বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ কেন হয়?
· Prothom Alo

প্রশ্নটা শুনে ভাবতেই পারো, আরে এটার উত্তর তো সহজ। বিশ্বকাপে তৃতীয় কে হয় সেটা জানার জন্য। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়, প্রথম বা দ্বিতীয় কে হলো তা তো ফাইনাল ম্যাচ দেখেই জানা যায়, কিন্তু তৃতীয় কে জানার জন্যও তো একটা ম্যাচ লাগে, নাকি? সেটাই নির্ধারণ করা হয় এই ম্যাচ দিয়ে। কিন্তু প্রশ্নটা ঠিক এখানে নয়।
বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেকেই আখ্যা দেয় অপ্রয়োজনীয় একটা ম্যাচ হিসেবে। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন, এই ম্যাচের কোনো প্রয়োজনীয়তাই দেখেন না তিনি। বরং এর থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়াটাই ভালো। কেনই বা মনে হবে না? সেমিফাইনালে চার দল নেমেছিল বিশ্বকাপ শিরোপাটা জয়ের জন্য। হার দিয়ে সেই সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে দুই দল। এই দুঃখ নিয়ে যখন বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা, সেখানে তাদের খেলতে হচ্ছে বাড়তি একটা ম্যাচ। যেটি না খেললেও আসলে খুব একটা বেশি কিছু যায়-আসে না।
Visit amunra.qpon for more information.
বিশ্বকাপ ছাড়া অন্যান্য টুর্নামেন্টগুলোতে তাকিয়ে দেখো, ইউরো–চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে শুরু করে ফুটবলের বড় কোনো টুর্নামেন্টেই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা হয় না। কারণ, সেমিফাইনালে হেরে গিয়ে আরেকটা ম্যাচ খেলার কোনো অর্থ হয় না। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে আজকে রাতে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড। এমন একটা ম্যাচ খেলতে, যাতে আগ্রহ নেই কারও।
বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচগুলো কেন খেলা হয় বিশেষ বল দিয়ে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান পাওয়া পর্তুগাল দল।কিন্তু তবু কেন খেলা হয়? এর কারণ খুঁজতে ফিরে যেতে হবে পেছনে। বিশ্বকাপের সূচনা হয়েছিল অলিম্পিককে মডেল ধরে। অলিম্পিকে যেভাবে আয়োজন করা হতো ফুটবলের আসর, সেভাবেই প্রথম বিশ্বকাপের আসর আয়োজন করা হয়। অলিম্পিকে কিন্তু তৃতীয় স্থানের মূল্য অনেক। কারণ, সেখানে তৃতীয় হলে পাওয়া যায় পদক, চতুর্থ হলে কিছুই না। তাই সেখানে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গুরুত্ব অনেক, দেশের পদক বাড়াতে খেলোয়াড়েরাও জান-প্রাণ দিয়ে খেলেন শেষ ম্যাচটায়।
১৯৩০ সালে যখন বিশ্বকাপ শুরু হয়, তখনই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলার নিয়ম তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপে সেই ম্যাচটা হয়নি। সেমিফাইনালে বাদ পড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া ম্যাচটি খেলতে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। হারার পর দুই দলই ছিল বাড়ি ফেরার তাড়ায়। তাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ না খেলেই বাড়ি ফেরে তারা। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রকেই ধরা হয় প্রথম বিশ্বকাপের তৃতীয় হিসেবে ধরা হয়।
১৯৩৪ বিশ্বকাপ থেকে শুরু হয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের সূচনা। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় জার্মানি। এর পর থেকে ১৯৫০-এর বিশ্বকাপ ছাড়া প্রতিটি বিশ্বকাপেই ছিল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
কারণ, ১৯৫০ বিশ্বকাপে কাগজে–কলমে কোনো ফাইনাল ম্যাচই ছিল না। শীর্ষ চার দলকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল রাউন্ড রবিন লিগ, সেখানে যারা পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকবে, তারাই চ্যাম্পিয়ন। ব্রাজিলকে হারিয়ে শীর্ষ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে, যা ঐতিহাসিক ‘মারাকানাজো’ ট্র্যাজেডি হিসেবে পরিচিত। সেই ম্যাচের আগে স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল সুইডেন। উরুগুয়ে-ব্রাজিল ম্যাচকে যেমন অঘোষিত ফাইনাল ধরা হয়, এই ম্যাচটাকেও ধরা হয় অঘোষিত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
৬ বছর ধরে আমেরিকা যেভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠ তৈরি করেছে১৯৯৮ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান পাওয়া ক্রোয়েশিয়া ।বড় বড় দলের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব একেবারেই নেই। বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো বিশ্বকাপজয়ী দলগুলো আগ্রহী নয় এই ম্যাচ নিয়ে। বিশ্বকাপে যারা আসেই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের কাছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণের এই ম্যাচ অর্থহীন লাগারই কথা। কিন্তু যেসব দল প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে পৌঁছায়, নিজেদের নতুন পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরতে আসে বিশ্বমঞ্চে, তাদের কাছে তৃতীয় হওয়াটা অনেক বড় সম্মানের। ২০১৮ বিশ্বকাপে বেলজিয়াম, ২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্ক, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ক্রোয়েশিয়া থেকে শুরু করে ’৬৬ বিশ্বকাপের পর্তুগাল, ’৬২ বিশ্বকাপের চিলি—প্রত্যেকেই চমক দেখিয়েছিল বিশ্বকাপ মঞ্চে। আর তৃতীয় হয়ে বাড়ি ফেরার গল্পটা রোমাঞ্চের থেকে কম কিছু নয় তাদের কাছে। তাদের ইতিহাস স্মরণীয় হয়ে আছে এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটাই জন্যই।
গত কয়েক বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এই ম্যাচের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা চলছে। অবশ্য ভবিষ্যতে এই ম্যাচ থাকবে কি না, সে সিদ্ধান্ত পুরোপুরিভাবেই ফিফার হাতে।
কীভাবে ঠিক করা হয় ম্যাচের হোম-অ্যাওয়ে জার্সি