ব্রাজিলের কান্না, সুয়ারেজের কামড় আর প্রেস অফিসারের লাল কার্ড

· Prothom Alo

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

এটি ছিল বিশ্বকাপের ২০তম আসর। আগের ১৯ আসরের মধ্যে দুবার প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু ২০১৪ আসরের মতো যন্ত্রণা ব্রাজিলিয়ানরা আর কখনো পায়নি। এমনকি এর আগে বিশ্বকাপ আয়োজনকারী কোনো দেশও ব্রাজিলের মতো অপমানের শিকার হয়নি, যতটা এ আসরে হয় সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে।

Visit chickenroadslot.lat for more information.

জার্মানি পরে ফাইনালে কাঁদায় আর্জেন্টিনাকে, জেতে নিজেদের চতুর্থ শিরোপা। স্বাগতিক ব্রাজিল শুধু নিজেদের মাটি থেকে জার্মানিকে শিরোপাই নিয়ে যেতে দেখেনি, বিশ্বকাপের বড়সড় এক রেকর্ডও হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখে। টুর্নামেন্টে দুটি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান জার্মানির মিরোস্লাব ক্লোসা, সিংহাসনচ্যুত হন রোনালদো নাজারিও।

এই টুর্নামেন্টে ফিফা দুটি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। প্রথমটি হলো একধরনের বিশেষ স্প্রে (ভ্যানিশিং স্প্রে), যা দিয়ে ফ্রি কিকের সময় রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের দেয়াল বা প্রাচীর তৈরি করার নির্দিষ্ট জায়গা দাগিয়ে দেওয়া হয়। আর দ্বিতীয়টি হলো ‘হকস আই’ বা গোললাইন প্রযুক্তি। এটি মূলত ক্যামেরার একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বল গোললাইন পার হয়েছে কি না, তা নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করা যায়।

বিশৃঙ্খলা

২০১৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের পথে ব্রাজিলকে বড় ধরনের সাংগঠনিক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছিল। টুর্নামেন্ট শুরুর সময়ও ৩৫টি অবকাঠামো প্রকল্প অসমাপ্ত ছিল। কোথাও কাজ বিলম্বিত হয়েছে, কোথাও থেমে গেছে, আবার কিছু প্রকল্প শুরুই হয়নি। এমনকি নাটালের এস্তাদিও দাস দুনাস স্টেডিয়ামও প্রথম ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ফায়ার ব্রিগেডের নিরাপত্তা অনুমোদন পায়।

প্রস্তুতিপর্বে দুর্ঘটনাও ঘটে। বেলো হরিজন্তেতে একটি ওভারপাস ধসে পড়ে প্রাণ হারান দুজন। এদিকে ফিফার তৎকালীন মহাসচিব জেরোম ভালকে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, কাজের গতি বাড়াতে ব্রাজিলের ‘পাছায় লাথি’ দরকার। এক বছর পরে অবশ্য টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে তিনিই ফিফা থেকে বহিষ্কৃত হন।

বিশ্বকাপের বিপুল ব্যয়ও ছিল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। স্টেডিয়াম নির্মাণ ও সংস্কারে ব্রাজিল খরচ করে প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের কয়েকটি বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি। এর সঙ্গে বিমানবন্দর, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে আরও প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়। ফলে ২০১৪ বিশ্বকাপ তখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপে পরিণত হয়। এই বিপুল ব্যয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জনসেবায় অর্থের ঘাটতির অভিযোগ তুলে ব্রাজিলজুড়ে বিক্ষোভও হয়েছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭ গোল হজম করে ব্রাজিল

আবারও বোয়াটেং ভাইরা

২০১০ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দুই দেশের হয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই ভাই কেভিন প্রিন্স-জেরোম বোয়াটেং। কী পরিহাস, ২০১৪ সালেও একই গ্রুপে পড়ে যায় দুই ভাইয়ের দল ঘানা ও জার্মানি। ২১ জুন কাস্তেলো স্টেডিয়ামের ম্যাচটি ২-২ সমতায় শেষ হয়। তবে দুই ভাই একসঙ্গে মাঠে ছিলেন শুধু প্রথমার্ধে। বিরতির সময় জেরোমকে তুলে নেওয়া হয়। ম্যাচটি ড্র হলেও জার্মানি পরে গ্রুপ–সেরা হয়ে নকআউট পর্বে ওঠে। অন্যদিকে ঘানা গ্রুপের তলানিতে থেকে বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে।

সুয়ারেজের কামড়

২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইতালি-উরুগুয়ে ম্যাচটি ইতিহাসে জায়গা করে নেয় মূলত লুইস সুয়ারেজের কাণ্ডের কারণে। গোলশূন্য অবস্থায় ম্যাচের শেষ দিকে ইতালির ডিফেন্ডার জর্জো কিয়েল্লিনির সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে সুয়ারেজ তাঁকে কামড় দেন বলে অভিযোগ ওঠে। রেফারি ঘটনাটি দেখতে না পাওয়ায় খেলা চলতে থাকে। এর কিছুক্ষণ পরই ডিয়েগো গডিনের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট পর্বে উঠে যায় উরুগুয়ে, আর বিদায় নেয় ইতালি।

সুয়ারেজের কামড়ের পর কিয়েল্লিনির রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা

ম্যাচের ভিডিও বিশ্লেষণের পর ফিফা সুয়ারেজকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ৯ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয়। বিষয়টি তুমুলভাবে আলোচনায় আসে। কারণ, এর আগেও ক্লাব ফুটবলে দুবার প্রতিপক্ষকে কামড়ানোর ঘটনায় শাস্তি পেয়েছিলেন তিনি।
ঘটনাটি দ্রুত ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকটি দেশে সুয়ারেজের মুখ এবং তাঁর উঁচু দাঁতকে লিভার হিসেবে ব্যবহার করে বোতল ওপেনার (বোতলের ছিপি খোলার যন্ত্র) তৈরি করা হয়। সুইডেনে সেক্স টয় শপ বাজারে আনে ‘সুয়ারেজ নিপল ক্ল্যাম্পস’।

এমনকি মজার এক ঘটনার খোঁজ পাওয়া যায় বেটিং দুনিয়া থেকেই। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ২০টি দেশের ১৬৭ জন মানুষ ‘বেটসেফ’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাজি ধরেছিলেন যে এই উরুগুয়ান স্ট্রাইকার প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়কে আক্রমণ করতে তাঁর দাঁত ব্যবহার করবেন। বাজিতে বিজয়ীরা ১৭৫ গুণ লাভ পান।

স্পেনের বিশ্বজয়ের আসরে ভুভুজেলা আর জ্যোতিষ অক্টোপাসের দাপট

প্রেস অফিসারের লাল কার্ড

লাল কার্ড সাধারণত খেলোয়াড়, কোচ কিংবা দলের বেঞ্চে থাকা কর্মকর্তারা দেখে থাকেন। কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-চিলি ম্যাচে লাল কার্ড দেখেছিলেন একজন প্রেস অফিসার!

শেষ ষোলোর সেই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথে ব্রাজিলের ফ্রেড ও চিলির গ্যারি মেদেলের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। মুহূর্তেই তা ধাক্কাধাক্কি আর হাতাহাতির রূপ নেয়। দুই দলের খেলোয়াড়েরা যখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) প্রেস অফিসার রদ্রিগো পাইভাও ঘটনাস্থলে ঢুকে পড়েন। সমস্যা হলো শান্তি ফেরানোর বদলে তিনি নাকি এক চিলিয়ান খেলোয়াড়ের মুখেই ঘুষি বসিয়ে দেন!

ঘটনাটি ম্যাচ কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি। ইংলিশ রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব সঙ্গে সঙ্গেই পাইভাকে লাল কার্ড দেখান। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত বহিষ্কারের একটির জন্ম হয়—একজন প্রেস অফিসার মাঠ ছাড়ছেন লাল কার্ড দেখে!
পরে ফিফা তাঁকে নিষিদ্ধ করে এবং জরিমানাও করে। তবে সবচেয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত আসে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান থেকেই। সিবিএফ আর কোনো অপেক্ষা না করে তাঁকে চাকরি থেকেই বিদায় করে দেয়। বিশ্বকাপে অনেকেই স্বপ্নভঙ্গের শিকার হন, কিন্তু প্রেস অফিসার হিসেবে এসে লাল কার্ড দেখে চাকরি হারানোর ঘটনা হয়তো এটাই প্রথম।

২০১৪ বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের জন্য কান্নার

একই পাথরে দুবার হোঁচট

১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিল-উরুগুয়ে ম্যাচের একটি টিকিট জোগাড় করতে জোয়েদির বেলমন্তকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। কিন্তু ম্যাচের দিন অসুস্থ মায়ের পাশে থাকার জন্য তিনি স্টেডিয়ামে যাননি। সেই না-ব্যবহৃত টিকিটটি তিনি যত্ন করে রেখে দেন—এক দিন, দুই দিন নয়, টানা ৬৪ বছর।

২০১৪ বিশ্বকাপের আগে তিনি ফিফাকে প্রস্তাব দেন, ১৯৫০ সালের সেই ঐতিহাসিক টিকিটটি তিনি ফুটবল জাদুঘরে দান করবেন। বিনিময়ে তাঁকে যেন ২০১৪ ফাইনালের দুটি টিকিট দেওয়া হয়। ফিফাও রাজি হয়ে যায়। একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে দুটি টিকিট তুলে দেওয়া হয়। ৮৫ বছর বয়সী বেলমন্ত অবশেষে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার স্বপ্ন পূরণের খুব কাছে পৌঁছে যান। কিন্তু ভাগ্য যেন তাঁর সঙ্গে এক অদ্ভুত খেলাই খেলছিল। টিকিট হাতে নিয়ে অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি দুটি টিকিটই হারিয়ে ফেলেন।

এশিয়ায় বিশ্বকাপ, রোনালদোর পাপমোচন এবং ব্রাজিলের ‘পেন্টা’

Read full story at source