আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে

· Prothom Alo

কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা হঠাৎ করে বিস্ফোরণের মতো সামনে আসে না। সেগুলো ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আড়ালে ঘটে। বাইরে থেকে সবকিছু জবাবদিহি আর ন্যায্যতার ভাষায় মোড়ানো থাকে। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে চলতে থাকে ভাঙনের কাজ। একটা সময় মানুষ বুঝতে পারে কী ঘটছে। কিন্তু ততক্ষণে বড় ক্ষতিটা হয়ে যায়।

আমার আশঙ্কা, হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আক্রমণগুলোর মধ্যে আমরা ঠিক এই ঘটনাই প্রত্যক্ষ করছি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এমন এক লক্ষ্য পূরণ করছে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহু মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে।

Visit playerbros.org for more information.

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের একদল সিনেটর করিম খানকে সতর্ক করার নামে হুমকিই দিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, যদি তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উদ্যোগ নেন, তাহলে তাঁকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে। কিন্তু এই হুমকিতে তিনি দমে যাননি।

‘গ্রেটার ইসরায়েলের’ স্বপ্ন যেভাবে ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর জন্য বুমেরাং হলো

তিনি ঠিকই নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট এবং হামাসের এক কমান্ডারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেন। এর আগে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে এবং তালেবান নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। করিম খানের বিরোধীরা তাঁকে অপসারণের বিতর্ক শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। তারা তাঁর বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ তুলে বিষয়টিকে বড় করে দেখাতে চাইছে। কিন্তু আদালতের ভেতরে যে বিচারিক প্যানেল আছে, তারা এই অভিযোগগুলো পরীক্ষা করে বলেছে—এসব অভিযোগ প্রমাণ করার মতো শক্ত নয়। অর্থাৎ অভিযোগ থাকলেও তা প্রমাণিত হয়নি।

তারপরও খানের বিরোধীরা থেমে নেই। তারা এখন আরেকটি কৌশল নিচ্ছে। দুটি আলাদা বিষয়—একটি হলো সত্যিই কোনো গুরুতর অপরাধ হয়েছে কি না, আরেকটি হলো তাঁকে পদ থেকে সরানো উচিত কি না। এই দুটিকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি ভোটে আনার চেষ্টা চলছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)

এতে সমস্যা হলো, যদি এই দুই প্রশ্ন একসঙ্গে রাখা হয়, তাহলে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ না থাকলেও কাউকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ ‘অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে কি না’ সেটি আলাদা করে না দেখে, অন্য কোনো অজুহাতেও তাঁকে সরানো সম্ভব হতে পারে। এমনকি এমন বিষয়ও সামনে আনা হতে পারে, যা আগে কখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবেও তোলা হয়নি।

করিম খানকে ঘিরে এই পরিস্থিতি বৃহত্তর একটি আক্রমণের অংশ বলেই মনে হয়। তাই এই আদালতের বিরোধীরা কারা এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, সেটাও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

১৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনামেই পরিষ্কার করে বলা হয়—আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে কেন ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ বক্তব্য ছিল না। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আদালতের ১১ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন করিম খান, দুজন উপ-কৌঁসুলি এবং আটজন বিচারক। তাঁদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড বাতিল করা হয়েছে, এমনকি বিভিন্ন প্রযুক্তি ও আর্থিক পরিষেবার অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নেতানিয়াহু নির্মমভাবে হেরে গেছেন, এখন তাঁকে সরে দাঁড়াতেই হবে

রুবিও এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি আদালত ভেঙে ফেলার এই প্রচেষ্টাকে একটি সভ্যতাগত সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে আদালতকে প্রগতিশীল কর্মী, বিশ্বায়নপন্থী অভিজাত গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সরকারের হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি এমন একটি কূটনৈতিক প্রচারণার কথাও বলেন, যার লক্ষ্য হলো জাতীয় সার্বভৌমত্বের নামে বিশ্বায়নের বিরোধিতাকারী দেশগুলোকে একত্র করা।

অন্যদিকে, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন, তখন তিনি চীন ও রাশিয়াকে এই আদালতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, এই পুরো উদ্যোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।

কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস না করেও বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ এখানে এক জায়গায় এসে মিলেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এবং নেতানিয়াহু উভয়েই চান, যত গুরুতর অভিযোগই থাকুক না কেন, কোনো আন্তর্জাতিক আদালত যেন তাঁদের সেনা, সীমান্তরক্ষী বা মিত্রদের বিরুদ্ধে হাত তুলতে না পারে। তাঁদের কাছে এই পরিস্থিতি একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে আদালতকে দুর্বল করে ফেলা সম্ভব।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি দিয়ে বানানো পোস্টার। পোস্টারে তাঁর সম্পর্কে লেখা আছে—‘সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী, ধর্ষক’। গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ৪ অক্টোবর স্পেনের মাদ্রিদে আয়োজিত বিক্ষোভে

এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যদেশগুলোর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তারা চাইলে এমন একটি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারে, যা আদালতের মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং যা ন্যায়বিচারের মূলনীতি রক্ষা করে। অথবা তারা এমন একটি নজির তৈরি করতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক স্বার্থ বিচারিক সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যায়।

সঠিক পথটি স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকতে হবে। যারা এটিকে ধাপে ধাপে ভেঙে ফেলতে চায়, তাদের সামনে নতি স্বীকার করা চলবে না।

  • জোসেপ বোরেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি এবং স্পেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source