পলাশীর যুদ্ধ, ‘অচিন’ মীর জাফর এবং ২৬৯ বছরের দেনা

· Prothom Alo

গত ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের বার্ষিকী নীরবেই পার হয়ে গেল। এই দিনটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা আমার চোখে পড়ল না। বিষয়টি দুঃখজনক, কারণ পলাশীর সেই পরাজয় আজও বাংলাদেশের অধিবাসীদের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে চলেছে।

অন্য অনেক জাতি কিন্তু নিজেদের ইতিহাসের এমন বাঁক এত সহজে ভুলে যায় না। চীনের কথাই ধরা যাক। ১৮৬০ সালে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী বেইজিংয়ের অদূরে চীনের ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ লুট করে পুড়িয়ে দিয়েছিল।

Visit catcrossgame.com for more information.

যে দেশ সাধারণত তার অতীতকে হয় ঝলমলে করে পুনর্নির্মাণ করে, নয় মুছে ফেলে নতুন কিছু গড়ে তোলে, সেই চীন আজও ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ধ্বংসস্তূপ যেমন ছিল তেমনই রেখে দিয়েছে, ভাঙা মার্বেলের স্তম্ভ আর ছড়িয়ে থাকা পাথর সরায়নি। উদ্দেশ্য একটাই—ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই জাতীয় অপমান কখনো ভুলে না যায়। তারা যেন বুঝতে পারে, দুর্বলতা আর বিভাজনের শেষ পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।

ইতিহাসের একটা কষ্টের মিল আছে—চীনের যে প্রাসাদ ব্রিটিশদের হাতে পুড়েছিল, সেই ব্রিটিশ শক্তির উত্থান শুরু হয়েছিল আমাদের পলাশীর যুদ্ধ থেকে। মাত্র এক শ বছরের মধ্যে তারা বাংলা থেকে বেইজিং পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের কাছে পলাশী শুধু একটা সাধারণ তারিখ হয়ে গেছে, যেটা আমরা তেমন গুরুত্ব না দিয়েই পার করে দিই।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে দুটি সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়েছিল। একটি পক্ষ তখন দাঁড়িয়ে ছিল এক ঐতিহাসিক উত্থানের সূচনালগ্নে। অন্য পক্ষের জন্য শুরু হয়েছিল এমন এক অবক্ষয়, প্রায় তিন শতাব্দী পরেও যার পূর্ণ প্রতিকার আজও হয়নি।

সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতায় বসেছিলেন তাঁর নানা আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর, ১৭৫৬ সালে; বয়স তখন তেইশ-চব্বিশের বেশি নয়। কিন্তু তিনি যে কাঠামোর উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন, তা ছিল ভেতর থেকে জীর্ণ, বাংলার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া এক ব্যবস্থা।

শিল্পীর চোখে পলাশীর যুদ্ধ

অন্যদিকে সাগরের ওপারে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তত দিনে শিখে ফেলেছে কীভাবে কার্যকরভাবে শাসন করতে হয়, কীভাবে অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিরোধ সামাল দিতে হয়, আর একই সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়। একজন ব্যক্তির ভঙ্গুর কর্তৃত্ব আর একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্যই সম্ভবত পলাশীর মাঠে চূড়ান্ত মীমাংসার আগেই লড়াইয়ের ফলাফল অনেকখানি ঠিক করে দিয়েছিল।

এই উত্থান আর পতনের ধরা পড়ে যুদ্ধের আগে-পরের ঘটনাপ্রবাহেও। পলাশীর আগের বছর, ১৭৫৬ সালে, সিরাজ নিজেই কলকাতা দখল করে ফোর্ট উইলিয়ামের পতন ঘটিয়েছিলেন এক চূড়ান্ত বিজয়ে। অথচ সেই আঘাত সামলে ইংরেজরা অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ফিরে এল, পুনর্দখল করল কলকাতা, আর তাদের সেই অগ্রযাত্রা পৌঁছে গেল বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে দুয়ারে।

বিপরীতে, পলাশীর পরে যখন বাংলার এক নতুন নবাব, মীর কাসিম, আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের সেনাবাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজালেন, রাজধানী সরিয়ে নিলেন ইংরেজদের নাগালের বাইরে মুঙ্গেরে, এবং আরও একবার ইংরেজদের চ্যালেঞ্জ করলেন, তখন ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে তিনি আরও চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলেন। একটি ব্যবস্থা প্রতিটি আঘাতের পর যেন আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসছিল, আর অন্যটি প্রতিটি চেষ্টার পরও কেবল আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার কারণ কী?

একটি প্রচলিত গল্প আছে। কথিত আছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক ইংরেজ সেনা কর্মকর্তা নাকি মন্তব্য করেছিলেন, যুদ্ধের মাঠের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীরা যদি কেবল তাদের হাতের লাঠিসোঁটা নিয়েও কোম্পানির বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলেই ঔপনিবেশিক সেই সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত।

অথচ তারা নীরব দর্শক হয়ে সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। কোম্পানির শাসন যে কী ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনবে, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে তা তখন স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু ২০২৬ সালে, একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি সত্যিই তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করতে পারছে? কারণ, যে জনগণ রাষ্ট্রকে নিজের বলে অনুভব করে না, সংকটের মুহূর্তে তারা আবারও সেই সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব দর্শক হয়েই থেকে যায়।

যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দুই বাহিনীর কামান বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। এরপর নামল টানা বৃষ্টি। বাংলার সেনাবাহিনী বৃষ্টির সময় তাদের বারুদের ভান্ডার ঢেকে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে বৃষ্টি থামার পর তারা আর কামানের গোলা ছুড়তে পারল না, হারিয়ে ফেলল নিজেদের অনেকখানি কৌশলগত সুবিধা। অথচ কোম্পানির বাহিনী তাদের কামান আর বারুদ ঢেকে রেখেছিল। এখান থেকেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়, ঝুঁকি আগেভাগে আঁচ করা আর সময়মতো বিচক্ষণ সতর্কতা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কি আজ আগের চেয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পেরেছি?

২৬৯ বছর আগে বাংলার নবাব এবং বাংলার সেনাবাহিনী যেদিন পলাশীর সেই আম্রকাননে পা রেখেছিল, এই ভূখণ্ড তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ আর সফল এক জনপদ। সেই গাছের সারির ভেতরে একবার ঢুকে পড়ে আমরা যেন আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। সব প্রশ্নের শেষে তাই একটিমাত্র প্রশ্ন থেকে যায়, কবে আমরা পলাশীর ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে পারব?

ইতিহাস লেখেন বিজয়ীরা। কোম্পানির ইতিহাসবিদ আর তাদের সুবিধাভোগীরা প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন সিরাজকে এমন এক তরুণ, অনভিজ্ঞ নবাব হিসেবে আঁকতে, যিনি যেন ঘুমের ঘোরে হেঁটে পলাশীর সামরিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ আমরা জানি, যুদ্ধের উত্তপ্ত মুহূর্তে, চারপাশে ষড়যন্ত্রের জাল ক্রমেই আঁটসাঁট হয়ে উঠতে দেখে মরিয়া সিরাজ নিজের মুকুট মাটিতে ছুড়ে ফেলে তাঁর সেনাপতিদের ওয়াদা চেয়েছিলেন, যেন বাংলার মুকুট হাতছাড়া না হয়।

মীর জাফর মুখে আনুগত্যের মিথ্যা আশ্বাস দিলেন, অথচ তাঁর মন তখন বাঁধা পড়ে আছে শত্রুশিবিরে। এতে বোঝা যাই, সিরাজ নিজের চারপাশে বিছানো ষড়যন্ত্রের জাল আর আসন্ন বিপদ সম্পর্কে ভালোভাবেই সচেতন ছিলেন। দুর্ভাগ্য এই যে তিনি সময়মতো নিজেকে আর নিজের রাজ্যকে সেই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করতে পারেননি।

যে সেনাপতির ওপর তাঁর সবচেয়ে বেশি ভরসা করার কথা ছিল, সেই মীর জাফরই যুদ্ধের মাঠে বিপুল বাহিনী নিয়ে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে রইলেন। বাংলা ভাষায় ‘মীর জাফর’ শব্দটি আজও বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে টিকে আছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বহু নেতাও ঠিক একইভাবে তাঁদের সবচেয়ে বিশ্বস্তজনদের হাতে প্রতারিত হয়েছেন।

শিল্পীর চোখে পলাশীর যুদ্ধ শেষে রবার্ট ক্লাইভের সাথে মীর জাফর।

পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা কোনো একজন মানুষের একক কীর্তি ছিল না। মীর জাফরের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল আস্ত একটি চক্র। ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রভাবশালী মহাজন পরিবার জগৎ শেঠরা তরুণ নবাবের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন; উমিচাঁদের মতো বণিক আর দরবারের অসন্তুষ্ট অভিজাতেরা প্রত্যেকে কষছিলেন নিজের নিজের হিসাব।

এমনকি সিরাজের আপন খালা ঘসেটি বেগমও ভাগনের বিরুদ্ধে বিছানো এই ষড়যন্ত্রের আবহে শামিল ছিলেন; সেদিন রক্তের সম্পর্কও বিশ্বাসঘাতকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সিরাজের প্রকৃত পরাজয়টি বোধ হয় পলাশীর মাঠে নয়, ঘটেছিল তাঁর নিজের দরবারেই, যেখানে তিনি নিজের চারপাশের স্বার্থের জোটটিকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

রবার্ট ক্লাইভ বাংলাকে যতটা না যুদ্ধে জয় করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি কিনে নিয়েছিলেন সেই মানুষগুলোর কাছ থেকে, যাঁদের বাংলাকে রক্ষা করার কথা ছিল। সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে পলাশীর সবচেয়ে গভীর শিক্ষাটি। কোনো বিদেশি শক্তি সচরাচর কেবল নিজের শক্তির জোরে একটি জাতিকে পরাভূত করে না; যতক্ষণ না ক্ষমতার অন্দরমহলের কেউ সেই বিদেশি শক্তিকে সাদরে ডেকে আনে।

আপনি কখন 'যথার্থ ব্রিটিশ' হতে পারবেন?

অনভিজ্ঞ শাসকেরা প্রায়ই সিংহাসনকেই কর্তৃত্ব বলে ভুল করেন, ভুলে যান যে আনুগত্য প্রতিদিন নতুন করে অর্জন করে নিতে হয়। আমাদের জন্য প্রশ্নটি এটাই, আমরা কি ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তা চিনে নিতে শিখেছি, নাকি আজও আমরা আমাদের মীর জাফরদের চিনি কেবল মুকুট হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরেই?

তবে সেই অন্ধকার ছবিটিই পলাশীর পুরো সত্য নয়। বিশ্বাসঘাতকতার পাশেই সেদিন দাঁড়িয়ে ছিল আনুগত্য আর আত্মত্যাগ। নবাবের কামান-বাহিনীর প্রধান সেনাপতি মীর মদন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত নবাবের পক্ষেই লড়ে গেছেন, প্রাণ দিয়েছেন যুদ্ধের মাঠে কামানের গোলার আঘাতে; তাঁর পাশে ছিলেন মোহনলালের মতো বিশ্বস্ত সেনানায়ক, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন।

আবার পরাজয় আর মৃত্যুর পরেও সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নিসা বেগম আজীবন তাঁর স্বামীর স্মৃতির প্রতি অবিচল থেকে গিয়েছিলেন। মীর জাফরের নাম আমরা ঘৃণাভরে উচ্চারণ করি, কিন্তু ইতিহাস যেন এই মানুষগুলোর কথাও সমান যত্নে মনে রাখে, যাঁরা সব হারিয়ে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত জেনেও বিশ্বাসের পক্ষেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

২৬৯ বছর আগে বাংলার নবাব এবং বাংলার সেনাবাহিনী যেদিন পলাশীর সেই আম্রকাননে পা রেখেছিল, এই ভূখণ্ড তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ আর সফল এক জনপদ। সেই গাছের সারির ভেতরে একবার ঢুকে পড়ে আমরা যেন আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। সব প্রশ্নের শেষে তাই একটিমাত্র প্রশ্ন থেকে যায়, কবে আমরা পলাশীর ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে পারব?

  • এহতেশামুল হক ওয়াশিংটন ডিসিতে আইনজীবী এবং কোম্পানি আইনের খণ্ডকালীন অধ্যাপক।

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source