আত্মরক্ষা হোক শিশুর শিক্ষার অংশ

· Prothom Alo

মার্শাল আর্ট শুধু খেলাধুলা নয়; এটি হতে পারে শিশুর আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও নিরাপত্তার শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

Visit freshyourfeel.org for more information.

আমরা একটি শিশুকে বর্ণমালা শেখাই, সংখ্যা শেখাই, ইতিহাস-বিজ্ঞান শেখাই। পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তাকে প্রস্তুত করি। ভবিষ্যতে সে ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রশাসক হবে—এমন স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এই শিক্ষার ভেতর একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই অনুচ্চারিত থেকে যায়—বিপদের মুহূর্তে শিশুটি নিজেকে কতটা নিরাপদ রাখতে পারবে?

কেউ তাকে অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে সে কি ‘না’ বলতে পারবে? কেউ জোর করে কোথাও নিয়ে যেতে চাইলে সে কি বুঝতে পারবে পরিস্থিতিটি বিপজ্জনক? ভয় পেলে সে কি সাহায্যের জন্য চিৎকার করবে? বিশ্বাসযোগ্য কোনো বড় মানুষের কাছে ঘটনাটি বলতে পারবে? আর এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়লে, যেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা ছাড়া উপায় নেই, সে কি নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু মৌলিক কৌশল জানবে? এসব প্রশ্ন কেবল আত্মরক্ষার নয়; এগুলো শিশুর জীবনদক্ষতার প্রশ্ন। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়টির গুরুত্ব এখনো পর্যাপ্ত নয়।

শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা সামনে এলে আমরা ক্ষুব্ধ হই, বিচার দাবি করি, অপরাধীর শাস্তি চাই। অবশ্যই বিচার ও শাস্তি জরুরি। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পর শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? অপরাধ ঘটার আগেই শিশুকে সচেতন ও সক্ষম করে তোলার কোনো উদ্যোগ কি থাকবে না?

সময় এসেছে বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আত্মরক্ষার শিক্ষা এবং বয়সোপযোগী মার্শাল আর্টকে পরিকল্পিত সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার।

শিশু নির্যাতন শুধু মেয়েদের সমস্যা নয়
শিশু নির্যাতনের আলোচনা হলেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত মেয়েশিশুর ছবি ভেসে ওঠে। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা ও নানা ধরনের হয়রানিতে মেয়েশিশুরা যে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু এখানেই আলোচনা থেমে গেলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

ছেলে শিশুরাও যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অথচ ‘ছেলেরা শক্ত’, ‘ছেলেরা ভয় পায় না’, ‘ছেলেরা কাঁদে না’—এমন সামাজিক ধারণার কারণে অনেক ছেলে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। লজ্জা, ভয় কিংবা অবিশ্বাসের আশঙ্কায় তারা ঘটনাটি নিজের ভেতরেই চাপা দিয়ে রাখে। শৈশবের একটি নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শৈশবেই শেষ হয়ে যায় না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক, নিরাপত্তাবোধ এবং নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণার ওপর পড়তে পারে। তাই ছেলে বা মেয়ে—কোনো শিশুর নির্যাতনকেই কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম ক্ষতিকর ভাবার সুযোগ নেই।

নির্যাতনকারী সব সময় অপরিচিত নয়
শিশুদের নিরাপত্তা শেখাতে গিয়ে আমরা প্রায়ই বলি, ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যাবে না।’ নিঃসন্দেহে এটি প্রয়োজনীয় শিক্ষা। কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। কারণ, শিশুর জন্য সব ঝুঁকি অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না। আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী কিংবা পরিবারের পরিচিত কেউও কখনো শিশুর আস্থার সুযোগ নিতে পারে।

তাই শিশুকে শুধু অপরিচিত মানুষ থেকে সাবধান করলেই হবে না। তাকে বোঝাতে হবে—কোন আচরণ নিরাপদ, কোন আচরণ অস্বস্তিকর এবং কোন পরিস্থিতিতে তাকে দ্রুত সরে যেতে হবে। কাউকে পরিচিত মনে হলেই তার সব আচরণ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না—এই বোধও শিশুর মধ্যে তৈরি করতে হবে।

আত্মরক্ষার প্রথম পাঠ মার্শাল আর্ট নয়—নিজের শরীরের ওপর অধিকার
আত্মরক্ষা বলতে আমরা অনেক সময় কারাতে, জুডো, তায়কোয়ান্দো কিংবা অন্য কোনো মার্শাল আর্টকে বুঝি। কিন্তু শিশুর আত্মরক্ষার প্রথম পাঠ শারীরিক কৌশল দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। প্রথম পাঠ হওয়া উচিত একটি সহজ উপলব্ধি—‘আমার শরীর, আমার অধিকার।’
বয়স উপযোগী ভাষায় শিশুকে শেখাতে হবে, তার ব্যক্তিগত সীমারেখা আছে। কেউ সেই সীমারেখা অতিক্রম করলে সে আপত্তি করতে পারে। কোনো স্পর্শে অস্বস্তি হলে সে ‘না’ বলতে পারে। পরিচিত কেউ হলেও তার অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো পরিস্থিতি তাকে ভয় বা অস্বস্তিতে ফেললে সে যেন বিশ্বাসযোগ্য কোনো বড় মানুষের কাছে তা বলতে পারে।

এই শিক্ষা শিশুর মনে ভয় তৈরি করার জন্য নয়; বরং আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করার জন্য। যে শিশু জানে তার ‘না’ বলার অধিকার আছে, সে নিজের নিরাপত্তার বিষয়েও বেশি সচেতন হতে পারে।

‘না’ বলা আত্মরক্ষার শক্তিশালী অস্ত্র
আত্মরক্ষার প্রথম অস্ত্র সব সময় হাত-পা নয়—কণ্ঠস্বরও একটি শক্তিশালী অস্ত্র। দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, জোরে চিৎকার করা, দ্রুত সরে যাওয়া, নিরাপদ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া—এসবও আত্মরক্ষা।

তাই শিশুদের আত্মরক্ষার শিক্ষা বলতে শুধু শারীরিক কৌশল শেখালে চলবে না। শেখাতে হবে কখন কথা বলতে হবে, কখন সরে যেতে হবে, কখন সাহায্য চাইতে হবে এবং কখন দ্রুত কোনো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মার্শাল আর্ট এই সামগ্রিক শিক্ষার একটি ব্যবহারিক অংশ হতে পারে।

মার্শাল আর্ট কেন?
মার্শাল আর্টের উদ্দেশ্য শিশুকে কাউকে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত করা নয়। সঠিকভাবে শেখানো হলে এটি শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মনোযোগ, শরীরের ভারসাম্য, আত্মবিশ্বাস এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মতো দক্ষতা বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশু নিজের শরীর ও সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়। নির্দেশনা অনুসরণ করতে শেখে। চাপের মধ্যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ওপর তার আস্থা বাড়ে।
তবে একটি নীতি স্পষ্ট থাকা জরুরি—
মার্শাল আর্টের লক্ষ্য লড়াই করা নয়; নিরাপদে ফিরে আসা।
প্রথমে বিপদ এড়িয়ে চলা, সম্ভব হলে সরে যাওয়া, সাহায্য চাওয়া এবং একান্ত প্রয়োজন হলে বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করা—এই হওয়া উচিত আত্মরক্ষা শিক্ষার মূল দর্শন।

মার্শাল আর্ট হোক সহশিক্ষার অংশ
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব আমরা স্বীকার করি। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্কাউটিং, চিত্রাঙ্কন, গান, আবৃত্তি কিংবা নৃত্যের মতো কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বিকাশে ভূমিকা রাখে। তাহলে আত্মরক্ষা কেন নয়?

প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় বয়সভিত্তিক আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি সময় এ প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি হতে পারে খেলাধুলা ও শরীরচর্চাভিত্তিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বিপজ্জনক পরিস্থিতি শনাক্ত করা, ব্যক্তিগত সীমারেখা বোঝা, দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা, সাহায্যের জন্য চিৎকার করা, নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং বয়সোপযোগী আত্মরক্ষার কৌশল।

এভাবে মার্শাল আর্টকে শুধু একটি খেলাধুলার কার্যক্রম হিসেবে না দেখে জীবনদক্ষতা ও শিশু সুরক্ষা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

ছেলে-মেয়ের জন্য একই শিক্ষা
আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ শুধু মেয়েদের জন্য—এই ধারণাও বদলাতে হবে। বিপদ যেমন লিঙ্গভেদে আসে না, নির্যাতনও তেমন লিঙ্গভেদে হয় না। একজন ছেলেশিশুও ভয় পেতে পারে, অসহায় হতে পারে, নির্যাতনের শিকার হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে, যেখানে তাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সাহায্য চাইতে হবে। তাই ছেলে শিশুকেও শেখাতে হবে—ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, সাহায্য চাওয়া স্বাভাবিক এবং নিজের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া স্বাভাবিক।

একইভাবে মেয়েশিশুকেও শেখাতে হবে, আত্মরক্ষা তার দুর্বলতার প্রতিকার নয়; বরং আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার একটি অংশ।

মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা আমরা কোথায় হারালাম

আত্মরক্ষার শিক্ষা কখনো শিশুর ওপর দায় চাপাবে না
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা দরকার। কোনো শিশু আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ না জানার কারণে নির্যাতনের শিকার হলে তার দায় শিশুর নয়। কোনো শিশু ভয় পেয়ে চুপ করে থাকলে তার দায়ও শিশুর নয়। কোনো শিশু প্রতিরোধ করতে না পারলেও তার দায় শিশুর নয়। দায় একমাত্র অপরাধীর।

আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ শিশুর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ; অপরাধীর দায় শিশুর ওপর চাপানোর কোনো মাধ্যম নয়। এই পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে আত্মরক্ষার শিক্ষা নিয়েও ভুল বার্তা তৈরি হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ না করে শুধু শিশুকে আত্মরক্ষা শেখানো যাবে না
শিশুকে মার্শাল আর্ট শেখালেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এখান থেকেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক ও কর্মচারীদের আচরণবিধি থাকতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট থাকা দরকার।

একই সঙ্গে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষকদেরও যথাযথ যাচাই ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। কারণ, শিশুকে নিরাপদ করার নামে গড়ে ওঠা কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র যেন নতুন কোনো ঝুঁকির জায়গা না হয়ে ওঠে।

পরিবারই হোক প্রথম নিরাপদ আশ্রয়
শিশুর আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় ভিত্তি পরিবার। একটি শিশু যদি জানে, ‘আমি কোনো বিপদে পড়লে মা-বাবাকে বলতে পারব’, তাহলে তার নিরাপত্তাবোধ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।

তাই শিশুর কথা বিশ্বাস করতে হবে, মন দিয়ে শুনতে হবে এবং তাকে দোষারোপ করা যাবে না। যে শিশু জানে, তার পরিবার তাকে বিশ্বাস করবে, সে বিপদের কথা বলার সাহসও বেশি পাবে।

আত্মরক্ষা শুধু শারীরিক নয়
আজকের শিশুর ঝুঁকি শুধু রাস্তা, স্কুল বা কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল জগতেও রয়েছে হয়রানি, প্রতারণা, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অপব্যবহারের ঝুঁকি।
তাই আত্মরক্ষার সংজ্ঞাকেও আধুনিক করতে হবে।
শারীরিক আত্মরক্ষার পাশাপাশি শুধু ডিজিটাল আইন নয়, প্রতিরোধের সংস্কৃতি চাই।
আত্মরক্ষাও শেখাতে হবে।

কাকে বিশ্বাস করা যায়, ব্যক্তিগত তথ্য কোথায় দেওয়া যাবে না, সন্দেহজনক যোগাযোগ কীভাবে এড়িয়ে চলতে হবে এবং অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কার কাছে জানাতে হবে—এসবও আজকের আত্মরক্ষা শিক্ষার অংশ।

অপরাধীর বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। আইনের কার্যকর প্রয়োগও জরুরি। কিন্তু একটি সমাজ শুধু বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে পারবে না।
প্রয়োজন প্রতিরোধের সংস্কৃতি—পরিবারে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিশুর ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান এবং শিশুর নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এ বিষয়গুলো একসঙ্গে কাজ করলেই একটি শক্তিশালী শিশুসুরক্ষা কাঠামো তৈরি হতে পারে।

শিক্ষার সংজ্ঞা কি আমরা নতুন করে ভাবব না?
আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। কিন্তু শিক্ষা যদি একজন মানুষকে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন না করে, বিপদের সংকেত বুঝতে না শেখায় এবং নিজের সীমারেখা রক্ষা করতে না শেখায়, তাহলে সেই শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতার ঘাটতি থেকেই যায়।

শিশুকে শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা যাবে না; তাকে জীবনের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে।
তাকে শুধু অন্যকে সম্মান করতে শেখালে হবে না, নিজেকেও সম্মান করতে শেখাতে হবে।
তাকে শুধু নিয়ম মানতে শেখালে হবে না; কখন অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে ‘না’ বলতে হবে, সেটিও শেখাতে হবে। তাকে শুধু শান্ত থাকতে শেখালে হবে না; বিপদের সময় কীভাবে দৃঢ় থাকতে হয়, সেটিও শেখাতে হবে।

একটি জাতীয় উদ্যোগ হতে পারে
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য একটি সমন্বিত স্কুল অ্যান্ড মাদ্রাসা সেল্ফ প্রোটেকশন প্রোগ্রাম নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট মার্শাল আর্টের প্রচার নয়; বরং বয়সভিত্তিক একটি জাতীয় শিশুসুরক্ষা ও জীবনদক্ষতা কাঠামো হতে পারে।
এই কর্মসূচিতে থাকতে পারে—
১. ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও শরীর সম্পর্কে সচেতনতা;
২. ভালো-মন্দ আচরণ ও ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে শিক্ষা;
৩. ‘না’ বলা, সাহায্য চাওয়া ও বিপদ থেকে সরে যাওয়ার কৌশল;
৪. বয়সোপযোগী মার্শাল আর্ট ও শারীরিক আত্মরক্ষা;
৫. সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আত্মরক্ষা;
৬. শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিশুসুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ;
৭. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অভিযোগ ও সুরক্ষাব্যবস্থা।

এটি বাস্তবায়িত হলে আত্মরক্ষা আর বিচ্ছিন্ন কোনো খেলাধুলা থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে শিশুর সামগ্রিক জীবনদক্ষতার অংশ।

আমরা কেমন প্রজন্ম চাই?
আমরা কি এমন প্রজন্ম চাই, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো করবে?
নাকি এমন প্রজন্ম চাই, যারা শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সচেতনও হবে?
যারা অন্যকে সম্মান করবে, কিন্তু নিজের মর্যাদাও রক্ষা করবে?
যারা ভদ্র হবে, কিন্তু অন্যায়ের সামনে অসহায় থাকবে না?
যারা শারীরিকভাবে সক্ষম হবে, কিন্তু আগ্রাসী হবে না?
যারা জানবে—সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়?

আমরা বিশ্বাস করি, দ্বিতীয় ধরনের প্রজন্মই আমাদের প্রয়োজন। তাই মার্শাল আর্টকে শুধু ঘুষি-লাথির প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সঠিক প্রশিক্ষণে এটি হতে পারে আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা, শৃঙ্খলার শিক্ষা, আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেকে নিরাপদ রাখার শিক্ষা।

শিশুর হাতে বই থাকবে, তার সঙ্গে থাকবে আত্মবিশ্বাস। তার মনে থাকবে মমতা, তার সঙ্গে থাকবে সচেতনতা। সে অন্যকে সম্মান করবে, কিন্তু নিজের সীমারেখাও রক্ষা করবে।

শিশু নির্যাতন বন্ধের দায়িত্ব কখনোই শিশুর নয়। কিন্তু শিশুকে সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলা আমাদের দায়িত্ব।
তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্নটি নতুনভাবে করার—
শিশুকে আমরা কী হতে শেখাচ্ছি?
শুধু ভালো শিক্ষার্থী, নাকি একজন সচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নিরাপদ মানুষ? শিক্ষার লক্ষ্য যদি সত্যিই জীবনকে প্রস্তুত করা হয়, তাহলে আত্মরক্ষা কেন শিক্ষার বাইরে থাকবে?
মার্শাল আর্ট হোক সহশিক্ষার অংশ।
আত্মরক্ষা হোক জীবনদক্ষতা।
আর প্রতিটি শিশু জানুক, একটি নিরাপদ শৈশব খুব জরুরি এবং এটি কোনো বিলাসিতা নয়। এটি শিশুর অধিকার।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source