বিদেশি গাছ বাদ দিলে কার লাভ, কার ক্ষতি?

· Prothom Alo

বাংলাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচিকে ঘিরে যে বিতর্কটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো—দেশীয় প্রজাতির বাইরে অন্য কোনো বৃক্ষ প্রজাতি কি লাগানো উচিত?

Visit umafrika.club for more information.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, মেহগনি, রেইনট্রি, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাসসহ প্রায় সব বিদেশি প্রজাতির গাছ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হোক।

তাঁদের যুক্তি, এসব গাছ জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর, মাটির উর্বরতা কমায় এবং দেশীয় বন ধ্বংসের কারণ।

কিন্তু আধুনিক বনবিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা, উন্নয়ন অর্থনীতি এবং সামাজিক বনায়নের গবেষণা বলছে, বিষয়টি ‘দেশীয় বনাম বিদেশি’—এত সরল নয়। বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো: কোন গাছ কোথায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে লাগানো হচ্ছে?

বাংলাদেশের উন্নয়নের অদৃশ্য সমস্যা

আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি জনস্বার্থের প্রশ্ন

বাংলাদেশে গত অর্ধশতকে যে সামাজিক বনায়ন ও কৃষি বনায়ন আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে কিছু বিদেশি কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে সফল বৃক্ষ প্রজাতির ওপর।

মেহগনি, রেইনট্রি, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, ম্যানজিয়াম, সেগুন, গ্লিরিসিডিয়া, রাবার—এসব গাছ দেশের লাখো পরিবারকে কাঠ, জ্বালানি, পশুখাদ্য, ছায়া এবং নগদ অর্থ দিয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল মানুষ এসব গাছ থেকে সরাসরি আর্থিক লাভ পেয়েছে।

একজন কৃষক যখন রাস্তার ধারে বা জমির আলে গাছ লাগান, তখন তিনি প্রথমে জীববৈচিত্র্যের কথা ভাবেন না; তিনি ভাবেন, কত বছরে গাছ বিক্রি করা যাবে; বাজারমূল্য কত; কাঠের চাহিদা কেমন; সন্তানদের ভবিষ্যতে এর আর্থিক মূল্য কী হবে।

এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো বননীতি দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।

বিদেশি গাছের সমালোচকেরা কোন ক্ষেত্রে সঠিক?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে কিছু বিদেশি প্রজাতি নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন বিশাল এলাকায় একটিমাত্র বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানো হয়, তখন কয়েকটি সমস্যা দেখা দিতে পারে—

স্থানীয় উদ্ভিদবৈচিত্র্য কমে যাওয়া; পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া;

মাটির জৈববৈচিত্র্যে পরিবর্তন; রোগবালাই বিস্তারের ঝুঁকি; কিছু ক্ষেত্রে আগ্রাসী আচরণ।

বাংলাদেশে বিদেশি প্ল্যান্টেশন নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো ‘সবুজ মরুকরণ’ ধারণার কথা বলেছে। অর্থাৎ বাইরে থেকে বন সবুজ দেখালেও ভেতরে জীববৈচিত্র্য খুব কম থাকতে পারে। তাই সমালোচকদের উদ্বেগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়।

কিন্তু সমালোচকদের বড় ভুল কোথায়?

সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ‘বিদেশি’ এবং ‘ক্ষতিকর’—এই দুটি শব্দকে সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান কিন্তু এভাবে বিষয়টি দেখে না। যেমন—

সব বিদেশি প্রজাতি আগ্রাসী নয়। সব বিদেশি প্রজাতি পরিবেশ ধ্বংস করে না। সব বিদেশি প্রজাতি জীববৈচিত্র্যের জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণও নয়।

বাংলাদেশে গত ৫০ থেকে ১০০ বছরে চাষ হওয়া অনেক বিদেশি প্রজাতি স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষিব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।

বনবিজ্ঞানীরা বর্তমানে প্রজাতির উৎসের চেয়ে তার পরিবেশগত আচরণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ ‘বিদেশি বৃক্ষ’ মানেই বৈজ্ঞানিক বিবেচনায় খারাপ কোনো কিছু নয়।

যদি মেহগনি, রেইনট্রি, আকাশমণি, ম্যানজিয়াম ইত্যাদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে? এখানেই প্রশ্নটি জনস্বার্থের পর্যায়ে চলে আসে। ধরা যাক, সরকার সিদ্ধান্ত নিল—এখন থেকে এসব গাছ আর লাগানো যাবে না। এর ফলাফল কী হতে পারে?

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ: বনবাসীদের বাদ দিয়ে বনায়ন সম্ভব?

১. কৃষকের আগ্রহ কমে যেতে পারে

বাংলাদেশের বহু দেশীয় বৃক্ষ প্রজাতি পরিবেশগতভাবে মূল্যবান হলেও অর্থনৈতিকভাবে ধীরগতিসম্পন্ন।

অনেক দেশীয় প্রজাতি ৩০ থেকে ৬০ বছরেও সেই পরিমাণ কাঠ উৎপাদন করতে পারে না, যা কিছু দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতি ১৫ থেকে ২০ বছরে করতে পারে। ফলে কৃষক গাছ লাগানোর আগ্রহ হারাতে পারেন।

২. কাঠের ঘাটতি বাড়তে পারে

বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই কাঠের চাহিদার তুলনায় উৎপাদনে পিছিয়ে আছে। যদি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক প্রজাতি কমে যায়, তাহলে কাঠ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এর অর্থ হলো বৈদেশিক মুদ্রার অতিরিক্ত চাপ।

৩. দরিদ্র পরিবারের সঞ্চয়ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় অনেক পরিবার গাছকে ‘জীবন্ত ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করে। বিপদে, অসুস্থতায়, সন্তানের শিক্ষায় কিংবা বাড়ি নির্মাণে গাছ বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করা হয়। বিদেশি জনপ্রিয় প্রজাতিগুলো বাদ দিলে এই বিকল্প সঞ্চয়ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে।

দেশীয় প্রজাতির পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি

তবে এটিও সত্য যে বাংলাদেশের বহু দেশীয় প্রজাতি অবহেলিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশীয় ফলদ, ঔষধি এবং কাঠজাত প্রজাতির অনেকগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথেষ্ট, কিন্তু নীতিগতভাবে তারা প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন দেশীয় আমজাতীয়, ফলদ এবং বনজ প্রজাতির কৃষি বনায়ন সম্ভাবনা নতুন করে আলোচিত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও দেশীয় প্রজাতির বিকল্প নেই। কারণ, স্থানীয় পাখি, পতঙ্গ, ছত্রাক, বিভিন্ন অণুজীব ও অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সহবিবর্তন রয়েছে।

অতএব, দেশীয় প্রজাতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

আন্তর্জাতিক গবেষণা কী বলছে?

বিশ্বব্যাপী বনবিজ্ঞান বর্তমানে এক নতুন ঐকমত্যের দিকে এগোচ্ছে। সেটি হলো—বৈচিত্র্য (diversity) একক প্রজাতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের হাজার হাজার বনভূমির ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মিশ্র প্রজাতির বন ঝড়, রোগবালাই এবং জলবায়ুগত চাপের বিরুদ্ধে একক প্রজাতির বনের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক (resilient)।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। দেশীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের উপযুক্ত প্রজাতির সমন্বয়ে গঠিত মিশ্র বনায়ন অনেক ক্ষেত্রে অধিক টেকসই ফল দিতে পারে।

অর্থাৎ আধুনিক বনবিজ্ঞান ‘শুধু দেশীয়’ কিংবা ‘শুধু বিদেশি’—কোনোটিকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখছে না।

লাগানো হবে ২৫ কোটি গাছ, অগ্রাধিকার দেশীয় প্রজাতিতে

প্রকৃত সমাধান কী?

গবেষণার আলোকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যৌক্তিক কৌশল হতে পারে চার স্তরবিশিষ্ট একটি মডেল।

প্রথম স্তর: প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে শতভাগ দেশীয় প্রজাতি

সুন্দরবন, শালবন, পাহাড়ি বন, সংরক্ষিত এলাকা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে দেশীয় প্রজাতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দ্বিতীয় স্তর: কৃষি বনায়নে মিশ্র মডেল

মেহগনি, রেইনট্রি বা ম্যানজিয়ামের পাশাপাশি কড়ই, গামারি, জাম, কাঁঠাল, অর্জুন, হিজল, বট, পাকুড়, চাপালিশ, তেলসুর ইত্যাদি দেশীয় প্রজাতি একসঙ্গে লাগানো যেতে পারে।

তৃতীয় স্তর: দেশীয় প্রজাতির অর্থনৈতিক মূল্যবৃদ্ধি

শুধু প্রচারণা দিয়ে দেশীয় প্রজাতি জনপ্রিয় হবে না। চারা, বাজার, কাঠশিল্প, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্যশৃঙ্খল উন্নত করতে হবে।

চতুর্থ স্তর: নিষেধাজ্ঞার বদলে প্রণোদনা

মানুষকে বিদেশি গাছ লাগাতে নিষেধ করার চেয়ে দেশীয় প্রজাতি লাগাতে উৎসাহিত করা অনেক বেশি কার্যকর।

সাম্প্রতিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রধান বার্তা হলো—একচেটিয়া বিদেশি প্ল্যান্টেশন যেমন সমস্যাসংকুল, তেমনি সব বিদেশি প্রজাতিকে একযোগে বাদ দেওয়ার নীতিও বাস্তবসম্মত নয়। বরং দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো দেশীয় প্রজাতির পুনরুত্থান, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরীক্ষিত বিদেশি প্রজাতির সীমিত ব্যবহার, এবং সর্বোপরি বৈচিত্র্যময় মিশ্র বনায়ন।

বননীতি মানুষের বিরুদ্ধে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে

বাংলাদেশে মেহগনি, রেইনট্রি, আকাশমণি কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় বিদেশি বৃক্ষ প্রজাতিকে সম্পূর্ণভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব পরিবেশগত উদ্বেগ থেকে উঠে এলেও, বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে সেটিকে সরল ও সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান বলা যায় না।

কারণ, বন কেবল জীববৈচিত্র্যের বিষয় নয়; এটি জীবিকা, অর্থনীতি, কাঠশিল্প, গ্রামীণ সঞ্চয়, জলবায়ু অভিযোজন এবং সামাজিক বাস্তবতারও বিষয়।

সাম্প্রতিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রধান বার্তা হলো—একচেটিয়া বিদেশি প্ল্যান্টেশন যেমন সমস্যাসংকুল, তেমনি সব বিদেশি প্রজাতিকে একযোগে বাদ দেওয়ার নীতিও বাস্তবসম্মত নয়।

বরং দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো দেশীয় প্রজাতির পুনরুত্থান, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরীক্ষিত বিদেশি প্রজাতির সীমিত ব্যবহার, এবং সর্বোপরি বৈচিত্র্যময় মিশ্র বনায়ন।

সবুজ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভবত ‘দেশীয় বনাম বিদেশি’ এই দ্বন্দ্বে নয়; বরং এমন এক ভারসাম্যে, যেখানে প্রকৃতির স্বার্থ ও মানুষের স্বার্থ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরস্পরের সহযাত্রী।

  • ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source