লেখালেখি ছেড়ে সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর, ফিরলেন কীভাবে

· Prothom Alo

সাহিত্যিক হিসেবে সুখ্যাতি তখন চারদিকে। সাহিত্যের লোকেরা একনামে চেনেন। কিন্তু উত্থানের সময় হঠাৎ-ই লেখা ছেড়ে দিলেন। দুই দিন বা মাস নয়, একটানা তিন বছর কিছুই লিখলেন না। এ প্রসঙ্গে আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘লিখতে ইচ্ছে হয় না। লিখি না। লেখা ছেড়েই দিলাম। বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করলাম। বসে বসে ভাবি। আর কাঁদি। একলা কাঁদি। পূজার সময় কাঁদি। রবীন্দ্রনাথের গান শুনে কাঁদি।’ পরিবার ছিল শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত। বাড়ির লোকেরা বিশ্বাস করতেন, মা তারার দয়ায় জন্ম হয়েছে তাঁর। নামও রাখা হয়েছিল মা তারার সঙ্গে মিলিয়ে। হ্যাঁ, তিন বছর একটানা কিছু না লেখা মানুষটা আর কেউ নন, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই পশ্চিম বাংলার বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় মা প্রভাবতী দেবী এবং বিধবা পিসিমা শৈলজা ঠাকুরাণীর স্নেহ-শাসনে বড় হন। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তৎকালীন জমিদার সমাজের প্রতিনিধি। আর মা ছিলেন শিক্ষার প্রসারে আগ্রহী এবং ধর্মশাস্ত্রের অনুরাগী। একদিকে প্রাচীনের প্রতি অনুরাগ, অন্যদিকে নতুনত্বের প্রতি আকর্ষণ—এই দ্বান্দ্বিক মানসিকতা তাঁর মানসগঠনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। মায়ের ধর্মনিষ্ঠা এবং শৈশবের স্বদেশপ্রেমের উদ্দীপনা তাঁর জীবনে রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক ভিত্তি স্থাপন করে দেয়। পড়ালেখায় খুব যে মনোযোগী ছিলেন, সে কথা বলা যায় না। প্রথমবার ম্যাট্রিক দিয়ে পাস করতে পারেননি। ১৯১৬ সালে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন এবং প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ও পরে সাউথ সাবআর্বান কলেজে (আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন। কিন্তু ভগ্ন স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি।

Visit freshyourfeel.org for more information.

যে গান লিখে ৫০০ টাকা উপহার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ

তিন বছর যে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারপর লেখায় ফিরলেন কীভাবে?
তারাশঙ্কর আজীবন আধ্যাত্মিকতায় মগ্ন ছিলেন। কিন্তু হলে কী হবে, জীবনে কমবেশি সবারই একটা সময় আসে যখন কিছুতেই কিছু হয়ে ওঠে না, মন লাগে না। তারাশঙ্করের জীবনে এই তিন বছর ছিল ঘোর লাগা অমানিশার মতো। মন অশান্ত, কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেন না। নিদারুণ অতৃপ্তি বুকের ভেতর। কিন্তু কিসের অতৃপ্তি ঠাহর করতে পারছেন না। এরই মধ্যে রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমির মতো পুরস্কার পেলেন, কিন্তু পুরস্কার পাবার আনন্দ কই? কিছুই যেন স্পর্শ করছে না। বুকের ভেতরটা ডানাকাটা পাখির মতো ছটফট করছে।

অন্যদিকে বয়ে যাচ্ছে সময়; প্রকাশক, সম্পাদক, লেখক বন্ধুরা ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। অনেক অনুরোধ করেও তারাশঙ্করকে দিয়ে লেখানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে একদিন কলকাতার রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আগুন ছুঁয়ে সারা দিন সাধনা করেন সন্ন্যাসী। তারাশঙ্করের মনে ধরল সন্ন্যাসীকে। সংসার ছেড়ে তাঁর শিষ্যত্ব নেবেন ঠিক করে যেদিন দেখা করতে গেলেন, শুনলেন, সন্ন্যাসী চলে গেছেন। তারাশঙ্করও ছাড়বার পাত্র নন। সন্ন্যাসীর সন্ধানে কাশী অভিমুখে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে তখনকার বিশিষ্ট বাঙালি আনন্দসুন্দর ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হলো। নানা আলাপচারিতা শেষে তারাশঙ্কর বললেন, ‘একটা কিছু ধরতে চেয়ে যেন ধরতে পারছি না। তার জন্য আমার মনে অশান্তির শেষ নেই।’ জবাবে আনন্দসুন্দর বললেন, ‘আপনার সাধনার পথ হলো সাহিত্য। তাকেই জীবনের সাধনা করুন, শান্তি পাবেন।’

তারাশঙ্কর কলকাতায় ফিরলেন। নিজের মায়ের কাছ থেকে দীক্ষা নিলেন। কিন্তু মন বসছে না, শান্তি মিলছে না কিছুতেই, কী যেন হারিয়ে গেছে জীবন থেকে, ফিরে আসবে না আর কিছুতেই। এই যখন পরিস্থিতি, আয়োজকদের অনেক জোরাজুরির পর বর্ধমানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ক্ষীণ স্বরে যাবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। কিন্তু যাওয়ার জন্য বের হয়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাতেই মন বেঁকে বসল। ‘না যাব না’ স্থির করে বাড়ি ফেরার উদ্দেশে সামনে এগোতেই দেখা হলো বন্ধুপ্রতিম জগদীশ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। শুরুতেই ভট্টাচার্য ধমক দিলেন। বললেন, ‘এসব কী করছেন দাদা! আপনার এমন আচরণে গোটা বাংলার মানুষ ছি ছি করছে! আপনার নিন্দুকদের কথাই তাহলে সত্যি হলো?’ ‘কী সত্যি হলো?’ ‘তাঁরা বলে আপনি শেষ। আর কখনো লিখতে পারবেন না।’ এত দিন আড়ালে-আবডালে চাপা অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনার কথাটা সরাসরি বন্ধুপ্রতিমের কণ্ঠে শুনে হৃদয় যেন রক্তে লাল হয়ে গেল তাঁর। দুর্গাপূজা ছিল সামনে। একপ্রকার স্থির করে নিয়েছিলেন পূজা সংখ্যায় কিছু লিখবেন না, প্রকাশক-সম্পাদকদের না–ও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভট্টাচার্যের মুখে কথাটা শুনে নিন্দুকদের জবাব দিতে মত বদলালেন। একে একে পূজা সংখ্যায়, দেশ পত্রিকায় ‘রাধা’, আনন্দবাজারে ‘বিচারক’, শনিবারের চিঠিতে একটি একাঙ্কিকা আর তরুণের স্বপ্ন’য় ‘পঞ্চপুত্তলী’ শিরোনামে গল্প লিখলেন। পাঠকের হাতে যেতেই চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। ‘তারাশঙ্কর ফিরেছেন, ফিরেছেন’ বলে খবর চাউর হলো সাহিত্য অঙ্গনে। একই সঙ্গে হারানো শান্তিও যেন ফিরে পেলেন তারাশঙ্কর।

Read full story at source