ফুটবল উন্মাদনার মধ্যেও কেন আলোচনায় ছত্তার পাগলা

· Prothom Alo

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের আকাশে যেন আরেকটা নতুন ঋতু নামে। পতাকার ঋতু। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ঋতু। চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দর থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই তখন শুধুই ফুটবল। প্রিয় দলের জার্সি আর পতাকার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। ড্রয়িংরুম থেকে টংদোকানের চায়ের আড্ডা কিংবা সরকারি অফিস থেকে করপোরেট আড্ডা—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ফুটবল।

Visit milkshakeslot.com for more information.

চিরচেনা এই ফুটবল উন্মাদনার ঠিক মাঝখানেই অদ্ভুত এক সুর ভেসে ওঠে ফেসবুক ওয়ালজুড়ে। বিশ্বকাপের ভরা মৌসুমে বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসা এই সুর আন্তর্জাতিক কোনো ফুটবল থিম সং কিংবা ঝাঁ-চকচকে স্টেডিয়ামের গান নয়; বরং নেত্রকোনার হাওরপাড়ের এক সাধক শিল্পীর সরল সংগীত।

হারভেইচ্ছারে বল খেলাডা তওবা কইরা ছাড়, আমি তোকে না করতাছি পাগল ছত্তার…।’

গোঁফের ছাঁটে খানিকটা চার্লি চ্যাপলিনের ছাপ, গলায় রংবেরঙের কাপড় আর মালা, মাথায় পাগড়ি আর হাতে নিজের তৈরি অদ্ভুত এক বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসতভিটার বারান্দায় আপনমনে গেয়ে যান এক চারণ শিল্পী।

চার দশকের বেশি সময় আগে লেখা এই গান আজও প্রাসঙ্গিক। প্রতিবার বিশ্বকাপ এলেই গানটি নতুন করে বেজে ওঠে। গানটি প্রাসঙ্গিক হওয়া কিংবা বিশ্বকাপের মঞ্চে বেজে ওঠার কারণ বোধ হয় গানের ভেতরকার দর্শন। গানের ভেতরে শুধু একজন বাবার ছেলেকে দেওয়া খেলার নিষেধ বা উপদেশটুকুই নেই; আছে এর গভীরে লুকিয়ে থাকা বাংলার গ্রামীণ জীবনের হাসি-কান্না, নিখাদ রসবোধ, গভীর লোকদর্শন এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সহজ–সরল সম্পর্কের এক অমূল্য দলিল। আধুনিক ফুটবলের জোয়ারেও তাই গানটি প্রতিবারই মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের টান।

কে এই ছত্তার পাগলা
ছত্তার পাগলার জন্ম নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানার লালচাপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সপরিবার বারহাট্টার নুরুল্লাচর গ্রামে এবং পরে মোহনগঞ্জের নলুয়ার চরে বসতি গড়েন। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ৮৭ বছর বয়সে এই অবিনাশী শিল্পী প্রয়াত হন।

শৈশবে রাতে ঘর পালিয়ে লেটো গান শুনতে শুনতেই গানের প্রতি আসক্তি জন্মেছিল তাঁর। একসময় নিজে লেটো দলে যোগ দিয়ে পায়ে ঘুঙুর পরে মেয়ে সেজে নাচতেন। পরে নিজেই গান বাঁধা ও সুর করা শুরু করেন। রশিদ উদ্দীন, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সির মতো নেত্রকোনার সমৃদ্ধ বাউল-পরম্পরারই এক সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন ছত্তার পাগলা।

বাণিজ্যের হাটে বিক্রি না হওয়া এক সাধক
ছত্তার পাগলার কাছে গান কোনো বাণিজ্য কিংবা বিনিময়ের মাধ্যম ছিল না, ছিল তাঁর উপাসনা। রেলস্টেশন, ট্রেনের কামরায় কিংবা হাটবাজারে গানের মজমা জমাতেন। তাঁর গানের সঙ্গী হতো কন্যা পারভীন ও ছেলে পারভেজ।

এই শিল্পীর বাদ্যযন্ত্রগুলো ছিল সম্পূর্ণ নিজস্ব। কোনো প্রথাবদ্ধ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন না। পেঁপেগাছের ডগা দিয়ে তৈরি পাতার বাঁশি, বাঁশের ‘কইঞ্চা’ দিয়ে নিজেই তৈরি করতেন সুরের জাদুদণ্ড। সেই বাঁশি আর ডুগডুগির তালে চারণ কবির গান শুনে মুগ্ধ শ্রোতারা চার আনা, আট আনা পয়সা ছুড়ে দিতেন। তাতেই চলত তাঁর সংসার ও আনন্দের এক মোহ জগৎ।

বিনোদনের বাণিজ্যিক দুনিয়া তাঁর চেনা থাকলেও নিজের পছন্দেই থেকেছেন শিকড়ের কাছাকাছি। খুব একটা লিখতে পারতেন না। মুখে মুখে গান বাঁধতেন আর পরিবারের সদস্য বা ভক্তরা তা লিখে রাখতেন। ৮৭ বছরের জীবনে কয়েক শ গান লিখলেও সংরক্ষণ করা গেছে মাত্র শ খানেক গান, যা এখন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার অপেক্ষায়।

লোকসংগীত কখনো মরে না, কখনো হারায় না

প্রতিবাদ ও হাওরের রূপকথা
ছত্তার পাগলা শুধু বল খেলার গানই বাঁধেননি, সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘কাঙাল মাইরা জাঙাল দিলে গুনাহ হইব তর’। আবার হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন, বিশ্বাস ও মিথ রূপকের মাধ্যম ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর অন্য জনপ্রিয় গানে, ‘শাপলা বানু শাপলা বানু/ অই দেখ কামধেনু দুধের গাই/ বালটি লইয়া খাটে বইয়া/ বাছুর ছাড়া দুধ গিরাই…’। এ ছাড়া ‘ইঞ্জিন ছাড়া ঠেলাইয়া নেই খালি মালগাড়ি/ সব ইঞ্জিন বন্ধ আইজকাল নাইগা ব্যাটারি’ কিংবা ‘ডিঙ্গা পোতা বন্দ’ গানের মতো অসংখ্য গান আশি ও নব্বইয়ের দশকেই নেত্রকোনা ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও ছত্তার পাগলার গান হারিয়ে যায়নি সময়ের স্রোতে। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে তা ফিরে আসছে নতুন আবহে, নতুন উপস্থাপনায়। রায়হান রাফী নির্মিত ‘তাণ্ডব’ সিনেমার আলোচিত গান ‘কে দিল পিরিতের বেড়া লিচুরও বাগানে, আরে কমলার বাগানে’ তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শাকিব খান ও সাবিলা নূর অভিনীত এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গানটি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে, তখন অনেকেই নতুন করে জানতে পারেন—এর শিকড় লুকিয়ে আছে লোককবি ছত্তার পাগলার সৃষ্টি ভান্ডারে।

যেভাবে ‘ভাইরাল’ হলেন ছত্তার পাগলা
জীবদ্দশায় কোনো স্টুডিওতে পা রাখেননি ছত্তার পাগলা, বের হয়নি কোনো গানের অ্যালবাম। তাহলে আজ এই ফেসবুক-ইউটিউবের যুগে তিনি এলেন কীভাবে?

নেপথ্যে আছেন নির্মাতা ও লোকসংগীত সংগ্রাহক মোল্লা সাগর। ২০০৭ সালের দিকে তিনি ছত্তার পাগলার বাড়িতে গিয়ে তাঁর গানের কিছু ভিডিও ধারণ করেন। পরে নিজের ‘চল মন নাটক দেখতে যাইতে’ প্রামাণ্যচিত্রে এটি ব্যবহার করেন এবং ২০১৯ সালে ইউটিউবে প্রকাশ করেন। সেখান থেকেই এই ফুটবল উন্মাদনার মৌসুমে গানটির খণ্ডিতাংশ ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়।

আজ ছত্তার পাগলা নেই, কিন্তু মোহনগঞ্জের নলুয়ার চরে প্রতিবছর তাঁর ওফাত দিবসে বসে ওরস। জনপদের শিল্পীকে নলুয়ারচরের জনমানুষ আজও ভোলেনি। ভুলবে না, কারণ ছত্তার পাগলা ছিলেন জনপদেরই স্বর।

চলচ্চিত্র বা বিনোদন বাণিজ্যের স্বার্থে ইদানীং লোকগানকে ‘রিপ্যাকেজিং’ বা আধুনিকায়নের নামে বিকৃত করার যে প্রবণতা, ছত্তার পাগলা ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ফুটবল বিশ্বকাপের এই রঙিন আলোয় ছত্তার পাগলার গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিকড়ের সুর কখনো ম্লান হয় না।

সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা

Read full story at source