অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে ইসলামের ৫ পদক্ষেপ
· Prothom Alo

ইসলাম মানবজাতির অর্থনৈতিক জীবনকে স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার জন্য কিছু মৌলিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এসব নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং সমাজে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে।
ইসলামি অর্থব্যবস্থার সেই মৌলিক নীতিসমূহের মধ্য থেকে এখানে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
Visit umafrika.club for more information.
১. সুদ নিষিদ্ধ করা
সুদ অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এটি সম্পদকে ধনীদের হাতে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত করে এবং দরিদ্রদের ঋণের বোঝায় জর্জরিত করে তোলে। ফলে সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান ক্রমেই বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।
তাই আল্লাহ–তাআলা সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
অর্থনৈতিক উন্নয়নে নবীজির কার্যকর ১০ পদক্ষেপ২. ঘুষ লেনদেন বন্ধ করা
ঘুষ সমাজ ও অর্থনীতির জন্য এক মারাত্মক ব্যাধি। এটি যোগ্যতার পরিবর্তে অন্যায় সুবিধাকে প্রতিষ্ঠিত করে, দুর্নীতির প্রসার ঘটায় এবং সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ব্যাহত করে। ফলে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
তাই ইসলাম ঘুষের দরজা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৬)
৩. জুয়া শয়তানি কাজ
জুয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম আরেকটি কারণ। জুয়ার মাধ্যমে সম্পদ অর্জিত হয় ভাগ্যনির্ভর উপায়ে; কোনো পরিশ্রম, উৎপাদন বা বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে নয়। এতে একজন মুহূর্তের মধ্যে বিপুল অর্থ লাভ করে, আর অন্যজন তার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।
জুয়া সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষকে দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং ঋণ, দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটে পতিত হয়। অন্যদিকে জুয়ার আয়োজক এক দিনেই বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যায়।
এভাবে সম্পদ কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমেই বৃদ্ধি পায়।
এ কারণেই ইসলাম জুয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে এবং একে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও জুয়ার তিরসমূহ ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা মায়েদাহ, আয়াত: ৯০)
সাংস্কৃতিক সংলাপের ইসলামি ইতিহাস৪. মজুতদারি রোধ করা
ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্য মজুত করে রাখলে বাজারে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে, আর মজুতদারেরা অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে।
হাদিস শরিফে এসব কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে (কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে), আল্লাহ–তাআলা তাকে কুষ্ঠরোগ এবং দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)
৫. অপব্যয় না করা
অপব্যয়ের কারণে সম্পদ অপ্রয়োজনীয় খাতে নষ্ট হয় এবং সমাজের দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণে তা ব্যবহৃত হয় না। ফলে সম্পদের সুষম ব্যবহার ও বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয়ে বৈষম্য বাড়ে।
এ জন্য কোরআন মাজিদে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ওড়ায়, তারা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
এসব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে, ধনী-গরিবের ব্যবধান হ্রাস পাবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে উঠবে।
মুফতি ইউসুফ এমদাদী : শিক্ষক, মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী, ঢাকা