হাওরপারে ছোট মাছের ছোট বাজার, বিকেলে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় শেষ

· Prothom Alo

বিকেল গড়িয়ে চলেছে। সন্ধ্যার দিকে গোল হয়ে এসেছে সূর্যটা। যত দূর চোখ যায় বিস্তীর্ণ সাদা পানি—মাঝেমধ্যে ভাসমান ঘাস, নানা রকম জলজ উদ্ভিদের টুকরাটাকরা। এই পানির মধ্যেই একেকটি ছোট ছোট নৌকা, যেন একেকটি কালো হাঁস ডানা ভাসিয়ে তীরের দিকে ছুটে আসছে। হাওরপারের ঘাটে এসে সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্থির হয়ে যায়। সারি সারি নৌকা পাড়ের মাটিতে বুক ঘষে দাঁড়িয়ে থাকে। এগুলো মাছ ধরার নৌকা। দিনশেষে জালে ধরা মাছ নিয়ে এখানে ফিরে এসেছেন মৎস্যজীবীরা।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের খইশাউড়া গ্রামের কাছে রোববার বিকেলে এমন দৃশ্য দেখা যায়। জায়গাটি একেকজনের কাছে একেক নামে পরিচিত। সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ও একাটুনা ইউনিয়ন দুই দিক থেকে এসে এই জায়গায় যুক্ত হয়েছে। গা ঘেঁষে থাকা গ্রামের নাম হচ্ছে করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া, যার যখন যেটা খুশি, সে রকমই নাম বলেন।

Visit bettingx.bond for more information.

পড়ন্ত বিকেলে গ্রামের ইট–সুরকি বিছানো ও কাদামাটির পথে বাড়িঘরের ছায়া পড়ে গেছে। গ্রামের ভেতরে করমউল্লাহপুরের একটি কালভার্টের ওপর অনেক মানুষের ভিড়। নানাবয়সী মানুষ সেখানে ভিড় করেছেন। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ কালভার্টের রেলিংয়ে বসে আছেন। প্রচণ্ড গরম। কাউয়াদীঘি হাওরের দিক থেকে পিলপিলে বাতাস আসছে। অনেকে এলোমেলো দাঁড়িয়ে সেই হাওয়ায় গা জুড়িয়ে নিচ্ছেন।

কালভার্টের কাছে গিয়ে দেখা যায়, এটা আসলে বিকেল বেলার মাছের হাট—শুধুই মাছের। জেলেরা কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরে বিক্রির জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন। কেউ মাছের ডোলা কাঁধে ঝুলিয়ে আসছেন, কেউ মাছ বিক্রি করে বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছেন। একজনের পর একজন মাছ নিয়ে আসছেন—মাছ নিয়ে আসা থেমে নেই। আর সেই মাছ কিনতে পাইকারেরা মাছ নিয়ে আসা লোকটির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। দরদাম করে যাঁর যাঁর হিসাবমতো পোষালেÑমাছ কিনছেন। প্লাস্টিকের ক্যারেট ও বেতের ‘চাউঙরা’য় (ঝুড়ি) জড়ো করে রাখছেন। এখানে কৌতূহলী মানুষও আছেন অনেকে।

মাছ ধরে নৌকার পাটাতনে পানির মধ্যে রাখা হয়েছিল। বিক্রির জন্য ঝুড়িতে তোলা হচ্ছে

করমউল্লাহপুর গ্রামের রেনু মিয়া ও দুরুদ মিয়া জানালেন, এই মাছ নিয়ে মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট ও পশ্চিম বাজারে বিক্রি করা হবে। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতা প্রায় সবাই এই দু-তিন গ্রামের মানুষ। এটা একবেলার কাউয়াদীঘি হাওরের ছোট মাছের পাইকারি ছোট বাজার, যা বিকেল চার-পাঁচটার দিকে শুরু হয়, সন্ধ্যা হয়ে গেলে বাজার শেষ। ততক্ষণে হাওর থেকে প্রায় সব জেলে মাছ নিয়ে ফিরে আসেন। বেচাকেনাও শেষ হয়ে যায়। খুচরা বিক্রেতারা মাছ নিয়ে শহরের দিকে চলে যান। এখানে নিয়ে আসা মাছের মধ্যে আছে মখা (মলা), পুঁটি, ট্যাংরা, কই, মেনি, খইয়া, চ্যাং, চাঁদাসহ ছোট প্রজাতির নানা রকম মাছ।

হাওর থেকে মাছ ধরে কালভার্টের কাছে ফেরার পথে খইশাউড়ার মোশারফ মিয়ার সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর কাঁধে মাছের ঝুড়ি। ঝুড়িতে মলাসহ বিভিন্ন জাতের তরতাজা মাছ। তিনি (মোশাররফ মিয়া) বলেন, ‘এখানে পাঁচ-ছয় শ টাকার মাছ আছে। বেলা দুইটার দিকে হাওরও গেছি, আর অউতো (এই তো) অখন (এখন বিকাল ছয়টা) ফিররাম। প্রায় দিনই এই একবেলা মাছ মারি।’

কালভার্ট থেকে কিছুটা দূরে হাওরের জলের কাছে গেলে হাওরপারের অন্য রকম চেহারা—অনেকগুলো নৌকা সেখানে বাঁধা আছে। সারা বিকেল কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরে অনেকে ঘাটে ফিরে এসেছেন।

খইশাউড়ার তানজিল হাসান নৌকার পাটাতন থেকে তরতাজা মাছগুলো প্লাস্টিকের ক্যারেটে তুলতে তুলতে বলেন, ‘এখানে পাঁচ-সাত শ টাকার মাছ আছে। বেলা দুইটার পরে আমরা হাওরে গেছি। পাতা জাল থেকে মাছ ধরছি। এখন ঘাটও আইলাম (আসছে)। এই মাছ বিক্রি করমু (করব)। রাইত (রাত) তিনটার দিকে আরবার (আবার) নৌকা লইয়া (নিয়ে) মাছ ধরতে যাইমু (যাব)।’ তাঁরা দুজন একসঙ্গে মাছ ধরেন।

মাছ ধরার নৌকাগুলো ঘাটে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। রোববার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের খইশাউড়ায়

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া—এই তিনটি গ্রামের অনেকেই মৎস্যজীবী। বর্ষাকালে তাঁরা কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরেন। গ্রামগুলো থেকে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০টি নৌকা হাওরে যায়। কোনো নৌকায় একজন, কোনো নৌকায় দুজন থাকেন। কেউ বিকেলে মাছ ধরেন—কেউ সন্ধ্যার দিকে হাওরের নির্দিষ্ট স্থানে ছোট মাছের জাল পেতে রাখেন। শেষ রাতে গিয়ে তাঁরা জাল থেকে মাছ ধরে আনেন। আবার অনেকে আছেন—দুই বেলাতেই হাওরে মাছ ধরেন। তারপর ছোট মাছের ছোট বাজার করমউল্লাহপুর কালভার্টে এসে বিক্রি করেন। হাওরে যত দিন পানি আছে, তাঁদের এ রকম মাছ ধরা, মাছ বিক্রি নিয়মের মতো চলতে থাকে। ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলো ঘাসের সঙ্গে, কচুরিপানার সবুজের সঙ্গে মিশে আছে। বিভিন্ন দিকে কচুরিপানা ও সবুজ জলজ উদ্ভিদের ভেতর কালো কালো ছায়া হয়ে ছড়িয়ে আছে নৌকাগুলো।

তখন বেলা আর নেই। শেষবেলার রঙিন ছায়া পড়েছে হাওরের পানিতে—সেই রঙের খেলা ঢেউয়ের বুকে। তখনো হাওরের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে হঠাৎ এক-দুটা নৌকা। নৌকাগুলো কচুরিপানা ঠেলে শুকনা মাটির কাছে ভিড়তে চেষ্টা করছে। সন্ধ্যার ছায়া তখন ঘন হয়ে আসছে গ্রামের ভেতর, হাওরের বিশাল বুকে।

Read full story at source