ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তারের নতুন লড়াই
· Prothom Alo

এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেনকে মূলত সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার একটি প্রক্সি যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হয়েছে। হুতি আন্দোলনের প্রতি তেহরানের সমর্থন এবং ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সামরিক হস্তক্ষেপ ইয়েমেনকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সংঘাত আরব বিশ্বের রাজনৈতিক বিন্যাসকে নিজেদের অনুকূলে গড়ে তুলতে চাওয়া দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
এই ব্যাখ্যা এখনো প্রাসঙ্গিক, তবে ক্রমেই তা যথেষ্ট নয়। হুতিরা এখনো উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং ইরানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে; কিন্তু দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী শক্তির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরেই নতুন এক প্রতিযোগিতা গড়ে উঠছে, আর ইয়েমেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বৃহত্তর এক রূপান্তরের প্রতিফলন। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এখন আর কেবল আদর্শগত বিভাজন, সাম্প্রদায়িক বয়ান বা ঐতিহ্যগত বৈরিতার ওপর নির্ভর করছে না; বরং তা ক্রমেই নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দ্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৌদি আরব যখন একটি সামরিক জোট গঠন করে, তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সেই জোটের অন্যতম সক্রিয় ও সক্ষম অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়। উভয় দেশেরই একটি অভিন্ন লক্ষ্য ছিল—হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো এবং আরব উপদ্বীপে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো। বহু বছর ধরে এই অংশীদারত্ব অত্যন্ত দৃঢ় বলেই মনে হয়েছে; কিন্তু এর আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মতপার্থক্য ইতিমধ্যে গড়ে উঠছিল।
ইরান যুদ্ধ কীভাবে ‘লিটল স্পার্টা’র উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভেঙে দিলসৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই ইয়েমেনকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশের অস্থিতিশীলতার পরিণতি সৌদি আরবকে বারবার মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই রিয়াদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ছিল তুলনামূলকভাবে সরল—একটি স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেন, যা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম হবে এবং একই সঙ্গে সৌদি আরবের কৌশলগত প্রভাববলয়ের মধ্যেই থাকবে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। আবুধাবির আগ্রহ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা বিস্তৃত ছিল সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক কৌশলগত স্বার্থের দিকে। সানার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একচেটিয়া গুরুত্ব না দিয়ে ইউএই এমন স্থানীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যারা কৌশলগত বন্দর, উপকূলীয় অবকাঠামো এবং উপসাগর, লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকাকে সংযুক্তকারী নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। সৌদি আরব যখন ইয়েমেনের জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান ধরে রাখে, তখন ইউএই ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে এমন সব পক্ষের পেছনে, যাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রায়ই সেই ঐক্যের ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক চিত্র আরও জটিল হয়ে উঠছে। সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব বা আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রচলিত বিশ্লেষণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তা আর পুরো বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। অঞ্চলটি এখন ক্রমে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রূপ নিচ্ছে। প্রতিটি দেশই আঞ্চলিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সৌদি আরব আবারও ইয়েমেনে প্রধান বহিরাগত প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। রিয়াদে আয়োজিত রাজনৈতিক সংলাপ, হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমন্বয়ের প্রচেষ্টা এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ—সবই একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। লক্ষ্য হলো যুদ্ধপরবর্তী ইয়েমেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সৌদি প্রভাবের অধীন গড়ে তোলা।
এটি সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। এখন মূল প্রশ্ন আর শুধু এই নয় যে হুতিদের পরাজিত করা যাবে কি না, কিংবা ইরানের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কি না। ক্রমে প্রশ্নটি হয়ে উঠছে—ইয়েমেনের প্রধান বহিরাগত পৃষ্ঠপোষক এবং রাজনৈতিক স্থপতি হিসেবে কোন উপসাগরীয় শক্তি আত্মপ্রকাশ করবে?
সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী, কেন এখন এটি এতটা তীব্র হলোভূগোলের আলোকে দেখলে এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। বাব আল-মান্দেব প্রণালির তীরে অবস্থান করা দেশটি লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই নৌপথের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগরে হুতিদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যাহত হয়েছে। বহু কোম্পানিকে জাহাজ আফ্রিকার চারপাশ ঘুরিয়ে চালাতে হয়েছে, ফলে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। অর্থাৎ ইয়েমেনে কী ঘটছে, তা আর শুধু আরব উপদ্বীপের বিষয় নয়; এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার তার বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশলেরই অংশ। উপসাগর, লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকাজুড়ে বন্দর এবং লজিস্টিকস কেন্দ্রের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সামুদ্রিক সংযোগ শক্তিশালী করার যে পরিকল্পনা আবুধাবি বাস্তবায়ন করছে, দক্ষিণ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সৌদি আরবের স্বার্থও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটির ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির সফলতা নিরাপদ সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার লক্ষ্যে রিয়াদ যখন এগোচ্ছে, তখন লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব ঘিরে পরিস্থিতি তাদের জন্য শুধু নিরাপত্তার নয়, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতারও বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে ইয়েমেনে চলমান প্রতিযোগিতা কেবল সানা বা এডেনে প্রভাব বিস্তারের লড়াই নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই। এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমে স্বতন্ত্র কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো বহিরাগত শক্তিগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আঞ্চলিক সরকারগুলো আর বড় শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে নেই; বরং তারা বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপত্তা অংশীদারত্বের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।
এই প্রবণতা শুধু ইয়েমেনেই নয়; সুদান, লিবিয়া ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। উপসাগরীয় রাজধানীগুলো বন্দর, বাণিজ্য করিডর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক অংশীদারত্বের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যাতে তাদের আঞ্চলিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সামুদ্রিক কৌশল এখন ক্রমে প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক চিত্র আরও জটিল হয়ে উঠছে। সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্ব বা আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রচলিত বিশ্লেষণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তা আর পুরো বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। অঞ্চলটি এখন ক্রমে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রূপ নিচ্ছে। প্রতিটি দেশই আঞ্চলিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
এ কারণেই প্রক্সি যুদ্ধ থেকে উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেন হয়তো সেই পর্যায় অতিক্রম করছে, যেখানে সৌদি আরব ও ইরান কৌশলগত বয়ানের প্রধান কেন্দ্র ছিল; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশটি পূর্ণ সার্বভৌমত্বের দিকে এগোচ্ছে; বরং এটি এমন এক নতুন প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন উপসাগরীয় শক্তি আঞ্চলিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সংযোগ সম্পর্কে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
উপসাগরীয় শক্তিগুলো যখন তাদের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্প্রসারণ করছে, তখন ইয়েমেন সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়ে গেছে, যার প্রভাব তার নিজস্ব সীমানার বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান লড়াই এখন আর শুধু একটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রশ্ন নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলের পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কে গড়ে তুলবে, সেই প্রশ্নও।
একো এরনাদা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক, ইউনিভার্সিতাস জেম্বার, ইন্দোনেশিয়া
মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং সংক্ষেপিত।