হামলার লক্ষ্য যখন পুলিশ
· Prothom Alo

শুধু পেশাদার অপরাধী নয়, স্থানীয় জনতা, রাজনৈতিক পক্ষ ও আসামির স্বজনেরাও হামলায় জড়াচ্ছে।
Visit newsbetsport.bond for more information.
হামলার ধরন বদলেছে—অভিযানে বাধা, ঘেরাও, কুপিয়ে জখম, গুলি, আসামি ছিনতাই ও গাড়ি ভাঙচুর।
রাজধানীর আদাবরে অভিযানে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হয়েছেন থানার ওসি ও এক এসআই। একই দিনে লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুজনকে ছিনিয়ে নিতে স্থানীয়দের হামলায় এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০-৩৫ জন আহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সরকারি ছয়টি গাড়ি।
এর এক সপ্তাহ আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যান আটককে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা ঘটে।
আলাদা এলাকায় ও আলাদা প্রেক্ষাপটে ঘটলেও এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন মনে করছেন না পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি-মে) পুলিশের ওপর অন্তত ২৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপর চলতি জুন মাসের মাঝামাঝিতে ঘটেছে বড় তিনটি ঘটনা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এ সংখ্যা ৮৭০ ছাড়িয়েছে। আসামি গ্রেপ্তার, অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে এমন হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশের সদস্যরা।
শুধু পেশাদার অপরাধীরা নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ, আসামির স্বজন কিংবা সংঘবদ্ধ দলও পুলিশের ওপর হামলায় জড়াচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ‘মব’ তৈরি করে অপরাধী বা আসামিকে নিজেদের হাতে নিয়ে ‘বিচার’ করতে চাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসামি গ্রেপ্তার, অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণে বা প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন পুলিশের সদস্যরা। শুধু পেশাদার অপরাধীরা নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ, আসামির স্বজন কিংবা সংঘবদ্ধ দলও পুলিশের ওপর হামলায় জড়াচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ‘মব’ তৈরি করে অপরাধী বা আসামিকে নিজেদের হাতে নিয়ে ‘বিচার’ করতে চাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি ও হামলার ঘটনায় পুলিশ ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাহিনীর কনস্টেবল থেকে আইজিপি—সব পর্যায়ের অনেক সদস্য আত্মগোপনে চলে যান। বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হন পুলিশের সদস্যরা। গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। ভেঙে পড়ে সারা দেশের পুলিশি ব্যবস্থা; তিন দিন পুরোপুরি বন্ধ থাকে থানাগুলোর কার্যক্রম। শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন।
পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধে বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশের ওপর হামলাঅন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বর্তমান সরকারের চার মাস পরও পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি—এমন মূল্যায়ন বাহিনীর ভেতরেও আছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে বলছেন, অভিযানে গেলে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকে সামনে এসে বাধা দেন। কেউ ভিডিও করেন, কেউ পুলিশের ওপর চড়াও হন, আবার কেউ রাজনৈতিক পরিচয় বা মব তৈরি করে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ যেমন কমেছে; আবার পুলিশও পূর্ণ মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা বা মানুষের আস্থার জায়গায় যেতে পারছে না।
তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক সময় দূর থেকে, নির্জন স্থানে বা রাতের আঁধারে হামলার ঘটনা বেশি দেখা যেত। এখন হামলার বড় অংশই হচ্ছে প্রকাশ্যে।
বদলাচ্ছে হামলার ধরন
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতীতেও অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশের সদস্যরা। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৬০০টির মতো ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালে ৬০১টি ঘটনায় পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক সময় দূর থেকে, নির্জন স্থানে বা রাতের আঁধারে হামলার ঘটনা বেশি দেখা যেত। এখন হামলার বড় অংশই হচ্ছে প্রকাশ্যে। আসামি ধরতে গেলে পুলিশকে ঘিরে ফেলা, অভিযানে বাধা, কুপিয়ে জখম, গুলি, আসামি ছিনতাই ও গাড়ি ভাঙচুর—এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।
যেমন ৯ জুন ঢাকার সাভারে মাদক মামলার এক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের দুই সদস্য। এ সময় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিকেও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন ঘটনায় শুধু অভিযানের ঝুঁকিই বাড়ছে না, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের মনোবলেও প্রভাব পড়ছে। থানার ভেতরেও পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে বলছেন, অভিযানে গেলে এখন আগের চেয়ে বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকে সামনে এসে বাধা দেন। কেউ ভিডিও করেন, কেউ পুলিশের ওপর চড়াও হন, আবার কেউ রাজনৈতিক পরিচয় বা মব তৈরি করে পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
মাঠে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের অনেকে মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় পুলিশকে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হতে হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নিয়মতান্ত্রিক বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রেও। তাঁদের ভাষ্য, এই সুযোগে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযানে গেলে মব তৈরি, পুলিশকে ঘিরে ফেলা, এমনকি গুলি ও কুপিয়ে জখম করার ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনায় ৫৬০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে মব তৈরি করে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ছিল অন্তত ২২৫টি।
রাজধানীতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে হামলায় ওসি আহত, পুলিশের গুলিতে আহত ২গত দেড় বছরের পুলিশের বিভিন্ন বৈঠকে এমন আক্রমণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, পুলিশ আগে থেকে কোনো অপরাধীর ওপর আক্রমণ করবে না। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের আক্রান্তও হওয়া যাবে না।
আবদুল কাইয়ুম, সাবেক আইজিপিপুলিশের ভেতরে যে ভয় বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে নেতৃত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।আদাবরে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার পর ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, হামলার মুখে পড়লে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ বলপ্রয়োগ করবে।
সম্প্রতি কুমিল্লার বুড়িচংয়ে পুলিশের ওপর হামলার পর বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা হলো, কোনোভাবেই যেন পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার না হন। যেসব অভিযানে ঝুঁকি আছে, সেখানে প্রয়োজনে অতিরিক্ত জনবল নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, নতুন করে যেন পুলিশ সদস্যদের মনোবলে আঘাত না আসে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলার বর্তমান সংকট শুধু অপরাধ বেড়ে যাওয়ার সংকট নয়; এর সঙ্গে পুলিশের মনোবল, বলপ্রয়োগের নীতি ও জননিরাপত্তা কাঠামোর প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
কেবল পুলিশ নয়; র্যাব, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে ডাকাতদের হামলায় নিহত হন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছরোয়ার।
আইন প্রয়োগে কঠোরতা, জবাবদিহিরও তাগিদ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলার বর্তমান সংকট শুধু অপরাধ বেড়ে যাওয়ার সংকট নয়; এর সঙ্গে পুলিশের মনোবল, বলপ্রয়োগের নীতি ও জননিরাপত্তা কাঠামোর প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। পুলিশের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে এবং বাহিনীটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে মাঠপর্যায়ের আইন প্রয়োগ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (সাবেক আইজিপি) আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের ভেতরে যে ভয় বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে নেতৃত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব কাঠামো থেকে পুলিশ সদস্যদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করলে বাহিনী তাঁদের পাশে থাকবে। তবে পুলিশকেও আগের মতো চললে হবে না; স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার মানসিকতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।