ছয়ানিপাড়ার ৬ রাখাইন পরিবারের খোঁজে

· Prothom Alo

২০১৭ সালে যখন গিয়েছিলাম, ছয়ানিপাড়ার গংশে মাতবর তখনো বেঁচে ছিলেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার টিয়াখালী ইউনিয়নের এক ছোট্ট প্রাচীন রাখাইন গ্রাম ছয়ানিপাড়া। রাখাইন ভাষায় গ্রামটির নাম খ্রাওরাদান। খ্রা মানে ছয়, আর রা মানে শতক। জমির দাম ৬০০ টাকা বলে নাম রাখা হয়েছিল ‘খ্রাওরাদান রোওয়া’। পরে নাম হয় ‘ছয়ানিপাড়া’। ১৭৬০ সালের দিকে পাড়াটির পত্তন করেন ফ্রুওয়ান ও পৌম মাতবর। তাঁদের সময় ৬৫ রাখাইন পরিবার ছিল ওই পাড়াতে। ২০১৭ সালের মার্চে গিয়ে দেখা পাই মাত্র ১০ পরিবারের।

Visit milkshake.it.com for more information.

পাড়ার কারও মন ভালো ছিল না। পায়রা বন্দরের জমি অধিগ্রহণের কারণে উচ্ছেদের আতঙ্ক, হতাশা আর অনিশ্চয়তার চাপে পুরো পাড়াটি যেন থেঁতলে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে আগে থেকে কোনো কিছু না জানিয়ে হঠাৎ কয়েকজন সরকারি সার্ভেয়ার ছয়ানিপাড়ায় ঢুকে ছবি তুলে ও ভিডিও করে জায়গা মাপামাপি শুরু করেন। যাওয়ার সময় বলে যান, বন্দরের জন্য ছয়ানিপাড়ার জমি অধিগ্রহণ করা হবে, সময়মতো জানানো হবে। গ্রামবাসী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে গ্রামটি বাঁচানোর দাবি করেছিলেন।

ছয়ানিপাড়াবাসী ও সরকারের ভেতর অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র কারও কাছে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উদ্বাস্তু চিংদামো রাখাইন জানান, স্থায়ী পুনর্বাসনের আগপর্যন্ত প্রশাসন থেকে ছয়টি পরিবারকে ঘরভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছয় মাস দেওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৭ সালে যখন গিয়েছিলাম, তখনো রাখাইন গ্রামগুলোর ক্ষয়িষ্ণু চেহারা চোখে লেগেছিল। ৯ বছর পর, গত জুনে গিয়ে দেখি প্রাচীন গ্রামটিকে নির্দয়ভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া রাখাইন পরিবারগুলোর স্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি।

গংশে মাতবর মারা যাওয়ার পর, ২০২১ সালের নভেম্বরে করোনা মহামারির ভেতর তীব্র শীতের দিনে ছয়ানিপাড়া ছাড়তে হয় সবাইকে। প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বালিয়াতুলী ইউনিয়নের আরেক রাখাইনপাড়ার দিকে যাত্রা করেন সবাই। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল আগেই বিক্রি করা হয়েছিল। পাড়ার শেষ পাঁচটি গরু নিয়ে হেঁটে নয়াপাড়া আসেন লাচিমং।

২০১৭ সালের ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইনের’ ৮ নম্বর ধারা মোতাবেক ঘর, অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ, পুকুর, চাষের মাছ ও গাছপালার ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার থেকে ২০২১ সালে ছয় রাখাইন পরিবারকে মোট ৯৬ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয়।

উন্নয়ন-উদ্বাস্তুরা কোথায় আছেন

ছয়ানিপাড়াবাসী ও সরকারের ভেতর অধিগ্রহণ–সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র কারও কাছে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উদ্বাস্তু চিংদামো রাখাইন জানান, স্থায়ী পুনর্বাসনের আগপর্যন্ত প্রশাসন থেকে ছয়টি পরিবারকে ঘরভাড়া হিসেবে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছয় মাস দেওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর স্থায়ী আবাসনের জন্য নয়াপাড়ার চৌথেন তালুকদারদের কাছ থেকে পায়রা বন্দর যে জায়গাটি কিনেছে, তা জলে ডোবা কৃষিজমি। উদ্বাস্তুরা শুনেছেন, প্রতিটি পরিবার প্রায় আড়াই কড়া করে জমি পাবে (১ কড়া=প্রায় ৩ শতক)। গত জুনে সরেজমিন দেখি, জমিতে কিছু মাটি তোলা হলেও ঘর তৈরির পরিবেশ নেই।

উচ্ছেদ হওয়া চিংদামোর পরিবারে পাঁচজন, লাচিঅংয়ের পরিবারে দুজন, মংচোর পরিবারে দুজন, নেশাই মংয়ের পরিবারে চারজন, ইয়াংসির পরিবারে ছয়জন এবং ভাই–বোন লাচিমং ও চিংদাউ। তবে উন্নয়ন-উদ্বাস্তু সবাইকে নয়াপাড়াতে পাওয়া গেল না। লাচিমং ও চিংদাউ—এ দুই প্রবীণ ভাই–বোন নয়াপাড়ায় পুরোনো একটা ঘরে জায়গা পেয়েছেন। সবাই কষ্ট করে আছেন নয়াপাড়ায়। অনেকখানি পথ হেঁটে খাওয়ার পানি আনতে হয়। চাষাবাদ করার কোনো জায়গাজমি নেই। সবকিছু কিনে খেতে হয়। চিংদামো ও নেশাই মংয়ের পরিবার কলাপাড়াতে ঘর ভাড়া করে থাকে।

পায়রা বন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর প্রাচীন ছয়ানিপাড়া গ্রামটি আর নেই (২০২৬)

ফেলে আসা শ্মশানের স্মৃতি

ছয়ানিপাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর নেশাই মং গত ডিসেম্বরে মারা যান কলাপাড়ার রোওয়া শ্যে পাড়ায় (নতুন পাড়া)। ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় বানানো পাড়া-শ্মশানেই তাঁর সৎকার হয়।

ছয়ানিপাড়ার শশ্মানে ঘুমিয়ে আছেন গংশে মাতবর, লুৎফ্রু মাতবর, ফ্রুমাওউ, মংচিংদা, চিলাউ, মুই মাই্ঞ, চান্দা প্রু ও চিয়েউ। চৈত্রসংক্রান্তিতে সাংগ্রেংপোওয়ে, আশ্বিন পূর্ণিমায় ওয়াজআ কিংবা শ্রাবণ পূর্ণিমাতে ওয়াসো উৎসবের সময় মৃত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর নিয়ম আছে রাখাইন সমাজে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ শ্মশান-সমাধিসহ গ্রামটির কোনো চিহ্নই রাখেনি। ফলে মৃত ব্যক্তিদের প্রতি রাখাইন নিয়মে শ্রদ্ধা জানানোর উপায় রইল না।

বিশাল পায়রা বন্দরে উন্নয়নের ঘণ্টা বাজবে; কিন্তু ক্রমশ তলিয়ে যাবে এক রাখাইনপাড়ার ‘দুর্বল’ চানজের আওয়াজ। বন্দরের ‘সবল’ ঘণ্টার শব্দে হয়তো বাংলাদেশ বলবে, ‘সা-ধু, সা-ধু’।

‘চানজে বাজাতে পারি না’

মন্দিরে টুখং নামের বড় ঘণ্টা বাজানো হলেও রাখাইনরা পূজার সময় ঘরের ভেতর চানজে নামে পিতলের ঘণ্টা বাজান। চানজে টিওসা নামের কাঠি দিয়ে এটি বাজানো হয়। রাখাইনদের বিশ্বাস, চানজে বাজালে মানুষসহ সব জীবের মৃত আত্মারা সজাগ ও সতর্ক হয় এবং বলে, ‘সা-ধু, সা-ধু’।

চিংদামো যে ভাড়া বাসায় আছেন, সেখানে এখনো চানজে বাজাতে পারেননি। আসলে ছয়ানিপাড়া ছাড়ার পর তিনি চানজে হাতে নিতে পারেননি। দেশনা ও পূজা করতেও সমস্যা। কারণ, অনেক ফুল-পাতা নতুন এলাকায় পাওয়া যায় না।

বিশাল পায়রা বন্দরে উন্নয়নের ঘণ্টা বাজবে; কিন্তু ক্রমশ তলিয়ে যাবে এক রাখাইনপাড়ার ‘দুর্বল’ চানজের আওয়াজ। বন্দরের ‘সবল’ ঘণ্টার শব্দে হয়তো বাংলাদেশ বলবে, ‘সা-ধু, সা-ধু’।

বন্দর কর্তৃপক্ষ যত্ন নিয়ে পুরো এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখালেন। কিন্তু অধিগ্রহণ এবং স্থায়ী বন্দোবস্ত বিষয়ে স্পষ্ট কিছুই জানা গেল না।

পবিত্র বৃক্ষটি খুন হলো কেন

ছয়ানিপাড়ার খালের ধারে রাখাইনদের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক পবিত্রস্থল ছিল, রাখাইন ভাষায় বলে ‘চোয়ঁসাবা’। তিন শতকের এই পবিত্রস্থলে ৪টি প্রাচীন চোয়াঁবা (করঞ্জা) ও ১০টি জাবলংবা (খেজুরগাছ) গাছ ছিল। গত জুনে গিয়ে দেখি প্রাচীন বৃক্ষসহ পুরো পবিত্রস্থলটি ধ্বংস করা হয়েছে।

প্রাচীন গাছসহ এই ছোট্ট চোঁয়সাবাটি বন্দর কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারত। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০২৬ এবং সংবিধানের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রাচীন স্মারক বৃক্ষ ও কুঞ্জবন রক্ষা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

উয়েনুদের সাইবংচির শক্তি

বন্দর কর্তৃপক্ষ যত্ন নিয়ে পুরো এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখালেন। কিন্তু অধিগ্রহণ এবং স্থায়ী বন্দোবস্ত বিষয়ে স্পষ্ট কিছুই জানা গেল না। নয়াপাড়ায় রাখাইনদের জন্য ঘর তৈরি ও জমি হস্তান্তর কার্যক্রম কীভাবে এগোবে কে জানে। পায়রা নদীর রাবনাবাদ চ্যানেল অতি পলিপ্রবণ জানার পরও বন্দরটি করা হয়েছে। এখন বন্দরকে সচল রাখতে খনন বাবদ প্রচুর বাজেটও দরকার। অমীমাংসিত এমন বহু জিজ্ঞাসা ছয়ানিপাড়ার মাটির তলায় ঘুমিয়ে আছে।

ছয়ানিপাড়া থেকে উদ্বাস্তু নেশাই মংয়ের স্ত্রী উয়েনুকে খুঁজে পাই কলাপাড়ায়। তাঁদের ভাড়া করা ঘর থেকে বেরোনোর সময় দেখি ঘরের বেড়ায় কিছু বীজ বাঁধা আছে। লালচে টকপাতার সাইবংচি ফলের বীজ। এটি দিয়ে রাখাইনরা হে-রে-চাও নামের স্যুপ বানায়। উয়েনু জানান, এই বীজ তাঁর দাদিশাশুড়ির মায়ের আমলের। বীজের বংশ রক্ষার জন্য শাশুড়ি তাঁকে দিয়ে যান। এই বীজ তাঁদের বংশের স্মৃতির দলিল। ছয়ানিপাড়া থেকে কখানি বীজ আনতে পেরেছেন। উয়েনুকে জিজ্ঞেস করলাম, এরপর এই বীজ কোথায় বুনবেন? উয়েনু অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। জানি না, হয়তো এমন সহস্র সাইবংচির জিনলিপিতেই জেগে থাকে বহু উন্নয়নের মধ্যে জুলুম আর জবানের দাগ।

  • পাভেল পার্থ: লেখক গবেষক

Read full story at source