উপকূলে এই দুর্নীতি কোনোভাবেই মানা যায় না
· Prothom Alo

জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এখন এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় উপকূলের লাখ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসা এখন বৃষ্টির পানি। এই বাস্তবতায় সরকার ১০টি উপকূলীয় জেলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম’ নামক একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বরগুনায় এ প্রকল্পে যে নজিরবিহীন লুটপাট ও জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে, তা কেবল নিন্দনীয়ই নয়; বরং এক চরম অমানবিক অপরাধ।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বরগুনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাগজে–কলমে কাজ শতভাগ ‘সম্পন্ন’ দেখিয়ে একটি প্যাকেজের পুরো বিল এবং বাকি দুটি প্যাকেজের ৭৮ থেকে ৯৬ শতাংশ বিল ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সরেজমিনে দেখা গেছে, শত শত পরিবারে কেবল ইটের একটি প্ল্যাটফর্ম বা বেদি তৈরি করে ফেলে রাখা হয়েছে; সেখানে পানি সংরক্ষণের মূল উপাদান পানির ট্যাংক, পাইপলাইন কিংবা ফিল্টারের কোনো অস্তিত্বই নেই।
Visit sport-tr.bet for more information.
নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে অনেক প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধনের আগেই ভেঙে পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, উপকারভোগীর প্রত্যয়নপত্র এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া বিল ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। তাহলে কার স্বার্থে, কার ইশারায় এই জালিয়াতিকে বৈধতা দেওয়া হলো?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অনিয়মের বিরুদ্ধে গত বছরের অক্টোবরে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মহলে কিছুটা নড়াচড়া দেখা গেলেও, কাজের মান যাচাই বা কোনো তদন্ত ছাড়াই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গোপনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তথ্য অধিকার আইনের আশ্রয় নিয়ে নথিপত্র সংগ্রহের পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই ‘লুকোচুরি’ ও দুর্নীতির মহোৎসব জনসমক্ষে আসে। সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ‘মনে নেই’ বলে দায় এড়াতে চাইছেন, আর বর্তমান প্রকৌশলী ‘কাগজপত্র যাচাই’ করার চেনা বুলি আওড়াচ্ছেন। প্রকল্প পরিচালকের ‘সরেজমিন পরিদর্শনের’ আশ্বাসও আমলাতান্ত্রিক টালবাহানার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে।
আমরা মনে করি, এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা এই জালিয়াতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মন্ত্রণালয়ের উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করা এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকারকে পুঁজি করে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী আর আমলাদের এই পকেট ভারী করার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার।