১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাসের হার

· Prothom Alo

এসএসসি পরীক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক উচ্চ পাসের হারের পর দুই বছর ধরে ফলাফল কিছুটা নিম্নমুখী দেখা যাচ্ছে। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার আরও কমেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।

ফলাফল বিশ্লেষণে এবারও ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। গণিতেও কয়েকটি বোর্ডে ফল তুলনামূলক ভালো হয়নি। দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সার্বিক পাসের হারে।

Visit palladian.co.za for more information.

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক বিভাগের দুর্বল ফল। এ বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি, অথচ পাসের হার বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় অনেক কম। ফলে মানবিক বিভাগের ফলও সামগ্রিক পাসের হার নিম্নমুখী হওয়ার বড় কারণ।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রশ্নের ধরন, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের পদ্ধতিও পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলে। আবার প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা বিদ্যালয়ে শিখন মান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গতকাল সোমবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ভোকেশনাল ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়েছে।

দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছাত্রীরা

৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন। গত বছর পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এবার জিপিএ–৫ ও পাসের হারের শীর্ষে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। আর পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।

পাসের হার ও পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে। এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি এবং ছাত্র প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি।

৫ লাখের কাছাকাছি অকৃতকার্য

গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে পর্যন্ত চলে এসএসসি পরীক্ষা। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন উত্তীর্ণ হতে পারেনি—পরীক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমে যাওয়ায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে।

বেড়েছে শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এবার ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ৪৮টি। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একজনও পাস না করার ঘটনা বিদ্যালয়ভিত্তিক শিখন মান ও প্রস্তুতির ঘাটতির প্রশ্নও সামনে এনেছে।

উচ্ছ্বাসে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ঢাকা, ১০ আগস্ট

ইংরেজি-গণিতেই বড় ধাক্কা

এবারের ফলাফলে সার্বিক পাসের হার কমে যাওয়ার পেছনে ইংরেজি ও গণিতের দুর্বল ফল বড় ভূমিকা রেখেছে। কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ।

এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল আগের তুলনায় খারাপ হয়েছে। এবার ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করার কারণেই মূলত পাসের হার কমেছে। দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি সার্বিক ফলাফলে পড়েছে।

ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থীরা ‘বিজয় চিহ্ন’ দেখাচ্ছে। চট্টগ্রাম, ১০ আগস্ট

মানবিকের দুর্বল ফল

বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার সবচেয়ে কম। ছাত্রদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের মধ্যে প্রায় ৫৪ শতাংশ। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলও মানবিকের তুলনায় ভালো। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। ফলে এ বিভাগের তুলনামূলক কম পাসের হার সার্বিক ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

এসএসসির পাসের হারে গত দুই দশকে বড় ওঠানামা হয়েছে। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে। এরপর দু-এক বছর বাদে দীর্ঘ সময় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল; কোনো কোনো বছর তা ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে।

গত বছর থেকে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার তা আরও কমে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন। দীর্ঘ সময় উচ্চ পাসের হার থাকার পর টানা দুই বছর ফল কমার এই প্রবণতা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং বিদ্যালয় পর্যায়ের শিখনঘাটতি—সব কটিরই নতুন করে পর্যালোচনা দরকার বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

তবে এবারের ফলাফলকে খারাপ বলতে রাজি নন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না।’

ভালো ফলাফলের আনন্দ উদ্‌যাপনে সহপাঠীরা। সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সিলেট, ১০ আগস্ট

একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, নির্মোহভাবে সেভাবেই মূল্যায়ন হয়েছে।

গত তিন যুগে এসএসসির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) পদ্ধতি চালুর সময় থেকে পরীক্ষার ফলাফলে আবার বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। পরে প্রশ্নব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আবার পাসের হার তুলনামূলকভাবে কমে আসে। ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে মাধ্যমিকে চালু হয় সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি, যা এখনো বহাল আছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফলাফল বিশ্লেষণ করে শুধু কতজন পাস করেছে বা কতজন অকৃতকার্য হয়েছে, সেসবে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

Read full story at source