বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ কোনটি

· Prothom Alo

২০২১ সালের কথা। মিশিগানের ডেট্রয়েট নদী থেকে ১০৯ কেজি ওজনের বিশাল এক মাছ তুলতে তিনজন জীববিজ্ঞানীর রীতিমতো ঘাম ছুটে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের আলপেনা ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সংস্থার গবেষকেরা প্রায় ৭ ফুট লম্বা এ দানব মাছকে নদী থেকে ধরে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পর আবার নদীতে ছেড়ে দেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ মাছের বয়স ১০০ বছরের বেশি হতে পারে। কিন্তু এটিই কি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ?

Visit casino-promo.biz for more information.

ডেট্রয়েট নদী থেকে ধরা পড়া মাছটি আসলে ‘লেক স্টারজন’ প্রজাতির। যুক্তরাষ্ট্রে ধরা পড়া অন্যতম বড় মাছের তালিকায় এটি অনায়াস জায়গা করে নিলেও, বিশ্বের অন্যান্য নদীতে এর চেয়ে বহুগুণ বড় বড় মাছ আছে। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে মিঠাপানির সবচেয়ে বড় মাছ ‘বেলুগা স্টারজন’। এ মাছের মূল বাসস্থান ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝামাঝি অঞ্চলের কৃষ্ণ সাগর, আজভ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগর এবং এগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকা বিভিন্ন নদী।

ওয়ার্ল্ড স্টারজন কনজারভেশন সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ বেলুগা স্টারজন লম্বায় ২৬ ফুটের বেশি হতে পারে। সাধারণ একটি বড় তোষকের দৈর্ঘ্যের চেয়ে এটি প্রায় চার গুণ বড়। আর এদের ওজন হতে পারে সর্বোচ্চ দুই মেট্রিক টন বা দুই হাজার কেজি পর্যন্ত। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তথ্য অনুসারে, বিশাল আকারের কারণে বেলুগা স্টারজন জলজ খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে শীর্ষে অবস্থান করে। এরা কার্প জাতীয় সাধারণ মাছ, জলজ পাখি, এমনকি ছোটখাটো সিল মাছও শিকার করে গিলে ফেলে।

চ্যাং আর টাকি কি একই মাছ

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তের অদূরে অবস্থিত ডেট্রয়েট নদীর লেক স্টারজনের মতোই বেলুগা স্টারজনও ১০০ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে। আর এ দীর্ঘ জীবনই এদের এত বিশাল আকারে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। স্টারজন মাছের ইতিহাস ২৫ কোটি বছরের বেশি। অর্থাৎ একসময় ডাইনোসরদের সঙ্গেও এরা পৃথিবীতে বাস করত। বর্তমানে পৃথিবীতে স্টারজন ও প্যাডেলফিশের মোট ২৭টি প্রজাতি বেঁচে আছে, যার মধ্যে বেলুগা স্টারজনই আকারে সবচেয়ে বড়।

কিন্তু এই বেলুগা স্টারজন মাছ ঠিক কী কারণে এত বিশালাকার হয়ে ওঠে? দীর্ঘ আয়ুর পাশাপাশি এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ বলা কঠিন হলেও বিজ্ঞানীদের কিছু ধারণা রয়েছে। ইতালির পাডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক লিওনার্দো কঙ্গিওর মতে, বড় আকারের স্ত্রী স্টারজন মাছ ছোটদের তুলনায় অনেক বেশি ডিম পাড়তে পারে, যা বংশবৃদ্ধির জন্য দারুণ সুবিধাজনক। তা ছাড়া বড় আকৃতির কারণে নদী বা সাগরে অন্য কোনো শিকারি প্রাণী এদের সহজে আক্রমণ করতে পারে না। আবার নিজেদের শিকার ধরতেও বাড়তি সুবিধা মেলে।

তবে দুঃখের বিষয় হলো, আজকের দিনে আর ২৩ ফুট লম্বা বেলুগা স্টারজনের দেখা মেলা না। ইতালির নদীগুলো থেকে অতিরিক্ত মাছ ধরা ও একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে এসব মাছ সেখান থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই বেলুগা স্টারজনকে আবার ইতালির নদীগুলোয় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অধ্যাপক কঙ্গিও আর তাঁর সহকর্মীরা ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ‘ডাইভারসিটি অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনস’ জার্নালে এ মাছের বিস্তার ও জিনগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় বেলুগা স্টারজনকে বিলুপ্তির সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী বেলুগা মাছের ডিম মানুষের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। এ ডিম দিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত খাবার ‘ক্যাভিয়ার’, যার প্রতি কেজির মূল্য আট হাজার ডলারের বেশি। আর এ ডিমের বাজারের কারণেই আজ অস্তিত্বসংকটে পড়েছে ডাইনোসর আমলের প্রাচীন মাছটি।

লোনাপানির মাছ কি মিঠাপানিতে বাঁচতে পারে

যদিও বর্তমানে কৃত্রিম উপায়ে খামারে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করা ক্যাভিয়ার বাজারে পাওয়া যায়। তবু বন্য বেলুগা স্টারজন এখনো নিরাপদ নয়। বন্য বেলুগা স্টারজনকে যদি এখন থেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষাও দেওয়া হয়, তাহলেও একটি ছোট মাছের পূর্ণবয়স্ক হয়ে সেই দানবীয় আকারে পৌঁছাতে কয়েক দশক সময় লেগে যাবে।

তাই বর্তমান সময়ে যদি কেউ কোনো বিশাল আকৃতির স্টারজন দেখতে চান, তবে সে খেতাব এখন মূলত হোয়াইট স্টারজন মাছের দখলে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় স্টারজন প্রজাতি। বেলুগা স্টারজনের চেয়ে এখন মানুষের পক্ষে একটি বিশাল আকারের হোয়াইট স্টারজন দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ, এই প্রজাতি আইনিভাবে অনেক ভালো সুরক্ষায় রয়েছে।

বেলুগা ও হোয়াইট স্টারজনকে সাধারণত মিঠাপানির মাছ বলা হলেও, এরা কিন্তু সারা জীবন নদীতে কাটায় না। এরা নদীতে জন্ম নেয় এবং ডিম পাড়ার জন্য বারবার নদীতেই ফিরে আসে। তবে জীবনের একটা বড় অংশ এরা কাটায় সমুদ্রের লোনাপানিতে; যেমনটা করে ইলিশ মাছ।

তাহলে সমুদ্রের লোনাপানির ধারেকাছেও যায় না, এমন পুরোপুরি মিঠাপানিতে বসবাসকারী বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাছ কোনটি? এ রেকর্ডের আসল অধিকারী হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং নদীর ‘মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ’। আমাদের চেনা পাঙাশ মাছের জাতভাই এই দানবীয় ক্যাটফিশ লম্বায় প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। অতীতে ২৯৩ কেজি ওজনের মেকং ক্যাটফিশ ধরার রেকর্ড রয়েছে। তবে বেলুগা স্টারজনের মতোই মানুষের তৈরি বাঁধ ও অতিরিক্ত মাছ ধরার নিষ্ঠুর শিকার হয়েছে এই প্রজাতিও। ফলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এদেরও এখন মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রেখেছে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্সমেনি মাছ কি সত্যিই কাদা খায়

Read full story at source