চীনে আট বছর: এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষা, সংগ্রাম ও আত্মবিকাশের গল্প
· Prothom Alo

নভেম্বরের এক গভীর রাতে প্রথমবারের মতো চীনের কুনমিং চাংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামি। হাতে কয়েকটি ব্যাগ, পকেটে অল্প কিছু ইউয়ান আর মনে ছিল অজানা ভবিষ্যৎকে ঘিরে একরাশ স্বপ্ন ও শঙ্কা। আমি তখন টিনএজার, চীন নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। শুধু জানতাম, দেশটা আমার জীবন বদলে দেবে। কিন্তু কতটা বদলে দেবে, সেটা তখন কল্পনাও করতে পারিনি।
সালটা ২০১৮। এরপর আটটা বছর কেটে গেছে। এ সময়ে আমি তিনটি ডিগ্রি শেষ করেছি, ২০টির বেশি শহর ঘুরেছি, চীনের বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করেছি আর সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন করে চিনেছি।
Visit biznow.biz for more information.
এই লেখা সেই আট বছরের একটি সত্যিকারের ডায়েরি। কোনো রূপকথা নয়, কোনো গল্প নয়। এটা আমার জীবনের আসল অধ্যায়, যেখানে হাসি আছে, কান্না আছে, ভুল–বোঝাবুঝি আছে, আর আছে এক অদ্ভুত ভালোবাসা, যা ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে চীনের মাটির প্রতি।
প্রথম দিন: শব্দহীন এক সকাল
পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল কুনমিংয়ের ইয়ুননান ল্যান্ড অ্যান্ড রিসোর্সেস ভোকেশনাল কলেজের ডরমিটরিতে। রুমে আমি ছাড়া আরও তিনজন। একজন নাইজেরীয়, একজন পাকিস্তানি, আর একজন লাওসের। কেউ কারও ভাষা বোঝে না। নাশতার টেবিলে গিয়ে দেখি, এক বাটি গরম–গরম নুডলস, পাতলা স্যুপের ওপর ভাসছে ডিম আর সবুজ পেঁয়াজকুচি। পরে জেনেছিলাম, এটার নাম ‘মিশিয়ান’ ইউন্নানের একটি বিখ্যাত খাবার। তখন শুধু অবাক হয়ে ভাবছিলাম, সকাল সকাল এত গরম স্যুপ খায় কীভাবে মানুষ! সেই প্রথম মাসটা ছিল একেবারে শব্দহীন সিনেমার মতো। চারপাশে মানুষ কথা বলছে, হাসছে, রাগ করছে, আর আমি শুধু তাকিয়ে আছি, বুঝতে পারছি না কিছুই। ক্লাসে গিয়ে শিক্ষক যা বলছেন, তা যেন দূরের কোনো গ্রহের ভাষা। বন্ধুরা হাত নেড়ে, চোখের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করত। আমি সারাক্ষণ একটা অনুবাদ অ্যাপ নিয়ে ঘুরতাম। ‘প্লিজেন্ট টু মিট ইউ, আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ, হাউ মাচ,’—এই তিনটা বাক্য ছাড়া আমার আর কিছুই বলার ছিল না।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই অসহায়ত্বের মধ্যেও একটা ভালো লাগা ছিল। কারণ, প্রতিদিনই নতুন কিছু আবিষ্কার করছিলাম। রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ত লাল লন্ঠন, দোকানের সামনে সাজানো আজব সব ফল, আর ছোট ছোট ইলেকট্রিক স্কুটারে চড়ে মানুষজন নিঃশব্দে ছুটে যাচ্ছে। শব্দ নেই, ধোঁয়া নেই, শুধু বাতাসের হিসহিস শব্দ। ঢাকার হর্ন-কোলাহলের অভ্যস্ত কানের কাছে ব্যাপারটা ছিল ঘোরের মতো।
প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে এক ঘণ্টা করে শব্দ মুখস্থ করতাম। ক্লাসমেটদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম, ভুল হোক, বাক্যটা ভেঙে যাক, তবু বলতাম। চীনারা অদ্ভুত ধৈর্যশীল। তারা কখনো আমার ভুল উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি করেনি। বরং উৎসাহ দিয়েছে, শিখিয়ে দিয়েছে।
ভাষার দেয়াল—
প্রথম ছয় মাস কেটেছে যেন এক অদৃশ্য কাচের দেয়ালের ওপাশে বসে—সব দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ছুঁতে পারছি না। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই ভাষা আমাকে আয়ত্ত করতেই হবে। শুরু করলাম চীনা ভাষা—ম্যান্ডারিন শেখা। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য বলি: ইংরেজি বা বাংলা শেখার সঙ্গে চীনা ভাষা শেখার কোনো মিল নেই। প্রতিটি শব্দের আলাদা টোন বা সুর আছে, একই উচ্চারণ চার রকম সুরে বললে চারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ হয়। যেমন ‘মা’ শব্দটা; মা (M) মানে ‘মা’, মা (M) মানে ‘শণ’, মা (M) মানে ‘ঘোড়া’, আর মা (M) মানে ‘গালি দেওয়া’। প্রথম প্রথম কতবার যে দোকানে গিয়ে ঘোড়া কিনতে চেয়েছি, কিংবা কাউকে অজান্তেই গালি দিয়ে ফেলেছি, তার হিসাব নেই। এখন ভাবলে নিজেরই হাসি পায়। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে এক ঘণ্টা করে শব্দ মুখস্থ করতাম। ক্লাসমেটদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম, ভুল হোক, বাক্যটা ভেঙে যাক, তবু বলতাম। চীনারা অদ্ভুত ধৈর্যশীল। তারা কখনো আমার ভুল উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি করেনি। বরং উৎসাহ দিয়েছে, শিখিয়ে দিয়েছে। দোকানদার থেকে শুরু করে লাইব্রেরিয়ান, বাসচালক থেকে ক্যানটিনের আন্টি—সবাই আমার শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। আমি এইচএসকে লেভেল-৪ উত্তীর্ণ হয়েছি এবং বর্তমানে ম্যান্ডারিন ভাষায় সাবলীলভাবে কথা করতে পারি। এখন ভাবতেই কেমন লাগে, সেই আমি, যে একদিন ‘তোমার নাম কী’ বলতে পারতাম না, আজ চীনা ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং মিটিংয়ে দোভাষীর কাজ করি। সিনোহাইড্রোর প্রজেক্টে চীনা ও বাংলাদেশি টিমের মধ্যে সেতু হয়ে কাজ করেছি। ভাষা আসলে একটা চাবি, এটা শুধু দরজা খোলে না, পুরো পৃথিবীটাকেই খুলে দেয়।
ক্লাসরুম আর ক্যাম্পাস: ভিন্ন এক শিক্ষাব্যবস্থা
চীনের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কিছু না বললেই নয়। ইউনানে ডিপ্লোমা করার সময় প্রথম যে জিনিসটা চোখে লেগেছিল, সেটা হলো শৃঙ্খলা। ক্লাস শুরুর আগে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সবাই সিটে বসে। অনেক সময় ক্লাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ করে দেয়। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে কোনো আপস নেই। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। বাংলাদেশে আমরা সময় নিয়ে যতটা ঢিলেঢালা, এখানে ব্যাপারটা ঠিক তার উল্টো। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে বুঝলাম, এই শৃঙ্খলা চীনের দ্রুত অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পরবর্তীকালে নানজিং ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ব্যাচেলর করার সময় বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো।
এখানকার ল্যাবরেটরিগুলোতে যে ধরনের যন্ত্রপাতি আছে, সেগুলো একসময় আমার স্বপ্ন ছিল ছুঁয়ে দেখার। প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার (পিএলসি) থেকে শুরু করে রোবোটিকস আর্ম—সবকিছু হাতে–কলমে শেখার সুযোগ পেয়েছি। এনইউআইএসটিতে কাটানো চারটি বছর আমাকে শুধু ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জ্ঞানই দেয়নি, বরং শিখিয়েছে কীভাবে গবেষণা করতে হয়, কীভাবে সমস্যাকে বিশ্লেষণ করতে হয়, আর কীভাবে দলের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হয়। এখন আমি নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকসে (এনইউএএ) চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ টাইপ-এ নিয়ে কন্ট্রোল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করছি। এনইউএএ চীনের প্রজেক্ট ২১১-এর অন্তর্ভুক্ত একটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা চোখ কপালে ওঠার মতো, ল্যাবরেটরির কথা তো বাদই দিলাম। আর প্রতিটি ফ্যাকাল্টির জন্য গবেষণা বরাদ্দের পরিমাণ শুনলে বুঝতে পারবেন, কেন চীন আজ প্রযুক্তির পরাশক্তি।
চীনে রাত দুইটায় একজন বিদেশি ছাত্র শহরের যেকোনো জায়গায় হাঁটতে পারে, চুরি বা ছিনতাইয়ের কোনো ভয় নেই। চীনের সিসিটিভি নেটওয়ার্ক আর পুলিশিং সিস্টেম যে কতটা আধুনিক, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
খাবার: প্রথম আতঙ্ক থেকে ভালোবাসা
খাবারের গল্প না বললে চীনের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রথম সপ্তাহে আমি প্রায় না–খেয়েই কাটিয়েছি। কারণ, যা দেখছি, তা তো বাংলাদেশের খাবারের মতো নয়। ভাত আছে, কিন্তু তার সঙ্গে যে সবজি বা মাংস, তার স্বাদ একদম অন্য রকম। রান্নার ধরন, প্রকার, স্বাদ যা আমার জন্য একেবারেই নতুন। মরিচের বদলে ব্যবহার হয় সিচুয়ান পিপারকর্ন, যা খেলে জিব ঝিনঝিন করে, যেন কারেন্ট লেগেছে! প্রথম প্রথম চপস্টিক ধরা নিয়েও অনেক মজার ঘটনা আছে। পরবর্তীকালে চীনা বন্ধুরা শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে চপস্টিক ব্যবহার করতে হয়। তারপর একদিন এক চীনা বন্ধু জোর করে খাওয়ালো ‘হটপট’। একটা বড় পাত্রে ফুটন্ত স্যুপের মধ্যে মাংস, সবজি, মাশরুম ডুবিয়ে খেতে হয়। প্রথম চামচ খেয়েই চোখে পানি চলে এল, এত মসলাদার! কিন্তু দ্বিতীয় চামচে লাগল মজা। তৃতীয় চামচে প্রেম। এখন আমি নিজেই চীনা খাবারের ভক্ত। কুনমিংয়ের ‘গুওছিয়াও মিশিয়ান’ (ব্রিজ অ্যাক্রস নুডলস) থেকে শুরু করে নানজিংয়ের ‘ইয়াংচাও চাওফান’ (ইয়াংচৌ ফ্রায়েড রাইস), বেইজিংয়ের ‘পিকিং ডাক’ থেকে শুরু করে সিচুয়ানের ‘মাপো তোফু’—সবই এখন আমার কমফোর্ট ফুড। বন্ধুরা হাসিঠাট্টা করে বলে, তোর পেটটা এখন পুরোপুরি চায়নিজ!
বুলেট ট্রেন আর ভ্রমণ: এক বিস্ময়যাপন
চীনের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে হাইস্পিড ট্রেনের কথা। প্রথম যখন নানজিং থেকে গুয়াংঝৌ যাওয়ার জন্য ট্রেনে চড়লাম, ভাবছিলাম—এত দূরত্ব, প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার, যেতে তো কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু ছয়–সাত ঘণ্টার মধ্যেই আমি গুয়াংঝৌ পৌঁছে গেলাম! ট্রেনটা যখন ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটছে, তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা বুঝি পেছনে সরে যাচ্ছে। আর ট্রেনের ভেতরকার আরাম, পরিষ্কার সিট, টাইমলি সার্ভিস, ওয়াই–ফাই, আর খাবার তো বলার মতো নয়।
এই আট বছরে আমি চীনের ২০টির বেশি শহর ভ্রমণ করেছি। সাংহাইয়ের আকাশছোঁয়া বিল্ডিং, বেইজিংয়ের মহাপ্রাচীর, শিয়ানের টেরাকোটা ওয়ারিয়র্স, গুয়াংজুর ক্যান্টন টাওয়ার, ছেংডুর পান্ডা বেস প্রতিটি জায়গা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আর নিরাপত্তার ব্যাপারটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। রাত দুইটায় একজন বিদেশি ছাত্র শহরের যেকোনো জায়গায় হাঁটতে পারে, চুরি বা ছিনতাইয়ের কোনো ভয় নেই। চীনের সিসিটিভি নেটওয়ার্ক আর পুলিশিং সিস্টেম যে কতটা আধুনিক, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
সংস্কৃতির ধাক্কা আর ভুল–বোঝাবুঝি
তবে সবকিছু যে গোলাপি ছিল, তা নয়। সাংস্কৃতিক ধাক্কা খেয়েছি বারবার। চীনারা যখন প্রথম দেখায় বলে ‘নি চি লে মা?’ (তুমি খেয়েছ?) আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, আমাকে খাওয়াতে চাচ্ছে না কি! আসলে এটা তাদের ‘কেমন আছ’ বলার সংস্করণ। আবার খাওয়ার টেবিলে যখন সবাই মিলে একই প্লেট থেকে চপস্টিক দিয়ে খাবার তুলছে, প্রথম প্রথম একটু কেমন জানি লাগত। পরে বুঝলাম, এটা তাদের সামষ্টিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ, এখানে ভাগাভাগি করাটাই স্বাভাবিক।
আরেকটা মজার অভিজ্ঞতা বলি। একবার এক চীনা বন্ধুকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বললাম, ‘শিয়ে শিয়ে।’ সে অমনি হাত নেড়ে বলল, ‘বু ইয়াও, বু ইয়াও’ (লাগবে না, লাগবে না)। আমি ভাবলাম, সে বুঝি বিব্রত হচ্ছে, আরও জোর দিয়ে ধন্যবাদ দিলাম। তখন শিখলাম, চীনা সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত প্রশংসা বা ধন্যবাদ গ্রহণ করাটা বিনয়ের লক্ষণ নয়, বরং সংক্ষেপে স্বীকার করে আবার কাজে ফিরে যাওয়াটাই ভদ্রতা। এই ছোট ছোট পার্থক্যগুলো বুঝতে বুঝতে আমার লেগে গেছে বছরখানেক।
হোমসিকনেস: যে কষ্ট কেউ দেখে না
বিদেশে পড়তে আসা মানেই একধরনের নিঃসঙ্গতা সঙ্গে নিয়ে আসা। প্রথম ঈদে কেঁদেছিলাম। মোবাইলে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছি, মা কাঁদছে, আব্বু চোখ মুছছেন আর আমি হাসার ভান করছি। ক্যাম্পাসের কোনায় বসে ভাবতাম, এই পথটা কি ঠিক ছিল? কেন বাংলাদেশ ছেড়ে এত দূরে এলাম? পরে শিখেছি, এই একাকিত্বই আসলে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক ছিল। যখন কেউ সঙ্গ দেয় না, তখন নিজের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করতে হয়। ডায়েরি লেখা শুরু করলাম। কবিতা লিখতে শুরু করলাম। নিজের চিন্তাগুলোকে বুঝতে শুরু করলাম। এখন যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়, এই একাকিত্ব না থাকলে আমি নিজেকে কখনোই এত গভীরভাবে চিনতে পারতাম না।
বন্ধুত্ব: সীমান্তহীন সম্পর্ক
আমার বন্ধুরা ছিল ভিন্ন ভিন্ন মহাদেশের— আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপের। নাইজেরিয়ান বন্ধু শিখিয়েছে আফ্রিকান ছন্দ, পাকিস্তানি বন্ধুর কাছে শিখেছি উর্দুর মিষ্টতা, আর চীনা বন্ধু শিখিয়েছে ধৈর্য আর পরিশ্রমের মূল্য। আমরা একসঙ্গে রান্না করতাম, বাংলাদেশি বিরিয়ানি, পাকিস্তানি কারাহি, নাইজেরিয়ান জোলোফ রাইস, আর চাইনিজ ডাম্পলিং। যে রান্নাঘরে অনেক দেশের মসলার গন্ধ মিশে যেত, সেটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’-এর ক্লাস।
এই বন্ধুত্বগুলো শুধু আনন্দের জন্য নয়; এগুলোই আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ আসলে সব জায়গাতেই এক। ভাষা আলাদা, ধর্ম আলাদা, রং আলাদা, কিন্তু স্বপ্ন এক, কষ্ট এক, ভালোবাসা এক। এই বোধ না থাকলে আমি হয়তো শুধু একজন প্রকৌশলী হতাম, কিন্তু মানুষ হতাম না।
বাংলাদেশ-চীন: বন্ধুত্বের আরেক নাম
চায়নিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ টাইপ-এ শুধু আমার স্বপ্ন পূরণ করেনি, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের একটা জীবন্ত উদাহরণ হয়ে আছে। প্রতিবছর চীনা সরকার হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি দেয়, যার মধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। শুধু বৃত্তিই নয়, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, অবকাঠামো প্রকল্প, আর প্রযুক্তি বিনিময় বাংলাদেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। আমি নিজে সিনোহাইড্রোতে কাজ করার সময় দেখেছি, কীভাবে চীনা ও বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা মিলেমিশে কাজ করছে। চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনে জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই) সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে।
আট বছর আগের সেই কিশোর আর আজকের আমি এক নই। এই দেশ আমাকে শুধু একটি ডিগ্রি বা পেশাগত দক্ষতা দেয়নি, দিয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ। আমি শিখেছি, ভাষা কোনো বাধা নয়; বাধা হলো নিজের ভয়। আমি শিখেছি, ভিন্ন সংস্কৃতিকে বিচার না করে বুঝতে গেলে পৃথিবীটা অনেক বড় আর সুন্দর হয়ে ওঠে। আমি শিখেছি, বাড়ি থেকে দূরে থাকলেও বাড়ির ভালোবাসা ঠিকই পৌঁছায়, শুধু গ্রহণ করতে জানতে হয়। এখন যখন নানজিংয়ের ক্যাম্পাসে সন্ধ্যাবেলায় হাঁটি, আকাশে উড়ন্ত বিমানের দিকে তাকাই—ভাবি, একদিন হয়তো এই আকাশে আমার ডিজাইন করা কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট উড়বে। স্বপ্নটা বড়, কিন্তু চীন আমাকে শিখিয়েছে বড় স্বপ্ন দেখতে। আর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে সেই স্বপ্নকে দেশের কাজে লাগাতে চাই, এটাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
লেখক: মোহাম্মদ মনসুর আলম, শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস এবং এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার, বাংলাদেশ-চায়না ইউথ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]