লাউয়াছড়ার পাশে একটুকরো অবসর, চায়ের দোকানে জমে ওঠা গল্প

· Prothom Alo

সকালের আলো ফুটতেই শুরু হয় সাদ্দামের দিনের ব্যস্ততা। একটি ঠেলাগাড়িতে করে পানির বোতল, কেটলি, চায়ের কাপ, চেয়ার-টুলসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে তিনি পৌঁছে যান দোকানে। মাটির চুলায় শুকনা কাঠ ও খড় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে বসিয়ে দেন বড় কেটলি। ধীরে ধীরে কেটলির ভেতর ফুটতে থাকে পানি, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে চায়ের সুগন্ধ। সকালের নীরবতা ভেঙে কিছুক্ষণের মধ্যেই আসতে শুরু করেন লোকজন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবুজ ছায়া, চারপাশে বিস্তীর্ণ চা-বাগান আর পাশে নিরিবিলি ভানুগাছ সড়ক। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘সাদ্দামের দোকান’ নামে পরিচিত। তবে একসময় সবাই এটিকে চিনতেন ‘চাচার দোকান’ হিসেবে। সময়ের সঙ্গে দোকানের নাম বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও আকর্ষণ কমেনি। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ভাড়াউড়া চা-বাগানসংলগ্ন শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশের এই দোকান প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে। এক পাশে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, অন্য পাশে চা-বাগান।

Visit h-doctor.club for more information.

দিনভর এখানে চলে চায়ের আড্ডা, গল্প, হাসি-আনন্দ আর নানা স্মৃতিচারণা। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি চায়ের দোকান নয়, বরং ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করার প্রিয় আশ্রয়স্থল। দোকানটিতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কাপ দুধ চা ও রং চা বিক্রি হয়। এর পাশাপাশি পান, বিস্কুট, কেক, কলাসহ নানা ধরনের হালকা খাবারও পাওয়া যায়।

এই দোকানে নিয়মিত চা খেতে আসা দ্বীপ চক্রবর্তী বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমাদের দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে এই দোকানে আসা। প্রতিদিন অন্তত একবার এখানে না এলে যেন দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে।’

শ্রীমঙ্গলের সোলেমান পাটোয়ারি বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের বাইকারদের কাছে দোকানটি একটি পরিচিত মিলনকেন্দ্র। আমরা অনেকেই দল বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে এখানে আসি। শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হলেও এই জায়গার প্রতি আলাদা একটা টান কাজ করে। এখানে এসে চা খেতে খেতে গল্প করা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো—সবকিছুই উপভোগ করি। সবচেয়ে ভালো লাগে, এখানে কোনো কৃত্রিম আয়োজন নেই। বিদ্যুৎ নেই, ফ্যান নেই। প্রকৃতির বাতাসই সবকিছুর ঘাটতি পূরণ করে দেয়।’

হাতে চায়ের কাপ নিয়ে দোকানের পাশেই জমে উঠেছে গল্প-আড্ডা। শুক্রবার সকালে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা-বাগানসংলগ্ন শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশে

শ্রীমঙ্গলের জীবন পাল বলেন, মনটা শান্ত করে তোলে প্রকৃতির এই আমেজ। শহরের বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে নিজেকে মুক্ত করতেই এখানে ছুটে আসা। চা মুখ্য বিষয় নয়, প্রকৃতির বুকে কিছুটা সময় কাটানোই এখানে আসার প্রধান উদ্দেশ্য।

দোকানটির পরিচালক সাদ্দাম মিয়া বলেন, ‘এই দোকানের সঙ্গে আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ২০০৩ সালে আমার বাবা সবর আলী এখানে ছোট পরিসরে চায়ের দোকান শুরু করেছিলেন। এখন বাবা বয়সের কারণে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না। আমি দোকানটি পরিচালনা করি। প্রতিদিন শ্রীমঙ্গল শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এখানে আসেন। পাশাপাশি দেশ-বিদেশের পর্যটকেরাও আসেন। ঢাকার অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, অভিনেতা, লেখক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে চা খেতে এসেছেন। আমরা চেষ্টা করি সবাইকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতে এবং ভালো মানের চা পরিবেশন করতে।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের পর্যটন মানচিত্রে দোকানটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। অনেক পর্যটক এখন লাউয়াছড়া বা চা-বাগান ঘুরতে এসে এই দোকানে কিছু সময় কাটান। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য আমরাও সুযোগ পেলেই এখানে আসি।’

Read full story at source