তাঁর কবিতায় সরব বাংলাদেশ
· Prothom Alo

বিট জেনারেশনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের (৩ জুন ১৯২৬-৫ এপ্রিল ১৯৯৭) আজ শততম জন্মদিন। উন্মাদনাগ্রস্ত, ঘোর লাগা ও যুদ্ধবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এক কবি–ব্যক্তিত্ব তিনি। তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছেন, কীভাবে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা ও মতামত ধরে রাখতে হয়। নিজ দেশের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। বিট জেনারেশনের অবাধ ও বেহিসাবি জীবন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী নতুন প্রজন্মকে কবিতা, সংগীত ও শিল্পকলায় মুক্তির আনন্দে বিভোর করেছিল; স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন তাঁর কিংবদন্তি কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। এ জন্য বাংলাদেশের হৃদয়ে তাঁর জন্য একটি বিশেষ আবেগ রয়েছে।
Visit iwanktv.club for more information.
আমি যখন নিউইয়র্কপ্রবাসী, সাহসী, খ্যাপাটে ও উন্মাতাল বিট জেনারেশনের ব্যক্তিত্বদের আমার ক্যামেরা অনুসরণ করেছে প্রায় আট বছর। এক সাক্ষাৎকারে অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাকে বলেছিলেন, ‘যারা অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানে, তাদের জন্য কি কেউ কলম ধরবে না? আমরা বলেছি, এটা হতে দেব না। রাজদরবার থেকে সাহিত্যকে ছিনিয়ে এনে জনতার রাস্তায় স্থাপন করেছি—পানির কলের মতো। বলেছি, এসো ভাইবোনেরা, যে যার প্রয়োজনমতো নিয়ে যাও। বিশ্বব্যাংকের মতো আমরা তোমাদের ধোঁকা দেব না। এটা ঋণ নয়। পূর্বসূরিদের সাহিত্য-বাণিজ্য আমরা ভেঙে দিয়েছি। রাজপ্রাসাদ থেকে জনগণকে ফুসলানো বাক্য আর নয়।’
১৯৮৯ সালের ১ মে। মেহনতি জনতার স্মরণে মে দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরীতে গৃহহীনদের আখড়া টমকিন্স স্কয়ার পার্কে। নানা মতের মানুষেরা জড়ো হয়েছেন ড্রাম ও অদ্ভুত সব সংগীতযন্ত্র নিয়ে। ক্যামেরা হাতে আমিও উপস্থিত। গৃহহীনেরা কাগজের বাক্সকে ঘর বানিয়ে পার্কের এখানে–সেখানে ঘুমিয়ে। হঠাৎ দেখি, দূরে একজন ওদের কাছে গিয়ে নিবিড়ভাবে কথা বলছেন। কাঁধে ক্যামেরা, ঘাড়ে ছোট্ট একটি ব্যাগ। চেনা চেনা মনে হলো। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায় এই মানুষের সাদা–কালো ছবি দেখেছিলাম। উনি কি ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’–এর কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ? আমি দৌড়ে গেলাম।
বয়স্ক লোকটি মঞ্চের সামনে এসে ছবি তুলছেন। মনে মনে বলছি, তুমি যে–ই হও, আমাকে ক্যামেরায় পরাস্ত করা তোমার কাজ নয়। ড্রামের বিকট শব্দ বন্ধ হলো। মাইকে বলা হলো এখন কবিতা পড়বেন মার্কিন পতাকা ছিনতাইকারী কবি।
হইচই করে উঠলেন দর্শকেরা। দুম করে মাইকের সামনে গিয়ে জ্বালাময় বক্তব্য দিলেন কবি। আসলে কবিতা পড়লেন। সবশেষে এবার কবিতা পড়বেন বিট জেনারেশনের গুরু অ্যালেন গিন্সবার্গ। আনন্দে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’–এর স্রষ্টা অ্যালেন গিন্সবার্গ এখন আমার নাগালের মধ্যে। তিনি কোনো বক্তব্য দিলেন না। একটি রাজনৈতিক কবিতা পড়ে মঞ্চ থেকে নেমে পার্কের বাইরে হেঁটে চলে গেলেন। কেউ তাঁকে অনুসরণ করলেন না, তাঁকে ঘিরে কোনো জটলাও হলো না।
দেখি, কবি চলে যাচ্ছেন পার্কের বাইরে। ডাউনটাউন নিউইয়র্কের রাস্তার ধারের দেয়ালে গ্রাফিতি–পোস্টার। আমি তাঁকে অনুসরণ করছি। পেছন পেছন আসতে দেখে তিনি আড়চোখে দেখলেন। অতি উৎসাহী হয়ে কাছে গিয়ে বোকার মতো জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি কবি অ্যালেন...?’
কবি আরও জোরে হেঁটে ফার্স্ট অ্যাভিনিউর ফুটপাতে পুরোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে থামলেন। আমি তাঁর ঠিকানা চাইলাম। তিনি মুখে বললেন, আমি লিখলাম। তিনি পুরোনো বই দেখছেন, এমন কয়েকটি ছবি তুললাম। তারপর বইয়ের হকারের হাতে আমার ক্যামেরা দিয়ে বললাম, আমাদের দুজনের ছবি তুলে দিতে। ছবি তোলা শেষে তিনি দ্রুত ব্যস্ত শহরের কোলাহলে ঢুকে পড়লেন।
এরপর গিন্সবার্গের ছবি তোলার জন্য টিকিট কেটে কবিদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে থাকি। আমি বাংলাদেশের, এ কথা শোনার পর মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীশিবিরের স্মৃতি নিশ্চয়ই তাঁকে তাড়িত করেছিল। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গিন্সবার্গ কলকাতা থেকে যশোর রোডে শরণার্থীদের দুরবস্থা নিজের চোখে দেখতে আসেন। বহু ছবি তিনি তুলেছিলেন। সেসব নেগেটিভ হারিয়ে গিয়েছিল। কবির হাতে তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো আর আমাদের দেখা হবে না।
১৯৯১ সালের মে মাসে কবি নির্মলেন্দু গুণ নিউইয়র্কে গেলে আমি গিন্সবার্গকে ফোন করে সময় চাইলাম। তিনি তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে আমন্ত্রণ জানান। আমি এই দুই কবির কথোপকথন উপভোগ করি এবং অনেক ছবি তুলি। গুণ ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনদের শোচনীয় পরাজয়ের কথা বললে অ্যালেন ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বহু আন্দোলনের কথা উল্লেখ করলেন।
সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। তিনি কাপড় পরছেন, কোনো অনুষ্ঠানে যাবেন। সেদিন একটি বিশেষ ঘটনা ঘটালেন তিনি। আমাদের সামনে নিয়ে এলেন ১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে আনা একটি ছোট হারমোনিয়াম। বললেন, ‘তোমাদের আজকে সেই কবিতাটিতে সুর দেওয়া গানটা শোনাব।’ কী বলছেন তিনি! অত্যন্ত দরদ দিয়ে বেসুরো কণ্ঠে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি গাইলেন গিন্সবার্গ। গ্রিনিচ ভিলেজে গিন্সবার্গের অ্যাপার্টমেন্টের কাচের জানালায় গোধূলির আভা যেন একাত্তরের লাল রঙের মতো গাঢ় হয়ে আমাদের বিদায় জানাতে চায়।
একবার বাংলাদেশে এসে বইমেলা থেকে লালন সাঁইজির গানের ইংরেজি অনুবাদের বই সংস অব লালন শাহ কিনে নিউইয়র্কে পৌঁছে গিন্সবার্গকে ফোন দিয়ে বলি, তোমার জন্য লালনের বই নিয়ে এসেছি। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, কালই নিয়ে এসো।
বইটি হাতে দিতেই বললেন, প্রাচ্যের মনীষীদের লেখা এমনই একটি বই তিনি খুঁজছিলেন। জানলাম, লালন তাঁর আগ্রহের বিষয়। আমার সামনে দাঁড়িয়েই কয়েকটি কবিতা পড়লেন। একটি বাঁধানো নকশিকাঁথা ও বাঁশের বাঁশি উপহার দিলাম। দেয়ালে ঝোলানো একটি ছবি সরিয়ে সেখানে নকশিকাঁথাটা রাখলেন। সামান্য উপহার; কিন্তু তাঁকে মুগ্ধ করেছে। একটি কবিতা পাঠ করে কয়েকবার বললেন, ‘লালন সেইজ’। পরে লালনের প্রভাবে তিনি ‘আফটার লালন’ নামে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন এবং স্বকণ্ঠে রেকর্ড করেছিলেন।
অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ বা ‘আফটার লালন’ কবিতার মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের অগণিত পাঠকের কাছে বাংলাদেশ সরব হয়ে রয়েছে।
শততম জন্মদিনে কবিকে গভীর মমতায় স্মরণ করছি।