে বসলাম ট্যাক্সিতে, গন্তব্য দমদম এয়ারপোর্ট। ভাইয়া বলল, আমরা চলে যাচ্ছি, এ বাড়িতে আর কোনো দিন আসা হবে না। কাউকে কিছু বোঝার আগে আমি ট্যাক্সি থেকে নেমে, দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে, বাড়ির চিলেকোঠায় উঠে গেলাম। এই কামরায় আমি থাকতাম। কোনো দিন আর ফিরব না? টেবিলের নিচে একটা চক আর ল্য মিজারেবল, পড়ে আছে। চক হাতে নিলাম। কামরার সারা দেয়ালে বড় বড় করে লিখে দিলাম, শহীদ কাদরী, শহীদ কাদরী, শহীদ কাদরী।
(সাদা দেয়ালে লেখা ফুটে উঠবে শহীদ কাদরী। মিউজিক: প্লেন টেক অফের সাউন্ড শোনা যাবে)
ইস্পাহানির ওরিয়েন্টাল এয়ারলাইনসের একটা প্লেনে চড়ে, ১৯৫২ সালের একদিন, কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসি। দেশভাগের নিয়তি আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকা আমাকে দেয় খোলা প্রান্তর। আমার অন্তর ভরে ওঠে সুরে সংগীতে। (ঢাকার সুর বাজবে) আমি যখন ঢাকায় আসি, ঢাকা তখন ঘুমিয়ে ছিল। আমি আসার পর, ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙে ঢাকার। এরপর বদলাতে শুরু করে। চকিতে বদলে গেছে আজ, আপাদমস্তক ভীষণ বদলে গেছে শহর আমার।
ঢাকা, যে শহরের চাঁদ জ্বলা বিহ্বল রাতের পিচে আমার পায়ের ছাপ এখনো উজ্জ্বল, সেই শহর ছেড়ে আমি এখন ভিন দেশের অচেনা শহরে। নিউইয়র্ক, ঢাকা থেকে ১২ হাজার মাইল দূরের শহর। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে ঢাকাতেই।
আমি ঘুরে বেড়াই ঢাকার সেলুন, বইয়ের দোকান, পত্রিকা অফিস, পার্ক, বুড়িগঙ্গার পাড়, রেস্তোরাঁ।
কত কত রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিয়েছি। বিউটি বোর্ডিং, রমনা, রিভার ভিউ, ক্যাপিটাল, স্টার, গুলিস্তান, রেক্স, ইন্টারকন্টিনেন্টাল।
কত হোটেল থেকে হোটেলে বসে বানিয়েছি আড্ডার লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা।
আমরা আড্ডা দিয়েছি বাড়িতে বাড়িতে। আমরা আড্ডা দিয়েছি অফিসে অফিসে।
আমি কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে আড্ডা সংক্রমিত করতে চেয়েছিলাম। যাতে সবাই পরস্পরকে চেনে, বোঝে। নিজেদের মধ্যে এক্সচেঞ্জ করতে পারে। আড্ডায় কোনো একটি বিষয় নিয়ে রাতের পর রাত তর্ক হতো। সেইসব তর্কে জেতার জন্য প্রচুর পড়াশোনার দরকার ছিল। আমরা পড়তাম। তা ছাড়া লেখক হতে হলে পড়াশোনার বিকল্প তো কিছু নেই।
একজন লেখককে আইনস্টাইন, ফ্রয়েড, কার্ল মার্ক্স, ডারউইন, জেমস জয়েস, দস্তয়েভস্কি, প্রুস্ত পড়তেই হবে। এগুলো না পড়লে বোঝা যায় না যে মানুষের মেধা কতদূর এগোতে পারে। আমি হলাম সর্বভুক পাঠক। সাহিত্যের যা পাই, সব পড়ে ফেলি। সাহিত্যের বাইরে পড়েছি হেগেল, প্লেটো, কান্ট, হিউম, এরিক ফ্রম, হেরোডাটাস। আমি নিয়মিত মেডিক্যাল জার্নালও পড়ি। সবকিছু মিলিয়ে আমার পড়াশোনার পরিধি খারাপ না। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় বলতে হচ্ছে, যা কিছু পড়ার মতো তা আমি মোটামুটি সবই পড়েছি।
তবে এটাও আমাকে বলতে হচ্ছে, একাডেমিক লেখাপড়ায় আমি লবডঙ্কা। আমি বখে যাওয়া পাবলিক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার সাহিত্যের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনে ভাবত, আমি হয়তো একদিন পিএইচডি ফিএইচডি কইরা আন্তর্জাতিক হয়া উঠব। সে আমারে দেখলেই কয়, কবিতার ফাঁকে ফাঁকে ক্লাসের পড়া পড়, পরীক্ষার প্রিপারেশন নে। আমি তারে সান্ত্বনা দিয়া কইতাম, আবে কিয়ের পরীক্ষা, কবিতা লেখনের সময় কি আর ভাবছিলাম সহীদ কাদরী হমু, ভাবছিলাম রবীন্দ্রনাথ হমু। নোবেল প্রাইজ পামু। পড়নউড়ন লাগব না।
আমি বন্ধুবান্ধবের লগে ঢাকাইয়া কুট্টিদের হালকা উর্দুর ভিয়েন লাগানো ভাষায় কথা কইতাম। ওতেই কাম হয়া যাইত। যা কইতাম তাতেই ওরা হাসত। আবে খাইবার দে, খিদা লাগছে। হাসি। অনেক টাকার ভাত খাইয়া ফালাইলাম দোস্ত। হাসি। হা, হা, হা...
আমার ঘ্যাসঘেসে দরাজ কণ্ঠের উদ্দাম হাসির শব্দ নাকি সবার রক্তে কাঁপুনি ধরাত। আমার হাসির সঙ্গে থাকত লাগামহীন রঙ্গ রসিকতা। মশকরা ছিল আমার মজ্জাগত।
ইয়ার্কি মশকরা ছাড়াও নানাবিধ দোষ গুণ আমার মধ্যে ছিল। তবে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল উন্নাসিকতা।
আমাকে রাঙাতে পারে তেমন গোলাপ কখনো দেখি না, এ রকম আত্মশ্লাঘা প্রদর্শনের পর নিজেই ধরাটরা খেয়ে, প্রমেট্রেমে পড়ে গোলাপি হয়ে উঠি। লিখতে শুরু করি প্রেমের কবিতা।
তোমার নাম লেখার জন্যে আমি
নিসর্গের কাছ থেকে ধার করছি বর্ণমালা
আগুন বৃষ্টি বিদ্যুৎ ঝড়
আর সভ্যতার কাছ থেকে, একটি ছুরি
এইসব অক্ষর দিয়ে তোমার নাম আমি লিখছি, তোমার নাম: অগ্নিময় বৃষ্টিতে তুমি ঠান্ডা, হিম, সোনালি ছুরি প্রিয়তমা।
(তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা গান বাজবে)
প্রেমের কবিতা হোক আর বিদ্রোহের কবিতা হোক, কবিদের কাজ একটাই, ভালো কবিতা লেখা। আর কবিতার কাজ হচ্ছে, জীবনের বন্দনার গান গেয়ে যাওয়া।
ছেলেবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার আলাদা ঝোঁক, গান ছাড়া একদণ্ড চলে না আমার।
কতবার বলেছি, যদি গান গাইতে পারতাম তবে কবিতা কে লেখে।
যে তোমাকে ডেকেছিল রাধা আধখানা তার ভাঙাগলা, আধখানা তার সাধা (মিউজিক হবে)
আমি সারা জীবন ভাঙা গলায় সংগীতের জন্য হাহাকার ধ্বনিতে অপেক্ষা করেছি, আমার অপেক্ষা ফোরায়নি।
আমি ঘর বেঁধেছিলাম তাঁর সঙ্গে, যাঁর চরণচিহ্ন অনুসরণ করে অনেক অনেক গান, হরিণের পালের মতো ছুটে যেতে চাইত। গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল, তোমার চরণ চিহ্নের অভিসারী।
(গান: তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)
গানগুলো তাঁর চরণ চিহ্নের প্রতি অনুগত থাকতে পারলেও আমি পারিনি। পারিনি কারণ, আমি অনেক কিছুই পারি নাই। আমি অনেক অনেক লেখা লিখতে পারিনি, অনেক প্রশংসায় ভাসতে বা ভাসাতে পারিনি, অন্যের মন জুগিয়ে চলতে পারিনি। নিজের প্রথম সংসার টিকিয়ে রাখতে পারিনি। আমি সুখী হতে চেয়েছিলাম। একজন গৃহস্থের মতো কোলের বিড়াল আর প্রাঙ্গণের কুকুর নিয়ে সুখী হতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভাগ্যে সুখ ছিল না। জার্মানিতে গিয়েছিলাম সস্ত্রীক। ফিরতে হয়েছিল একা। প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে ঠিকই কিন্তু..
আমেরিকান মেয়ে, ডিনা। ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল লন্ডনে। বিবিসিতে কাজ করতে গিয়ে পরিচয়। তখন খুব একলা, নিঃসঙ্গ ছিলাম। বিয়ে করে ফেললাম তাকে। প্রথম বিয়ে যেমন না ভেবে করেছি, দ্বিতীয় বিয়েও তেমনি, না ভেবে করা।
আমি এ যাবৎ আমার নিজের ব্যাপারে যতগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, তার প্রায় সবই শেষ পর্যন্ত আমার জন্য গভীর মনস্তাপের কারণ হয়েছে।
ডিনার সঙ্গে আমেরিকা চলে এলাম। কেউ কেউ ডিনাকে বলত, তুমি কি জানো তোমার স্বামী বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান কবি? সে বলত, হ্যাঁ, নিশ্চয়, নিশ্চয়, বাংলাদেশ থেকে যারা আসে তারা সবাই একেকজন বিখ্যাত ব্যক্তি বটে। আমার পরিবেশ আমার পক্ষে ছিল না কখনোই। একদিন হুট করে ডিনা মরে গেল। আমি আবার নিঃসঙ্গ হলাম।
দুজন নারী আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে। একজন ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে, আরেকজন জীবনের মায়া কাটিয়ে চলে গেছে।
সংসার নিয়ে সংক্ষেপে এটুকুই বলতে পারি, আমার পক্ষে সংসারজীবন না হলেই ভালো হতো।
আমার চারপাশে শূন্যতা, অসুস্থ অসহায় জীবন, তার মধ্যে প্রবেশ করে নীরা নামের নারী।
হে নবীনা, এই মধ্য ম্যানহাটানে বাতাসের ঝাপটায়
তোমার হঠাৎ খুলে যাওয়া উদ্দাম চুল
আমার বুকের পর আছড়ে পড়ল
চিরকালের বাংলার বৈশাখের ঝঞ্ঝার মতোন।
নীরার সঙ্গে এখন সংসার করে যাচ্ছি।
আমি হলাম সেই শহীদ যে সংসারে থেকেও সংসার বিবাগী, ঘরের ভেতর থেকেও বড্ড বেশি বোহেমিয়ান।
আমি ছিলাম নতুন ঢাকার প্রথম বোহেমিয়ান চরিত্র। বোদলেয়ারের বেহিসেবি বোহেমিয়ান জীবনযাপনের সঙ্গে আমাকে মিশিয়ে দেখার চেষ্টা ছিল আমার বন্ধুদের।
আহ বোদলেয়ার। পাগলের মতো মাথা কামিয়ে সবুজ রং মেখে প্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। ছেলেপিলেরা ইট মারত। টাকার অভাব ছিল। কিন্তু কবিতা কি অসাধারণ!
নেমে আসে রাত্রি, যেন অবরুদ্ধ অন্দরমহল নিশ্বাসে তোমার ঘ্রাণ, কী মধুর, তীব্র হলাহল তোমার চোখের তারা অন্ধকারে আমার উদ্ধার
ঘুমায় আমার হাতে, ভ্রাতৃভাবে, পা দুটি তোমার—
(ফরাসি দেশের মিউজিক)
শার্ল বোদলেয়ারের একটিই কবিতার বই, ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল। যা কিছু কবিতা নয় তা থেকে কবিতার মুক্তির প্রথম দলিল, ল্য ফ্ল্যর দ্যু মাল।
বোদলেয়ারের প্রভাবে আমাদের মধ্যে একসময় খুব ফরাসি কবিতার চল শুরু হলো। আমরা তখন ঢাকার রাস্তায় প্যারিসের রমণী আর ক্লেদজ কুসুমের জগতে আশরীর প্রোথিত হয়ে আছি। তেমনই একদিনে আমি শামসুর রাহমানকে বললাম, মসিয়েঁ, বাংলা ভাষায় আপনার ফরাসি কবিতা লেখা কেমন চলছে? আমার কথা শুনে ভদ্র সম্ভ্রান্ত শামসুর রাহমান গম্ভীর, চক্ষুদ্বয় স্থির। তিন মাস আমার সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ। আমাকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। আমার এই গোঁ-হোসি-হতি ফঁসেস, মানে ফরাসি বেয়াদবি, তিনি মেনে নিতে পারেননি।
আমরা কবি হবার বাসনায় ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, বিভিন্ন ভাষায় ডুব দিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছি কবিতার সৌন্দর্য। বাংলা ভাষায় ডুব দিয়ে তুলে এনেছি কবিতার নতুন উপমা উৎপ্রেক্ষা। আমরা সবকিছু ভুলে শুধু ডুবে ছিলাম কবিতার আটপৌরে পুকুরে।
বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে, তিনি অনেক কিছু হতে পারতেন, দার্শনিক হতে পারতেন, বিজ্ঞানী হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেসব কিছু না হয়ে কবি হলেন। শুধু কবিতা লিখলেন। বুদ্ধদেবের এই মহান বাণী আমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমিও অনেক কিছু হতে পারতাম। চেয়ার হতে পারতাম, টেবিল হতে পারতাম, পার্কের বেঞ্চ হতে পারতাম। কিন্তু সেসব না হয়ে আমি কবি হলাম। জীবনভর শুধু কবিতা লিখলাম। আমার জীবনে কেবলই কবিতার বৃষ্টি বৃষ্টি।
বাংলা কবিতায় বৃষ্টি তিন প্রকার—
এক, রাবিন্দ্রীক বৃষ্টি, এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়, এমন দিনে মন খোলা যায়।
দুই, অমিয় চক্রবর্তীর বৃষ্টি, কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে।
তিন, শহীদ কাদরীর বৃষ্টি।
সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভিড়ে, যারা ছিল তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটল, চৌদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মতো, যেন বা মড়কে শহর উজাড় হবে, বলে গেল কেউ, শহরের পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে নেড়ে, খুব ঠান্ডা এক ভয়াল গলায়, এবং হঠাৎ (বজ্রসহ বিদ্যুতের মিউজিক) সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম। বজ্র শিলাসহ বৃষ্টি বৃষ্টি। (বৃষ্টির শব্দ)
সওগাত অফিসে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখে বলল, এই বয়সে বৃষ্টি বৃষ্টি কবিতা লিখে বসে আছ।
বৃষ্টি বৃষ্টি নিয়ে অনেকেই মিষ্টি মিষ্টি প্রশংসা করেছে। আমি গায়ে মাখিনি।
মানুষের প্রশংসায় আমি ভিজে যাবার পাত্র নই। এর চেয়ে ঘুম আমার কাছে অনেক আনন্দময়। আমি আমার যৌবনের অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ক্যারিয়ার দরকার, টাকাপয়সা জমানো উচিত, ভবিষ্যতে নিরাপত্তার প্রয়োজন, এগুলো কখনো ভাবিনি। জীবনে আমি অনেক রকম স্কোপ পেয়েছি, কোনোটাই কাজে লাগাইনি। তবে কাজের খোঁজে কিছুকাল আমি চাকরির বাজারে ঘুরেছি। গিয়ে দেখি জীবনানন্দের কথাই সত্য, পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।
ঢাকা টেলিভিশনের চাকরিই ছিল আমার প্রথম দাসত্ব।
এক দূতাবাসে বার্তা বিভাগের প্রধানের চাকরি করেছিলাম।
দেশি ওষুধ কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করেছি।
সংবাদের সহ-সম্পাদক ছিলাম। কোনোটাই আমার পোষায়নি।
চাকরিতে মন নেই, সর্বদাই রক্তনেত্র, শোকের পতাকা
মনে হয় ইচ্ছা করে উড়িয়েছে একরাশ চুলের বদলে।
আমি টেলিভিশনের চাকরি ছাড়ি ’৬৭ সালে, ১৯৭৪ সালে এসে সেই টেলিভিশন থেকে আমার ডাক পড়ল। এত বছর কোনো খবর নেই। তারপর হঠাৎ ডাক, ডাক না বলে বলা উচিত বজ্রনির্ঘোষ।
সৈয়দ মুজতবা আলী তখন ঢাকায়। তাঁর একটা সাক্ষাৎকার প্রচারিত হবে টেলিভিশনে। প্রোগ্রাম ফাইনাল। কিন্তু কে তার সাক্ষাৎকার নেবে সেটা তখনো ঠিক হয়নি। আমি কোনো এক রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে তুলে নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হলো ক্যামেরার সামনে বসে থাকা সৈয়দ মুজতবা আলীর সামনে। যেন আমাকে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো বাঘের খাঁচায়। আমি বাংলার বিখ্যাত রঙ্গ লেখকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছি, সর্বাঙ্গে ভয়ের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলে। প্রোগ্রাম কেমন হয়েছিল সেটা আজ আর বলতে পারব না। শুধু মনে আছে রেকর্ডিং শেষে সৈয়দ সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি তো আমাকে ঘামিয়ে দিয়েছ বালক, তা আমার ঘামের গন্ধ থেকে কমলালেবুর ঘ্রাণ পাচ্ছ তো?
ইজদানি মারা গেছে বিমান পতনে। স্পর্ধা ছিল পৃথিবীকে মুঠো করে ধরে, নরম সুগোল এক কমলালেবুর মতো। সৈয়দ হকের লেখা কবিতা। আমার বিশ্বাস গোটা বাংলাদেশে এমন কবিতা দ্বিতীয়টি লেখা হয়নি। বাংলা ভাষায় অনেক কবিতাই আমার প্রিয়।
সুধীন দত্তের জেসন, বিষ্ণু দের আইসায়ার খেদ, আবিদ আজাদের খেলনা যুগ।
এ যুগ খেলনা যুগ। খেলনা যুগের সবচেয়ে ঠুনকো খেলনা হচ্ছে মানুষ, দেশ, বিশ্বাস, হৃদয় এবং প্রেম।
একসময় সব পছন্দের কবিতা আমার মুখস্থ ছিল। আড্ডায় শতশত কবিতার লাইন বলে যেতাম।
মাথার ওপর ডাকল পেঁচা, চমকে উঠি আরে আরে আরে, আধখানা চাঁদ আটকে আছে টেলিগ্রাফের তারে।
এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম
এত পথ হেঁটে, এত জল ঘেঁটে, কী তবে পেলাম?
কী তবে পেলাম (নরেশ গুহ)
কবিতা মুখস্থ থাকলে কবিতার শ্বাসপ্রশ্বাস টের পাওয়া যায়। কবিতার গন্ধ নাকে এসে লাগে। আমার ইচ্ছা ছিল দশ হাজার কবিতা মুখস্থ করে ফেলব।
ঝুলে থাকে মাঝরাতে রেস্তোরাঁর কড়িকাঠ থেকে,
বাদুড় না বেলুন বন্ধু, স্বপ্ন না হতাশায় ঠাসা?
ভোজনরসিক যদি, নাও তবে জ্বলজ্বলে আত্মাটিরে আমার। (পাতা ৩৫)
শুধু কবি নয়, আমাকে যথেষ্ট ভোজনরসিকও বলা যায়। আমি খেতে পছন্দ করি। এখনো ঢাকার খাবারের কথা মনে আছে। রেক্সের পরোটা কাবাব, ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত সুখাদ্য। চকবাজারের মোরগ পোলাও, খাসির মাংসের গ্লাসি, গ্রিন হোটেলের চিকেন টিক্কা, রেড বাটনের রোস্টেড ল্যাম্ব লেগ, আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে।
দানাদার, জিলাপি আর কালাচাদের ছানার আমৃত্তির কথা মৃত্যু অবধি মনে থাকবে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে প্রিয় হলো, সিগারেট।
রজনীগন্ধার মতো কিছু শুভ্র সিগারেট আমার ফুসফুস ও ফুর্তি দুটোই দখলে নিয়েছে।
ঢাকায় আড্ডার সময় চায়ের পর সিগারেট, সিগারেটের পর চা, চা-সিগারেট চা-সিগারেট-চা, এই সাইকেলে আমরা ঘুরে বেড়াতাম ফুটপাথ থেকে ফাইভস্টার। অভয়দাস লেন থেকে মতিঝিল, হাটখোলা, সদরঘাট, ঠাটারীবাজার...
আমি ঠাঠা রৌদ্রে ঠাটারীবাজার মাত করে চঞ্চল চোখের
কালো চকচকে চোখে ঝুলছি বাসি-মাংস ইদানীং চোখে চোখে ঠাঠা রৌদ্রে ঠাটারীবাজারে কাত হয়ে
বাসি মাংস ইদানীং পড়ে আছি বন্ধুদের ঈগলচক্ষু চোখের
ভেতরে চোখে।
কবিতা লেখাকে আমি কখনো সিরিয়াসলি নেইনি। আমি আমার সাহিত্য জীবনকেও খুব একটা পাত্তা দিইনি। আড্ডাবাজ হিসেবে আমি অতুলনীয়, বক্তা হিসেবে আকর্ষণীয়। কিন্তু কবি হিসেবে বিরলপ্রজ। আমার কবিতার সংখ্যা বিরল মাত্রায় কম, বইয়ের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে সীমিত। আমি কম লিখেছি। শুধু কম না, অস্বাভাবিক কম।
নিজের কম লেখার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় আমাকে বলতে হয়েছে, ভালো লেখকরা একটু কমই লিখে। বলতে হয়েছে র্যাঁবো, বোদলেয়ার, মালার্মে, টেড হিউজ কিংবা সিলভিয়া প্লাথের জীবদ্দশায় প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২টি। আসলে এসব খোঁড়া যুক্তি। আমার কম লেখার পেছনে রয়েছে আলস্য। লিখতে অলসতার কারণেই আমার লেখা বিপুল বিশাল কম। এর দায় আমার, শুধু আমার।
কবিতা লিখতে গেলে সংকোচ হতো। ভাবতাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুধীন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, এত বড় বড় কবির পাশে আমি কবিতা লেখার কে?
শামসুর রাহমানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মায়েস্ত্রো, আপনি কি মনে করেন আমার দ্বারা কবিতা হবে? শামসুর রাহমান মুচকি মুচকি হেসে, শেক্সপিয়ারিয় ঢঙে বলেছিল, হতে পারে, নাও হতে পারে। শামসুর রাহমানের কথা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে, আমার হয়েছে তবে বিশেষ কিছু হয়নি। ৪টি কবিতা বইয়ে ১৪২টি কবিতা হয়েছে। এত কম লিখে আমি বাংলা কবিতায় কবি হিসেবে টিকে থাকব কী করে?
আমি কবি হব, এমন কোনো ভাবনা আমার মধ্যে ছিল না। আমি পেইন্টার হতে চেয়েছিলাম। প্রচুর ছবি আঁকতাম তখন। কিন্তু ভাইয়ার অনাগ্রহে আর্ট কলেজে ঢোকা হয়নি। আঁকাআঁকি বাদ দিয়ে শুরু করি লেখালেখি। লেখালেখির শুরুতে ভেবে বের করলাম, আমি পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত কবিতা লিখব। তারপর তিরিশ পর্যন্ত উপন্যাস, তিরিশের পর লিখব কিছু প্রবন্ধ এবং চল্লিশ হলে আত্মহত্যা করব। হা হা হা...
(স্যাড মিউজিক)
প্রকারান্তরে আমি আত্মহত্যাই করেছি। লেখকদের স্বদেশ ত্যাগ আত্মহত্যার শামিল। আমি কি সেই মিছিলে অংশ নিইনি?
লিখেছিলাম, রেস্তোরাঁর দ্বারগুলো খোলা, আমি অবহেলে চলে যাব। তাই তো গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম?
চোখের সামনে সবকিছু বদলে যেতে থাকল। আমার কাছের মানুষ, আত্মার স্পন্দন, আমার বন্ধুরা, দুই ভাগ হয়ে গেল। পদাবলী আর কবিকণ্ঠ, দুই গ্রুপ। আমি কোনো গ্রুপেই জড়াইনি। শুধু আমার ভেতরে অস্থিরতা বাসা বাঁধল। আমি মানতে পারছিলাম না, কিছুতেই না। আমি সব সময় ভেবে এসেছি, আমাদের এই ক্রন্দনভরাতুর গ্রহে মানবিকতার শেষতম দুর্গ হচ্ছে কবির হৃদয়। কিন্তু আমি কি দেখছি? আমার শিল্পচর্চার ভ্রমণসঙ্গীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে দয়াহীনভাবে দক্ষ হয়ে উঠছে।
দেশ ছাড়ার আগে পরিচিত একজনকে আমার একটি বই উপহার দিয়েছিলাম। বই হাতে নিয়ে তিনি বললেন, খুব দুঃখ পেলাম শহীদ, খুব দুঃখ পেলাম, খুবই দুঃখ পেলাম, খুবই, খুবই..। কী আশ্চর্য, এত দুঃখ পাচ্ছেন কেন? তিনি বললেন, দুঃখ পাব না! বইয়ের ওপর আমার নামটাই লিখলা শুধু, কবি লিখলা না? আমি হাসতে হাসতে সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকালাম। (লাইটের পরিবর্তন)
একাকী চাঁদ, দখল নিয়েছে আকাশ।
যদি কোনো দিন এই করতলে, বাউলের একতারার মতন বেজে ওঠে একাকী ওই চাঁদ, আমি ছেড়ে যাব, সব ছেড়ে যাব, কেটে পড়ব, সটকে পড়ব, ছিঁচকে চোরের মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে, উধাও পালাব...
(পালিয়ে যাবার গান)
১৯৭৮ সাল। পালিয়ে চলে গেলাম বরফ কঠিন বিদেশ।
আমি এত বছর বিদেশে থাকলাম, কিন্তু বিদেশি নাগরিকত্ব আমি নিইনি, বাংলাদেশের পাসপোর্ট আমি রেখে দিয়েছি। আমি তো জানি আমি ফিরবই। যদিও অনেকবার, অনেক অনেকবার, অ্যাটেমপ্ট নিয়েছি, ফেরা হয়নি। একবার তো সব রেডি। টিকিট কনফার্ম করলাম, এখানকার কাজ থেকে ইস্তফা দিলাম, মেডিকেল ছাড়পত্রের জন্য ব্লাড টেস্ট দিয়ে রাখলাম, লাগেজ গুছিয়ে ফেললাম, বিদায় টিদায় নিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড। তখন থাকতাম বোস্টন। মাঝখানে একটা প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করতে নিউইয়র্ক গেলাম। খুব ভালো প্রোগ্রাম হলো।
অনুষ্ঠান শেষে আমি চা খাচ্ছি, সিগারেট খাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি। এ রকম একটা পার্টি মুডে থাকা অবস্থায় ভেন্যুর একজন অফিসিয়াল এসে আমাকে বলল, ‘ক্ষমা করবেন, আপনার একটা ফোন এসেছে হাসপাতাল থেকে’। আমি তো অবাক। হাসপাতাল থেকে আমাকে কেন খুঁজবে। আমার পরিচিত কেউ কি হাসপাতালে, কেউ কি গুরুতর অসুস্থ। একটা ধোঁয়াশার মধ্যে, আমি যেয়ে ফোন ধরলাম, হ্যালো। অপর প্রান্ত থেকে বলল, ‘বোস্টন হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনার ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। আপনার সময়টা ক্রিটিক্যাল। আপনাকে এখনই হাসপাতালে আসতে হবে।’ আমি বুঝতেই পারছি না, কী এমন ঘটল যে এখনই রওনা দিতে হবে। হাসপাতাল জানাল, আমার দুটো কিডনিই নষ্ট, এখনই ডায়ালিসিস শুরু করতে হবে। আমি ব্লাড টেস্ট দিয়েছি মেডিকেল ছাড়পত্রের জন্য, যাতে দেশে যেতে পারি। আর এরা কিনা খুঁজে বের করল আমার কিডনি নষ্ট।
তিন তিনটে মহাদেশ থেকে
অন্তত ছ’বার উড়োজাহাজের টিকেট কিনেও
তোমাদের উঠোন পেরিয়ে
নিজস্ব আটচালার দিকে আমার যাত্রা সাঙ্গ হয়নি এখনো।
অসুস্থতা আমাকে দেশে ফিরতে দেয়নি। ২০০২ সাল থেকে ডায়ালিসিস শুরু হয়। ডায়ালিসিস নিয়ে সাধারণত পাঁচ বছর বেঁচে থাকা যায়, তারপর এক্সটেনশান। আমি এখন এক্সটেনশনের শেষ স্টেজে আছি। শরীরে অসংখ্য অসুখ। সবকিছু বলতে চাই না।
অনেক ব্যয়বহুল চিকিত্সার মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই বলে টাকাপয়সা নিয়ে আমি কোনো দিন হাহাকার করিনি। টাকাগুলো কবে পাব, বলে কবিতা লিখেছি। কিন্তু টাকাপয়সা থেকে দূরে দূরে থেকেছি। যাকে টাকা পাঠায় জীবনানন্দ দাশ, তার আবার অভাব কিসের।
প্রত্যেক ভাষায় একজন বিশেষ কবি থাকে যে ঐতিহ্য থেকে বের হয়ে এমন ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করে, যার কাছাকাছি আগে কেউ কিছু লেখেনি। পূর্বের লেখার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। বাংলা ভাষার সেই বিশেষ কবি জীবনানন্দ দাশ। হি ইজ টোটালি আউট অব দ্য ব্লু, আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে। হি ইজ অনলি ওয়ান, জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।
তার কবিতা মোস্ট রেডিয়েন্ট, এক্সকুইজিট অ্যান্ড আনম্যাচেবল বিউটি।
নলিনী বাবুর মেয়ের নাম ছিল বিউটি। তার নামেই বিউটি বোর্ডিং। বাংলাবাজারে ঢুকে একটু সামনে এগোলেই শ্রীশদাস লেন। শ্রীশদাস লেনের ১ নং বাড়িটাই বিউটি বোর্ডিং। ওপেন এয়ার ঘাস, মাঠ। মাঠের মধ্যে ওপেন এয়ারে চেয়ার-টেবিল। আমরা গোবিন্দ রামের রেস্টুরেন্ট ছেড়ে বিউটি বোর্ডিং চলে এলাম আড্ডা দিতে।
আমাদের আড্ডায় বিউটি বোর্ডিংয়ের সুনাম ছড়িয়ে গেল। বিউটি বোর্ডিং নিয়ে শামসুর রাহমান লিখল স্মৃতিভরাতুর কাব্য।
প্রত্যহ দু’বেলা বাংলাবাজারের শীর্ণগলির ভেতর সেই
বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পর মুখ দেখার আশায়
আমরা ক’জন
তখন তুমুল সময়কে
দিয়েছি গড়িয়ে স্রেফ চায়ের বাটিতে কখনো জুটেছে
ফুল চন্দনের ঘ্রাণ, কখনো বা হুল বেশুমার।
শামসুর রাহমানের এক কবিতায় বিউটি বোর্ডিং হয়ে উঠল কিংবদন্তি।
আমাদের যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সুচারু, যা কিছু সংবেদনশীল, সেসব কিছুর এক অসামান্য সমন্বয় ঘটেছিল শামসুর রাহমানের মধ্যে। তিনি আমাদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেন। তিনি বলতেন আমাদের হবে। আর আমরা হয়ে গেলাম। আমরা সবাই কবি হয়ে গেলাম। আমি, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, সৈয়দ শামসুল হক। আমাদের হাত দিয়েই পঞ্চাশের কবিতা নতুন চরিত্র হয়ে উঠল। আমরা সব সময় চেষ্টা করেছি বাংলা ভাষার উত্কৃষ্ট এবং প্রথম শ্রেণির কবিতা লিখতে।
পৃথিবীর প্রধান কবিরা সারা জীবনে প্রথম শ্রেণির কবিতা লিখতে পারে সাত থেকে আটটি। আমি সম্ভবত পাঁচ ছয়টি প্রথম শ্রেণির কবিতা লিখতে পেরেছি। এটা নিজের সম্পর্কে একটা অ্যাসেসমেন্ট। আমার অ্যাসেসমেন্ট ভুল হতে পারে। জীবনে অনেক ভুলই তো করেছি। সবচেয়ে উত্কৃষ্ট এবং প্রথম শ্রেণির ভুল হলো, দেশ ছেড়ে যাওয়া। কেউ আমাকে বাধ্য করেনি। সজ্ঞানে স্বইচ্ছায় এই ভুল বেছে নিয়েছি। তবে আমাকে দেশ ছাড়তে প্রাণপণ বাধা দিয়েছিল দুজন। রফিক আজাদ আর বটু। তারা খুব করে ধরল, যেও না, যেও না। কারও ভালো কথা শোনার জন্য আমার জন্ম হয়নি। দেশ ছেড়েছি আজ কত বছর। তবু ওই দুজনের কথা আমার এখনো কানে বাজে। যেও না, যেও না, তুমি গেলে ঢাকার শূন্যস্থান পূরণ হবে না।
(শূন্যতার মিউজিক)
শহীদ কাদরী বিহীন ঢাকা কি থমকে গেছে, ঢাকা কি অভিশপ্ত ব্যাবিলন। ঢাকায় কি এখন চা–বিহীন সকাল, রসহীন মধ্যাহ্ন, আড্ডাহীন রাত, প্রেম ও উপলব্ধিহীন ফুটপাত?
ঢাকা, আমার শহর ঢাকা,
উষ্ণ, লাল কিংখাবে ঢাকা।
একটি প্রাদেশিক শহরে আমি এসেছিলাম, বিদায় নিয়েছিলাম রাজধানী শহর থেকে। আমার বিদায়ে আমার বন্ধুদের সময় অসময়ে হয়তো মনে হয়েছে, ‘আহা, শহীদ যদি থাকত এখন’!
(স্যাড মিউজিক যাবে)
ঢাকা শহরে আমার আড্ডার উত্তরসূরি হলো হুমায়ূন আহমেদ। যদিও তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। আড্ডা হয়নি।
ঢাকা শহরে আমার আড্ডার পূর্বসূরি হলেন কবি আবুল হোসেন। তার সঙ্গে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে, আড্ডা হয়েছে।
আবুল হোসেনেরও আগে ঢাকার আড্ডার বিখ্যাত নাম বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেব যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র তখন তার পুরানা পল্টনের টিনের ঘরে জমজমাট আড্ডা বসত।
আজ এ কথা ভেবে আশ্চর্য লাগে যে আমিও একসময় পুরানা পল্টনে থাকতাম। বুদ্ধদেব বসুর পুরানা পল্টন। বুদ্ধদেব বসু ছড়া কাটত—
আমি আছি বেজায় সুখে আমাদের এই পল্টনে
এমন পাড়া কেউ পাবে না বার্লিনে কি লন্ডনে।
ঢাকা ছাড়ার পর বুদ্ধদেব স্মৃতিকাতর হয়ে বলত, কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর কোন জায়গা। আমি অনায়াসে উত্তর দিই, পুরানা পল্টন। ঢাকা ছাড়ার পর বুদ্ধদেবের আর ঢাকায় ফেরা হয়নি। আমার অবস্থাও বুদ্ধদেবের মতোই। কিন্তু আমি ঢাকায় ফিরতে চাই। আমি উন্মুখ হয়ে আছি ঢাকায় ফিরব। চকবাজার থেকে চাঁদের আলোয় হেঁটে যাব পুরানা পল্টন। কী তীব্র জ্যোত্স্না হেনে যায়, কী তীব্র জ্যোত্স্না হেনে যায়।
বুদ্ধদেব আমারও বাড়ি ছিল সেই পল্টনে
আমিও ঘুরেছি কত বার্লিনে আর লন্ডনে।
কথিত আছে, বুদ্ধদেব বসু ঢাকা ছেড়ে কলকাতার কফি হাউস দখল নেবার পর, কলকাতা থেকে এসে, ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ের দখল বুঝে নেয় শহীদ কাদরী। আড্ডা আর আলস্যের নির্যাস শহীদ কাদরী। তার সঙ্গে কিঞ্চিৎ কবিতার অসুখ।
আমাদের সময় কবিতা ছিল, একধরনের অসুখ, উন্মাদনা, একটা ঘোর। এই ঘোর থেকে আমরা কখনো বের হতে পারিনি। আমাদের কানে কবিতা ছাড়া অন্য কোনো আহ্বান পৌঁছায়নি। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বুদ্ধদেব বসু আর তার কবিতা পত্রিকা। আমরা হাপিত্যেশ নিয়ে অপেক্ষা করতাম কবে আসবে কবিতা পত্রিকা। কবিতা পত্রিকার বিভিন্ন টপিকস নিয়ে আমাদের মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনা হতো, আমরা তর্কে মেতে উঠতাম।
কবি শহীদ কাদরীকবিদের মধ্যে তর্কের অন্যতম একটি বিষয় হলো, কে বড় কবি আর কে গৌণ কবি? আমি নিজেও একসময় এসব করে বেড়িয়েছি। বলে বেড়িয়েছি সমর সেন গৌণ কবি, কিন্তু মার্ক্সিস্ট বিষ্ণুদে বড় কবি। নজরুলকে অনেকেই গৌণ মনে করে, কারণ তার কবিতায় আছে বক্তৃতা, উপদেশ, নীতিকথা। কিন্তু আমার কাছে কাজী নজরুল ইসলাম বড় কবি। তার কবিতায় প্রেম আছে, নিসর্গ আছে, রাজনীতি আছে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আছে, সাম্যের গান আছে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই আছে। কী নেই নজরুলে?
আমি অনেক সময় চেষ্টা করেছি নজরুল আর সুকান্তের মতো লেখার, তবে শেষ পর্যন্ত আমি আমার মতোই লিখেছি। কবিতা থেকে নাকিকান্নার সুর বাদ দিয়েছি। সত্তর পেরুনো যুদ্ধদগ্ধ বাংলাদেশে নাকিকান্না একেবারেই বেমানান।
আমি কবিতায় গুরুগম্ভীর সুরের বদলে, হালকা চালে জীবনের গভীর কথা কিছু বলতে চেয়েছি।
তবে আমার কবিতায় নাটকীয়তা আছে, ট্র্যাজেডি আর কমেডি একসঙ্গে চলতে থাকে।
বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা, মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ।
অন্বেষণের মাছ, এটা ট্র্যাজেডি। এখানে মাছের মৃত্যু আছে।
ব্যারাকে ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ, ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই।
নীলগাই, এটাও ট্র্যাজেডি, এর মধ্যেও একটা মৃত্যু আছে।
এই কবিতায় কমেডি হলো, প্রেমিক–প্রেমিকার মিলন। প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সঙ্গে ঠিকই কিন্তু...
এইবার স্যাটেয়ার হচ্ছে। শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...
(হাসি ও স্যাড মিউজিক)
আমার বন্ধুদের অনেকেই শান্তি খুঁজে পেয়েছে আত্মজীবনী লিখে। শামসুর রাহমান লিখেছে কালের ধুলোয় লেখা, আল মাহমুদ লিখেছে বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ, বেলাল চৌধুরী লিখেছে নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছে ভালোবাসার সাম্পান, সৈয়দ হক লিখেছে তিন পয়সার জ্যোছনা। এ রকম একটি আত্মজীবনী আমারও কি লেখা উচিত ছিল না?
চাইলে আমি লিখতে পারতাম হয়তো, লিখিনি। আমি চাইনি পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে। অনেকেই অনেকভাবে আঘাত করেছে, সেসব আঘাত ভুলে যেতে চেয়েছি। আত্মজীবনী লিখে সেসব আঘাতকারীকে নতুন করে সামনে আনতে চাইনি। ইনফ্যাক্ট কবিতার বাইরে আমি কিছুই লিখিনি। কিছু যদি লিখেও থাকি, সেগুলো প্রণিধানযোগ্য নয়। কবিতাই আরাধ্য আমার, কবিতাই আমার অক্ষম অস্ত্র।
চঞ্চল উজ্জ্বল বেপরোয়া নিঃসঙ্গ ক্লান্তিকর বিদ্রুপাত্মক আর খোলাহাসির শহীদ কাদরীকে শুধু কবিতায় পাওয়া যাবে, অন্য কোথাও নয়। আমার কবিতাই আমার আত্মজীবনী।
অথচ কবিতা লেখার সময় মনে হতো, ধুর, লিখে কী হবে। লিখতাম না। আমি কবিতা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যদিকে চলে যাই। শামসুর রাহমান আমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আবার কবিতায় ফিরিয়ে আনে। শামসুর রাহমান বারংবার বলত, কবিতার পথই হলো আপনার একমাত্র পথ। শামসুর রাহমানের কারণে কবিতা থেকে খুব বেশি দূরে যেতে পারিনি। যেখানেই গেছি, যতদূরেই গেছি, কবিতার কাছেই ফিরতে হয়েছে। সেই শামসুর রাহমান আমাকে নিয়ে কবিতা লিখল।
শহীদ, বলো তো বন্ধু সেইসব দুপুর, গোধূলীবেলা আর সন্ধ্যারাত- মধ্যরাত
মার্কিন মুলুকে ঢেউ হয়ে স্মৃতিতটে আছড়ে পড়ে কি কখনো সখনো?
বলো, পাতাল ট্রেনের কামরায়
তন্দ্রাচ্ছন্ন মুহূর্তে চকিতে জেগে ওঠো নাকি;
বিউটি বোর্ডিং আর লক্ষ্মীবাজারের ঘ্রাণে?
কবিতাটি আমি স্বাভাবিকভাবে এই পর্যন্তই পড়তে পারি, তারপর সব ঝাপসা হয়ে যায়, শব্দগুলো ভেঙে পড়তে থাকে...
যখন বস্টনে, ঘন কুয়াশার কাফ-জড়ানো সন্ধেবেলা কাঙ্ক্ষিত আড্ডায় মেতে ওঠে কিংবা তুষারের আলিঙ্গন ছিঁড়ে
দীর্ঘক্ষণ কর্মস্থলে ডুবে থাকো, তখন কি আচানক
মনে পড়ে যায়, হায়, কোনো কোনো মৃত, অর্ধমৃত
ঢাকাবাসী বান্ধবের মুখ? কখনো মনে কি পড়ে
বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবনের স্পর্শময়
কবিতা পত্রের জন্যে অধীর প্রতীক্ষা আমাদের? তখন কি
তোমাকে দখল করে অতীতের স্মৃতিকাতরতা?...
আমার পক্ষে আর পড়া সম্ভব হয় না।
এই কবিতার শেষের দিকে লেখা আছে
শহীদ, হে প্রিয় বন্ধু আমার, তুমি কি ফিরে এসে...
আমার ফেরা হয় না। দীর্ঘ দীর্ঘ কাল আমার ফেরা হয় না।
অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিল, ঘর নেই, আছে ঘরের দিকে যাওয়া। আমি লিখেছিলাম, এবার আমি বলতে পারি, যাচ্ছি বাড়ি, যাচ্ছি বাড়ি। আমার বাড়ির নাম ঢাকা, গ্রামের নাম বাংলাদেশ।
একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ
আমার কনিষ্ঠ আঙুলে
দুটো কাজ আমার এখনো অপূর্ণ আছে। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখা, আর বাংলা কবিতার একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংকলন বের করা।
পূরণ হবে কিনা জানি না। আমাদের সবার ইচ্ছা সব সময় পূরণ হয় না।
আব্বার ইচ্ছা ছিল আমাকে দেরাদুন ক্যাডেট কলেজে পড়াবেন, আব্বার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আম্মার ইচ্ছা ছিল বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় তার ছেলের কবিতা ছাপা হবে, তিনি পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়বেন। আম্মার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। যেদিন থেকে আমি দেশ ছেড়েছি, সেদিন থেকেই আমার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা। তবে আমার ইচ্ছা এখনো অটুট, আমি ফিরব আমার শহরে। কবিদের শহর ঢাকায়, যেখানে আমি বেড়ে উঠেছিলাম। শুধু ঢাকার রাস্তায় হাঁটবার জন্য একবার অন্তত দেশে পৌঁছাতেই হবে আমাকে। আমার বন্ধুদের অনেকেই আর নেই, নতুন কবিরা তো আছে। নতুন কবিদের সঙ্গে হাঁটব এক রাত্রি ঢাকার রাস্তায়। নতুন কবিদের কি সময় হবে না শহীদ কাদরীর সঙ্গে হাঁটবার? নতুন কবিদের উদ্দেশ্যে আমার একটিই আহ্বান,
দাঁড়াও আমি আসছি।
আমার ফেরার অপেক্ষায় কেউ কি দাঁড়িয়ে আছে? শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক? আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ? তুই শুধু বেঁচে গেলি দোস্ত, বিভীষণ অন্যদের ছুঁলো।
ইদানীং আমার বন্ধুদের চোখ, আমার বন্ধুদের চোখ ইদানীং চোখে চোখে রাখে শুধু, চোখে চোখে, ঈগলচক্ষু বন্ধুরা আমার
সেদিনকার শ্রীশদাস লেন নিবাসী, তরুণ, কবি যশোপ্রার্থী শহীদ কাদরীর তুলনায় আজকের বৃদ্ধ, স্মৃতিভ্রষ্ট শহীদ কাদরী একটি প্রহেলিকা, একজন মৃত্যু পথযাত্রীর প্রলাপ ও প্রবচন।
পিয়ারী, গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল, তোমার চরণ চিহ্নের অভিসারী।
বুদ্ধদেব, আমি ছাড়া আর কে তোমাকে মনে রেখেছে।
আল মাহমুদ, তোর প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট নেব দোস্ত।
শামসুর রাহমান, আমি কি পেরেছি কবি হতে?
আমার প্রিয় দেশ, আমরা চুম্বনগুলো কি যথাযথ পৌঁছেছে?
আমি নিশ্চিত, একদিন ঠিকঠিক পৌঁছে যাব আমার বাংলাদেশে।
বিদায়! মধ্যরাতের দীর্ঘ রাস্তা, উঁচু স্তম্ভের আলো, সস্তা রেস্তোরাঁর ম্লান টেবিল, কান্নার করাত, বৃষ্টি, শিলা।
বিদায়! ঝড়ের রাত, গণিকাপল্লির আলো, কর্কশ গলার গান।
বিদায়! বঙ্গোপসাগরের হাঙর, কুমির, জলোচ্ছ্বাস।
আমি এক নগণ্য মানুষ
আমি শুধু বলি
জলে পড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন।
বিদায় ঘড়ির গান, বাতাসে পর্দার নাচ, কৌচে অলস বিকেল, রাঙা মাটির লাল ধুলো, বিদায়, বিদায়!
যা কিছু ঘৃণা করি, বিদায়!
যা কিছু আক্রোশে ভরে দিত, বিদায়!
যা কিছু ভালোবাসি, বিদায়!
বিদায়, রাঙা বৌ, বিদায়, বিদায়!
হে বিচারকমণ্ডলী
আমাকে বাঁচতে দিন আর দু’ঘণ্টা, দু’মিনিট অন্তত আরও দুই সেকেন্ড আমাকে বাঁচতে দিন।
আমি সুরের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমার সুরগুলো ছিঁড়ে গেছে, ভেঙে গেছে।
আমি এখন বেঢপ তানপুরা বাঁকাচোরা ভাঙা ভায়োলিন
হিরণ্ময় ধ্বংসাবশেষ
অন্তিম রেস্তোরাঁ।
স্বায়ত্তশাসিত হৃদয় নিয়ে বেঁচে ছিলাম ঢাকায়
এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি নিউইয়র্ক।
চারপাশে কিসের গন্ধ, অচেনা গন্ধ আমাকে ঘিরে ধরেছে, আমার স্বদেশ কি আমায় ডাকছে।
আমি জানি একদিন ঠিকই পৌঁছে যাব স্বদেশে, অদৃষ্টের পরিহাসের মতো একটি চমত্কার কারুকাজ করা ব্রাউন কফিনে শুয়ে।
হে আমার ঢাকা
তখন তুমি আমায় চিনতে পারবে তো হে
(যবনিকা)
রচনাকাল: ১৯.০১.২০২৬