বাড়ির সামনে সড়কে গতিরোধক যখন ‘প্রেস্টিজ’, এক কিলোমিটারে ৩৪টি
· Prothom Alo

এক কিলোমিটার সড়কে ৩৪টি গতিরোধক, গড়ে ২৯ মিটার পরপর একটি। ভৈরব-মেন্দিপুর সড়কের রসুলপুর গ্রাম দিয়ে যাওয়ার সময় একটি গতিরোধক পার হতে না হতে দেখা মেলে আরেকটির। এসব গতিরোধক এখন গ্রামবাসীর কাছে অনেকটা ‘প্রেস্টিজ’ তথা সম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো ১৪ দশমিক ২৭ কিলোমিটারের এই সড়কে মোট গতিরোধক ৭৭টি। এগুলোর কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন পরিবহন চলক ও যাত্রীরা।
ভৈরব সড়ক উপবিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভৈরব-মেন্দিপুর সড়ক নির্মাণ করা হয়। ২০১০ সালে সড়কটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে আসে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কারকাজ হয়েছে। ভৈরব স্টেডিয়াম থেকে শুরু হয়ে সড়কটি শেষ হয়েছে মেন্দিপুর ঈদগাহ মাঠে।
Visit extonnews.click for more information.
ফরিদুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী, সওজ ভৈরবএকটি গতিরোধকও আমাদের ইচ্ছায় হয়নি। গ্রামবাসী জোর করে করিয়ে নিয়েছেন। অবস্থা এমন হয়েছে যে বাড়ির সামনে একটি গতিরোধক না থাকলে যেন প্রেস্টিজ থাকে না।ভৈরব-মেন্দিপুর সড়কের রসুলপুর গ্রামে একের পর এক গতিরোধকে যানবাহন চলাচলে দেখা দিয়েছে ভোগান্তিসরেজমিনে দেখা যায়, ভৈরব-মেন্দিপুর সড়কে রসুলপুর গ্রামের দুই প্রান্তের দুটি গ্রাম ভবানীপুর ও সাদেকপুর। দেড় কিলোমিটার দূরত্বের ভবানীপুরে অংশে ১৫টি এবং তিন কিলোমিটার দূরত্বের সাদেকপুরে আছে ১২টি গতিরোধক। এ ছাড়া সড়কটির মেন্দিপুরে দুটি, তেয়ারিচরে একটি, শিমুলকান্দিতে চারটি, মধ্যেরচরে দুটি, দড়িচণ্ডীবেরে দুটি এবং স্টেডিয়াম এলাকায় পাঁচটি গতিরোধক রয়েছে।
সওজ ভৈরব সড়ক উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি গতিরোধকও আমাদের ইচ্ছায় হয়নি। গ্রামবাসী জোর করে করিয়ে নিয়েছেন। অবস্থা এমন হয়েছে যে বাড়ির সামনে একটি গতিরোধক না থাকলে যেন প্রেস্টিজ থাকে না।’
ভৈরবের আর কোনো সড়কে কম দূরত্বে এতসংখ্যক গতিরোধ নেই। এমনকি ভৈরব-মেন্দিপুর সড়কের অন্য গ্রামগুলোতে নেই। তাহলে রসুলপুর গ্রামে কেন এত গতিরোধকের প্রয়োজন হলো, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্রামটির বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা হয়।
আনোয়ার হোসেন, ব্যবস্থাপক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সরসুলপুরের প্রভাব পড়ে লাগোয়া ভবানীপুর ও সাদেকপুরেও। গ্রাম দুটির মানুষও একপর্যায়ে রসুলপুরের মতো গতিরোধককে সম্মানের প্রতীক হিসেবে নিতে শুরু করেন। ফলে রসুলপুরের পর ওই দুই গ্রামে বেশি গতিরোধক। জোর করে গতিরোধকগুলো আমাদের মাধ্যমে তারা করিয়ে নিয়েছে।‘অন্যের আছে, আমার কেন থাকবে না’
সড়কটি সংস্কারকাজের ঠিকাদারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে জানা গেছে, শুরুতে একজন বৃদ্ধ বাড়ির সামনে একটি গতিরোধক দেওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সড়কটি মসৃণ হচ্ছে। গাড়ি দ্রুত চলবে। বাড়িতে ছোট শিশু রয়েছে। তাই বাড়ির সামনে একটি গতিরোধক প্রয়োজন। ঠিকাদারের লোকজন তাঁর অনুরোধ রাখেন। এরপরই শুরু হয় প্রতিযোগিতা।
রসুলপুর গ্রামের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘একজনের বাড়ির সামনে গতিরোধক দেখে আরেকজন বলেন, অন্যের আছে, আমার কেন থাকবে না? এভাবে একের পর এক বাড়ির সামনে গতিরোধক দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে। একপর্যায়ে রসুলপুর গ্রামে একেকটি গতিরোধক সামাজিক প্রতিযোগিতার প্রতীকে পরিণত হয়।’
‘এগুলো আইল্যান্ড না, জুলুম’
স্থানীয় অটোরিকশাচালক সমিতি সূত্র জানায়, ওই সড়ক দিয়ে ৯৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে শতাধিক। উপজেলা সদর থেকে প্রতিটি রিকশা গড়ে ছয়বার আসা–যাওয়া করে। মেন্দিপুর গ্রামটিকে মিনি কক্সবাজার বলা হয়। বাইরের লোকজন ঘুরতে এই সড়ক ব্যবহার করে মেন্দিপুর গ্রামে আসে। চালকেরা জানান, অতিরিক্ত গতিরোধকের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। মেরামত খরচ বেড়েছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আরেক চালক জসিম মিয়া বলেন, ‘এগুলো আইল্যান্ড না, জুলুম। প্রত্যেকে বাড়ির সামনে একটা করে জুলুম বসাইছে। গতিরোধক না থাকলে প্রতিদিন আরও প্রায় ২০০ টাকা বেশি আয় করা যেত।’
অতিরিক্ত গতিরোধকের কারণে চালকদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সবচেয়ে কষ্ট পায় বৃদ্ধ ও গর্ভবতীরা। সাদেকপুর গ্রামের হাতেখড়ি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক শবনম আক্তার বলেন, ‘চীনের দুঃখ যেমন হোয়াংহো নদী, আমাদের দুর্ভোগের প্রধান কারণ ঘন ঘন গতিরোধক।’
রসুলপুর গ্রামে বাড়ির সামনে গতিরোধক থাকাকে সম্মানের প্রতীক ভাবেন অনেকেরসুলপুর গ্রামের ‘রনুর বাড়ি’র সামনে ৩০ ফুটের মধ্যে তিনটি গতিরোধক দেখা গেছে। স্থানীয় দোকানি রহমত উল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হয়, এত কাছাকাছি তিনটি গতিরোধকের প্রয়োজন কী। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন আছে। না দিলে পুলাপাইন গাড়ির নিচে পইরা যাইব।’
সড়কটি সংস্কারকাজে যুক্ত কয়েকজনের ভাষ্য, গতিরোধক বিষয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে তাঁদের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে কাজ বন্ধও হয়ে যায়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রামবাসীর দাবি মেনে নিয়ে গতিরোধক তৈরি করে কাজ শেষ করে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাগর বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘রসুলপুরের প্রভাব পড়ে লাগোয়া ভবানীপুর ও সাদেকপুরেও। গ্রাম দুটির মানুষও একপর্যায়ে রসুলপুরের মতো গতিরোধককে সম্মানের প্রতীক হিসেবে নিতে শুরু করেন। ফলে রসুলপুরের পর ওই দুই গ্রামে বেশি গতিরোধক। জোর করে গতিরোধকগুলো আমাদের মাধ্যমে তারা করিয়ে নিয়েছে। গতিরোধকগুলো করে না দিলে মারধরের শিকার হতো হতো।’
অন্য গ্রামেও ছড়ানোর আশঙ্কা
সড়কের কিছু গতিরোধকের দুই পাশে সাদা রং করা হয়েছে। অনেকগুলোর ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ফলে দূর থেকে চালকদের পক্ষে সব সময় গতিরোধক শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। গতিরোধক কমাতে চালকেরা আন্দোলনও করেছেন। জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, সওজের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে এর প্রতিকার করা যায়, তা দেখা হবে। তাঁর ভাষায়, প্রতি বাড়ির সামনে গতিরোধক রাখার সংস্কৃতি থেকে গ্রামবাসীকে বের করে আনতে হবে। না হলে এই রোগ অন্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।