গুম প্রতিরোধে কেমন আইন ও বিচার দরকার
· Prothom Alo

রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা, আটকের অস্বীকৃতি, ভুক্তভোগীর অবস্থান গোপন রাখা এবং তাঁকে আইনের সুরক্ষার বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো গুমকে সাধারণ অপহরণ থেকে আলাদা করে। গুম প্রতিরোধে কেমন আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নিয়ে লিখেছেন নাফিউল আলম
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নির্বিচার গ্রেপ্তার, গোপন আটক ও গুমের বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার স্বজনের খোঁজে বছরের পর বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কিন্তু তাদের ভাগ্যে জুটেছে রাষ্ট্রের অস্বীকৃতি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীরবতা এবং কার্যকর প্রতিকারের অভাব। তাই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি ছিল না; এটি ছিল সেই দায়মুক্তির কাঠামো ভেঙে দেওয়ারও দাবি, যার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে এসেছে।
Visit afnews.co.za for more information.
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে শুরুতেই মনে রাখা দরকার, গুম শুধু অপহরণের গুরুতর কোনো ধরন নয়। রাষ্ট্রীয় সংস্থা কিংবা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে কাজ করা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কাউকে আটক বা তুলে নেওয়ার পর সেই আটক অস্বীকার করলে অথবা তার অবস্থান ও পরিণতি গোপন রাখলে, ওই ব্যক্তিকে কার্যত আইনের সুরক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই পুরো ঘটনাক্রমই গুম।
গুমের তদন্তের পরিধি নিয়ে বিভ্রান্তি২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সব ব্যক্তিকে গুম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেওয়ার পর এখন আসল প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন একটি কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করা যায়, যা গুমের বিশেষ চরিত্রকে স্বীকার করবে; কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি ব্যতিক্রমী ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা তৈরি করবে না।
খসড়া আইনের বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। এতে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও চলমান অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গুমের চেষ্টা, সহায়তা ও ষড়যন্ত্রকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গোপন আটককেন্দ্রের বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কমান্ড পর্যায়ের দায়ও স্বীকার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর অধিকার, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং একটি তথ্যভান্ডার তৈরির ব্যবস্থাও খসড়ায় রাখা হয়েছে।
এগুলো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু একটি আইন কতটা কঠোর, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং কারা সেই আইন প্রয়োগ করবে।
শুধু দণ্ডবিধি সংশোধন যথেষ্ট নয়
বর্তমান দণ্ডবিধিতে অপহরণ, জোরপূর্বক তুলে নেওয়া ও গোপনে আটক রাখার বিধান থাকলেও গুমের পূর্ণ চরিত্র এতে ধরা পড়ে না। রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা, ভুক্তভোগীর অস্বীকৃতি, ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখা এবং তাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো গুমকে সাধারণ অপহরণ থেকে আলাদা করে। তাই গুমকে দণ্ডবিধিতে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইনেও প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার। তবে শুধু এসব সংশোধন যথেষ্ট নয়। তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান, স্বাধীন তদন্ত, ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও প্রয়োজন।
বিশেষ আইন প্রয়োজন, ব্যতিক্রমী বিচারব্যবস্থা নয়
বাংলাদেশে গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ আইন, বিশেষ আদালত ও আলাদা বিচারপ্রক্রিয়া তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাধারণত কঠোর শাস্তি ও দ্রুত বিচারের যুক্তিতে এসব ব্যবস্থা তৈরি হয়। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় একই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মধ্যে গ্রেপ্তার, জামিন, সাক্ষ্য ও বিচারের ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম গড়ে ওঠে। ব্যতিক্রম ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
এই খসড়ায় পৃথক গুম আদালত গঠনের প্রস্তাব নেই; বিদ্যমান দায়রা জজ আদালতকেই বিচারের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। তবে সব অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা, অনুপস্থিতিতে বিচারের ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার স্থানান্তরের মতো বিশেষ পদ্ধতিগত বিধান রাখা হয়েছে।
গুমের গুরুতর চরিত্র অবশ্যই কার্যকর আইনি কাঠামোর দাবি রাখে। কিন্তু অপরাধ যত গুরুতরই হোক, ন্যায়সংগত বিচার, দোষ প্রমাণের আগে নির্দোষ হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার, আইনজীবীর সহায়তা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং স্বাধীন আদালতের অধিকার দুর্বল করা যায় না।
এখানে একটি মৌলিক বৈপরীত্যও আছে। গুমের অপরাধের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো একজন মানুষকে আইনের সুরক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া। সেই অপরাধের বিচার করতে গিয়ে যদি অভিযুক্তকেও সাধারণ আইনি সুরক্ষা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আইনটি নিজের নীতিগত ভিত্তির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘স্বাধীন তদন্ত’
খসড়া আইনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপর রাখা। গুমের অভিযোগে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাই অভিযুক্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে একই রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতরের কোনো প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া সরাসরি স্বার্থসংঘাত তৈরি করে।
কোনো তদন্তকে স্বাধীন বলা যায় না, যদি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্য, তাঁদের সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নথি, সাক্ষী, আটক–সংক্রান্ত তথ্য কিংবা তদন্তের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারেন। তাই একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্তব্যবস্থা প্রয়োজন। এই সংস্থার সরকারি বা গোপন সব ধরনের আটকস্থলে প্রবেশ, নথি ও যোগাযোগের তথ্য তলব, আলামত সংরক্ষণ, স্বাধীন ফরেনসিক সহায়তা গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী ও তাদের আইনজীবীদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। একটি ন্যূনতম নীতি হওয়া উচিত: যে সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই সংস্থা নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে না।
২৪ ঘণ্টার ব্যতিক্রম কেন বিপজ্জনক
খসড়ায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার আগপর্যন্ত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যক্তির আটক বা অবস্থান গোপন রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সুরক্ষা দেয়। একইভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারাও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার বেশি পুলিশ হেফাজতে রাখার সুযোগ দেয় না।
এই ২৪ ঘণ্টার সীমা কাউকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত গোপনে আটকে রাখার অনুমতি নয়; বরং দ্রুত বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ সময়সীমা। কাউকে ২০ বা ২৩ ঘণ্টা গোপন স্থানে রেখে, পরিবার ও আইনজীবীকে তাঁর অবস্থান না জানিয়ে পরে আদালতে হাজির করলেই সেই গোপন আটক বৈধ হয়ে যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, খসড়া আইন নিজেই জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে গুমের অজুহাত হিসেবে অগ্রহণযোগ্য করেছে। ফলে ২৪ ঘণ্টার এই ব্যতিক্রম খসড়ার নিজের নীতির সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বিধান বাদ দেওয়া উচিত।
অনুসন্ধান ও তদন্ত এক বিষয় নয়
গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা—এ দুটি আলাদা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত। মামলা দায়ের, প্রাথমিক তদন্ত শেষ হওয়া কিংবা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। কারণ, প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা দিন অনেক ক্ষেত্রেই জীবন রক্ষা ও আলামত সংরক্ষণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খসড়ায় আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানার ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু সেই তল্লাশি পুলিশ বা অন্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও করতে পারবেন। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, সেই বাহিনীর সদস্যকেই একই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করবে। অনুসন্ধান এমন একটি স্বাধীন প্রক্রিয়া হতে হবে, যা ফৌজদারি মামলার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাগ্য ও অবস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলবে।
গুমের ব্যতিক্রমী চরিত্র স্বীকার করা প্রয়োজন। কিন্তু তার উত্তর আরেকটি ব্যতিক্রমী বিচারব্যবস্থা নয়। প্রয়োজন এমন একটি আইন, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে আরও জবাবদিহির মধ্যে আনবে এবং আইনের শাসনকে পাশ কাটিয়ে নয়, বরং আরও শক্তিশালী করে সত্য, ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের পথ তৈরি করবে।
আরও কয়েকটি বিধান পুনর্বিবেচনা দরকার
ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে খসড়া আইন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নির্ধারণ করেছে। তবে ভাষাটি এমন হওয়া উচিত নয় যেন ‘সর্বব্যাপী’ বা ‘পদ্ধতিগত’ হয়ে গেলে ঘটনাটি আর ‘গুম’ থাকে না; বরং তখন সেটি গুম এবং একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে।
মিথ্যা বা হয়রানিমূলক অভিযোগের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। গুমের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সাধারণত রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করা না গেলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা হয়ে যায় না। শুধু ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষমূলকভাবে মিথ্যা অভিযোগ তৈরির বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেই শাস্তির প্রশ্ন আসা উচিত।
প্রতিকার শুধু ক্ষতিপূরণ নয়
গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগী শুধু নিখোঁজ ব্যক্তি নন; তাঁর পরিবারও সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, স্বজনের পরিণতি না জানা, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ এবং মানসিক যন্ত্রণা পরিবারের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই প্রতিকারকে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে গুমের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ হয় না।
প্রতিকারের মধ্যে থাকতে হবে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা সহায়তা, পুনর্বাসন, সত্য জানার অধিকার, রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যায় স্বীকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না হওয়ার নিশ্চয়তা। খসড়ায় ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসনের বিধান ইতিবাচক। তবে এসব প্রতিকার কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির দণ্ডের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
ফৌজদারি দায় নির্ধারণ এবং ভুক্তভোগীর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার দুটি পৃথক বিষয়। একজন অপরাধীকে শনাক্ত বা দণ্ডিত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব না–ও হতে পারে; কিন্তু তত দিনে পরিবারের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি থেমে থাকে না। তাই অনুসন্ধান, পুনর্বাসন, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র দায়িত্ব হওয়া উচিত।
একইভাবে ‘গুম সনদ’ বা সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা এমনভাবে করতে হবে, যাতে তা কোনোভাবেই ‘মৃত্যুঘোষণা’য় পরিণত না হয়। একজন ব্যক্তির অবস্থান অজানা থাকা পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে বের করা, সত্য উদ্ঘাটন করা এবং ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের চলমান দায়িত্ব।
আইন দরকার, কিন্তু কেমন আইন?
বাংলাদেশে গুমের জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন প্রয়োজন, কিন্তু তার অর্থ একটি বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা নয়। নতুন আইনে গুমের স্বতন্ত্র চরিত্র, তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান, স্বাধীন তদন্ত, ভুক্তভোগীর অংশগ্রহণ, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও সাক্ষ্য আইনেও প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে, যাতে গুমের বিচার সাধারণ বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে এবং পূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষার অধীনে পরিচালিত হয়।
মৃত্যুদণ্ড আছে কি না বা শাস্তি কত কঠোর, তা দিয়ে এই আইনের সাফল্য–ব্যর্থতা বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে, ভুক্তভোগীর পরিবার ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারছে কি না; কেউ নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে কি না; অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না এবং ভুক্তভোগীরা সত্য, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন কি না।
গুমের ব্যতিক্রমী চরিত্র স্বীকার করা প্রয়োজন। কিন্তু তার উত্তর আরেকটি ব্যতিক্রমী বিচারব্যবস্থা নয়। প্রয়োজন এমন একটি আইন, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে আরও জবাবদিহির মধ্যে আনবে এবং আইনের শাসনকে পাশ কাটিয়ে নয়, বরং আরও শক্তিশালী করে সত্য, ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের পথ তৈরি করবে।
নাফিউল আলম আইনজীবী, গবেষক ও অধিকারকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব