ব্রাজিল–জাপানের এই ‘উল্টো অভিবাসনের’ গল্প আপনাকে চমকে দেবে
· Prothom Alo

আজ সোমবার রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও এশিয়ার দেশ জাপান। লড়াইটা হবে ফুটবলের। কিন্তু মাঠের টান টান উত্তেজনার বাইরে জাপান–ব্রাজিলের শত বছরের বেশি সময়ের এক ‘উল্টো অভিবাসনের’ গল্প আপনাকে চমকে দেবে।
জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি বংশোদ্ভূত (নিক্কেই) মানুষ বাস করে কোন দেশে, জানেন? মাথায় নিশ্চয়ই চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম ঘুরছে?
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
কিন্তু সঠিক উত্তর হলো—ব্রাজিল। দেশটিতে ২০ লাখের বেশি জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন।
অন্যদিকে জাপানে এখন বসবাস করছেন দুই লাখের বেশি ব্রাজিলিয়ান। তাঁদের বেশির ভাগই আবার সেই জাপানি অভিবাসীদের বংশধর, যাঁরা একসময় কাজের খোঁজে ব্রাজিলে গিয়ে থিতু হয়েছিলেন।
আজ সোমবার রাতে বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল ও এশিয়ার দেশ জাপান। লড়াইটা হবে ফুটবলের। কিন্তু মাঠের টান টান উত্তেজনার বাইরে শত বছরের বেশি সময়ের এক ‘উল্টো অভিবাসনের’ গল্প আপনাকে চমকে দেবে।
অনুশীলনে ব্রাজিল দল। ২৮ জুন ২০২৬গল্পটা জানার আগে দুই দেশের সামগ্রিক চিত্রটা একবার সংখ্যায় সংখ্যায় দেখা যাক। জাপানের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১২ কোটি ২৪ লাখ। ব্রাজিলের ২১ কোটি ৩৬ লাখ। অর্থাৎ ব্রাজিলের জনসংখ্যা জাপানের প্রায় দ্বিগুণ।
দুই দেশের আয়তনের ফারাকটাও বিশাল। জাপানের আয়তন প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। ব্রাজিলের আয়তন প্রায় ৮৫ লাখ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ জাপানের প্রায় ২৩ গুণ।
দুই দেশের জনঘনত্বের চিত্রটাও বিপরীত। জাপানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ৩৩৬ জন মানুষ বাস করেন। ব্রাজিলে এই সংখ্যা মাত্র ২৬ জন।
বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার ব্রাজিলে যে ২০ লাখের বেশি মানুষের ধমনিতে জাপানি রক্ত বইছে, এটাই এই গল্পের আসল চমক।
অনুশীলনে জাপান দল। ২৮ জুন ২০২৬নয়া অভিবাসন স্রোত
এই গল্পের শুরু ১৯০৮ সালে। জনসংখ্যার চাপ আর তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে জাপান তখন ধুঁকছে। অন্যদিকে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর কফিবাগানে শ্রমিকের তীব্র অভাব। এই দুয়ে মিলে শুরু হয় এক নয়া অভিবাসন স্রোত, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে চলেছিল।
১৯০৮ সালের ১৮ জুন ‘কাসাতো-মারু’ নামের একটি জাহাজ প্রথম ৭৯১ জন জাপানি শ্রমিক নিয়ে নোঙর ফেলেছিল ব্রাজিলের সান্তোস বন্দরে।
জাপান সরকার ১৯২০-এর দশক থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে অভিবাসন উৎসাহিত করে। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে তারা জনসংখ্যার চাপ কমাতে এটা করেছিল। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ ও ১৯৬০–এর দশকে তা করা হয়েছিল অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে।
তবে ১৯৭০–এর দশকের শুরুতে জাপান থেকে ব্রাজিলে অভিবাসন কার্যত থেমে যায়। তখন ব্রাজিলে বসবাসরত জাপানি নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লাখ।
জাপানের টোকিওর একটি দৃশ্যনব্বইয়ের দশকে উল্টো চিত্র
শতাব্দীর শুরুর দিকে যে পথে জাপানিরা ব্রাজিলে গিয়েছিল, নব্বইয়ের দশকে ঠিক উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেন তাঁদের বংশধরেরা। কারণটাও স্পষ্ট। ব্রাজিল তখন চরম অর্থনৈতিক সংকট আর মুদ্রাস্ফীতির কবলে। অন্যদিকে জাপান তখন শিল্পোন্নত অর্থনীতির দেশ। আর দেশটির উৎপাদন খাতে তখন শ্রমিকের চাহিদা ছিল।
১৯৯০ সালে জাপান অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে। এতে জাপানি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মসহ তাঁদের উত্তরসূরিদের জন্য জাপানে দীর্ঘমেয়াদি কাজের সুযোগ সহজ হয়। এর লক্ষ্য ছিল, এমন শ্রমিক আনা, যাঁদের জাপানি বংশসূত্র রয়েছে।
ফলাফল—উল্টো অভিবাসন স্রোত। ১৯৮৯ সালে জাপানে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত শ্রমিক ছিল ১৫ হাজারের কম। ২০০৬ সালে এই সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
জাপানে ঐতিহাসিকভাবে মৌসুমি শ্রমিকদের ‘দেকাসেগি’ (নিজ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে কাজ করা) নামে ডাকা হয়। পরে ব্রাজিল–জাপান অভিবাসনের ক্ষেত্রে শব্দটি নতুন অর্থে জনপ্রিয় হয়। আগে এই শব্দে ব্রাজিলগামী অভিবাসী জাপানি পূর্বপুরুষদের ডাকা হতো। আর পরে ব্রাজিল থেকে জাপানে আসা প্রজন্মের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে একই পরিচয়।
এই উল্টো যাত্রার পেছনের অর্থনৈতিক হিসাবটাও ছিল সহজ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জাপানে আয় ব্রাজিলের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি ছিল। যদিও ২০০৬-০৭ নাগাদ এই ব্যবধান কমে আসে প্রায় দুই গুণ।
ব্রাজিলের রাজধানীর একটি দৃশ্যরক্তে জাপানি, মনে ব্রাজিলিয়ান
এই গল্পের সবচেয়ে জটিল সমাজ–মনস্তাত্ত্বিক দিকটি পরিচয়ের টানাপোড়েনের। ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া জাপানিদের বংশধরেরা সংস্কৃতি-ভাষায় সম্পূর্ণ ব্রাজিলিয়ান। কিন্তু চেহারার কারণে তাঁদের চিহ্নিত করা হয় ‘জাপানি’ বলে।
অন্যদিকে জাপানে গিয়ে এই একই মানুষ রক্তসূত্রে জাপানি হলেও ভাষার ভিন্নতা আর সংস্কৃতিতে অপরিচিত হওয়ায় তাঁরা থেকে যান বিচ্ছিন্ন। স্থানীয়দের চোখে তাঁরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির বাসিন্দা’।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ভাষাগত দূরত্ব বেড়েছে আশ্চর্যজনকভাবে। প্রথম প্রজন্মের (ইসেই) প্রায় ৮৯ শতাংশ জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। দ্বিতীয় প্রজন্মে (নিসেই) এই হার নেমে আসে ৬২ শতাংশে। তৃতীয় প্রজন্মে (সানসেই) মাত্র ৩৫ শতাংশ। চতুর্থ প্রজন্মে (ইয়োনসেই) জাপানি ভাষা জানেন মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। আর এই প্রজন্মের লেখার দক্ষতাও প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
ব্রাজিল ও জাপানের পতাকার কোলাজব্রাজিল–জাপানের এই সম্পর্ককে একাডেমিক ভাষায় বলা হয় ‘সার্কুলার মাইগ্রেশন’ (বৃত্তাকার অভিবাসন)। ১৯০৮ সালে সান্তোসের কফিবাগান থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৯৯০ সালে জাপানের কারখানায় ফিরে গিয়ে সেই বৃত্ত পূর্ণ হয়।
জাপান-ব্রাজিল সম্পর্কের ১১৮ বছরের এই ইতিহাস প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক প্রয়োজনে মানুষ দেশান্তরি হলেও শিকড়ের টান সহজে মুছে যায় না। বরং তা প্রজন্মান্তরে নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে।
আজ রাতে যখন ব্রাজিল ও জাপান বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঠে মুখোমুখি হবে, তখন এই গল্পটাও ভুলে গেলে চলবে না।
তথ্যসূত্র:
ম্যাকেঞ্জি, ডি. ও সালসেডো, এ. (২০১৪), জাপানিজ-ব্রাজিলিয়ানস অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ব্রাজিলিয়ান মাইগ্রেশন টু জাপান, ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন।
শোজি, আর. ও মাতসুওকা, আর. (২০১৮), ‘দ্য জাপানিজ ব্রাজিলিয়ান কমিউনিটি’, রেভিস্তা: হার্ভার্ড রিভিউ অব লাতিন আমেরিকা।
‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব ব্রাজিল–জাপান’, এক্সপো ২০২৫ ওসাকা।
ওয়ার্ল্ডোমিটার, জাপান ও ব্রাজিলের জনসংখ্যা তথ্য (২০২৬)।
স্ট্যাটিস্টা, নাম্বার অব জাপানিজ রেসিডেন্টস ইন ব্রাজিল।