স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে
· Prothom Alo

দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি খরচ হয় ওষুধ কিনতে। এই খরচের বেশির ভাগই রোগীকে নিজেকে বহন করতে হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, শিল্পের বিকাশে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বাজার প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দেওয়া বেশি কার্যকর।
আজ শনিবার বিকেলে ‘ওষুধের দাম: কী যুক্তি? কার যুক্তি? সমাধান কী?’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। এ ওয়েবিনার আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।
Visit sport-tr.bet for more information.
ওয়েবিনারে রোগীদের ওষুধের খরচ সহনশীল রাখা, ওষুধশিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ, ওষুধের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় এ আলোচনায় শিক্ষক, আইনজীবী, জনস্বাস্থ্যবিদ এবং ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি–২০২৬ বাতিলের সমালোচনা করে জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘অংশীজনদের, বিশেষ করে ঔষধ শিল্প মালিক যারা তাদের মতামত পুরোটা প্রতিফলিত হয়নি এমন অজুহাতে পুরো জিনিসটাকে বাতিল করা হলো। পুরো ওষুধের বাজারটাকে খোলাবাজারে নিয়ে গেলেন। যেখানে প্রতিযোগিতার বদলে সিন্ডিকেট হয়।’ এটি একেবারে বাতিল না করে আরও আলোচনার সুযোগ ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কায়সার কবির বলেন, স্থানীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশে ওষুধ তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। দেশের বাজারে সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নয়। মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগগুলোর চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশে ওষুধের চাহিদার ৯৮ শতাংশ স্থানীয় শিল্প থেকেই সরবরাহ করা হয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, প্রায় সব রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশেই তৈরি হচ্ছে। মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে ওষুধের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের দাম সমন্বয় না করায় কিছু ওষুধ এখন বাজারে পাওয়া যায় না। কারণ, নেতিবাচক মুনাফা হওয়ায় কোম্পানিগুলো সেগুলো তৈরি করছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘একটা ফর্মুলার ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টা ওষুধের দাম নির্ধারণ করার একটা বিধান ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৯৪ সাল থেকে এই ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেই ১১৭টা ওষুধের দাম সম্মিলিতভাবে কোনো সময় সমন্বয় করা হয়নি।’ এতে করে ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান।
এই শিক্ষক আরও বলেন, ওষুধের মূল্য সমন্বয়ের দায়িত্ব একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকার পরিচালিত কমিটির হাতে থাকে। ফলে জনরোষের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় মূল্য সমন্বয় আটকে থাকে।
১৯৮২ সালের ড্রাগস কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্সে সরকারকে সব ধরনের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ২০২৩ সালে নতুন আইন করে সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করেছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সরকার ওষুধের নির্দিষ্ট তালিকা করে কেবল সেসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে। অথচ সেই তালিকা এখনো তৈরি হয়নি।
অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির উদাহরণ দিয়ে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্ট মাসে উৎপাদন হয়েছে এমন এক ওষুধের গায়ে মূল্য লেখা ৪০০ টাকা। সেপ্টেম্বরে উৎপাদন তারিখ লেখা ওই ওষুধের দাম আবার ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ৬০০ টাকা দাম বেড়েছে। এটা কি কল্পনা করা যায়! এই দামটা বাড়াল কে?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য ৮৩০ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছিল। তবে এটি চাহিদার তুলনায় এখনো পর্যাপ্ত নয়। তিনি সরকারি ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধে তদারকির আহ্বান জানান এবং ‘জেনেরিক’ নামে ওষুধ বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করার তাগিদ দেন।