হীরকজয়ন্তীতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা, হাসি-আড্ডায় আবেগে ভরা একদিন

· Prothom Alo

শনিবার সকাল ৯টা। গ্রীষ্মের আকাশে কখনো রোদ, কখনো মেঘের ঘনঘটা। মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি নামবে। তবে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা কমাতে পারেনি উৎসবের আমেজ। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মান্দারগাঁও উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তখন নানা বয়সী মানুষ। কারও চুলে পাক ধরেছে, কেউবা সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়–জীবন পার করে চাকরিতে ঢুকেছেন। সবার একটাই পরিচয়—এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

Visit amunra.help for more information.

নিজেদের প্রাণের বিদ্যাপীঠের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হীরকজয়ন্তী ও প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান যেন এক দিনের জন্য ফিরিয়ে এনেছিল বহু বছরের পুরোনো দিনগুলোকে। বিদ্যালয়ের মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, বারান্দা আর পুরোনো গাছগুলোর নিচে দিনভর জমে ওঠে স্মৃতি, হাসি, আবেগ আর ভালোবাসার মিলনমেলা।

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মান্দারগাঁও উচ্চবিদ্যালয় দীর্ঘ ছয় দশক ধরে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০০ প্রাক্তন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের সবার গায়ে ছিল রঙিন টি-শার্ট আর গলায় পরিচয়পত্র। কেউ ব্যস্ত পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পেতে। কেউবা আবার মোবাইল ফোনে স্মৃতি ধরে রাখছেন।

সকাল সাড়ে ১০টায় কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মূল আয়োজন শুরু হয়। আলোচনা সভা, গুণীজনদের স্মৃতিচারণা এবং প্রাক্তন শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সম্মাননা দেওয়া হয় এ পর্বে। অনেক শিক্ষককে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাবেক শিক্ষার্থীরা। কেউ গিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন প্রিয় শিক্ষককে। কেউবা মাথায় হাত রেখে দোয়া নিয়েছেন।

মধ্যাহ্নভোজ শেষে বেলা আড়াইটায় শুরু হয় ব্যাচভিত্তিক স্মৃতিচারণা। প্রতিটি ব্যাচের প্রতিনিধি উঠে আসেন মঞ্চে। কেউ বলছিলেন ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার গল্প, কেউবা শিক্ষকদের শাসনের কথা। আবার কেউ স্মরণ করছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দুরন্ত কৈশোরের দিনগুলো। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

১৯৯৭ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক দিন পর বন্ধুদের কাছে পেলাম। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই যেন এক পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি। বয়স বাড়লেও ভেতরের স্কুলপড়ুয়া মনটা আজ আবার জেগে উঠেছে। মনে হচ্ছিল, সময়টা যদি আরেকবার ফিরে পেতাম।’

২০০৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী চিকিৎসক লালন মিয়া হীরকজয়ন্তী উদ্‌যাপন কমিটির সদস্যসচিব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ আয়োজন আমাদের শিকড়ে ফেরার উপলক্ষ। আমরা যারা এই বিদ্যালয়ে পড়েছি, সবার হৃদয়ে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা ভালোবাসা আছে। আজকে সবাইকে একসঙ্গে দেখে মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই কৈশোরের দিনগুলোয় ফিরে গেছি। এই সফল আয়োজনের পেছনে সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল।’

উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ১৯৯১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সময় বিদ্যালয়ে ভাঙাচোরা টিনের ঘর ছিল। তখন এমন দালান, এত সুন্দর পরিবেশ কল্পনাও করতে পারিনি। আজকে এসে খুব ভালো লাগছে। বন্ধুদের কাছে পেয়ে যেন পুরোনো দিনে হারিয়ে গেছি।’

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মান্দারগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের হীরকজয়ন্তী উদযাপন। শনিবার তোলা

সরেজমিন দেখা গেল, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে আড্ডা দিচ্ছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কেউ পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন, আবার কেউ গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠেছেন পুরোনো দিনের গান। অনেকেই পরিবার নিয়ে এসেছেন। সন্তানদের দেখিয়ে দিচ্ছেন, ‘এই কক্ষে আমরা ক্লাস করতাম’, ‘এই মাঠে খেলতাম।’

২০০৮ ব্যাচের তারেক হাসান ও আবু তালেব বলেন, ‘বন্ধুদের কাছে পেয়ে আজ স্কুলজীবনের সময়টাতে ফিরে গেছি। কী যে ভালো লেগেছে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সারা দিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ছিলাম। অনেক বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ ১৮ বছর পর আজ আবার দেখা হলো। আমরা আবেগাপ্লুত।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষক দিলীপ কুমার শীল বলেন, ‘শিক্ষকজীবনে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি। আজ তাঁদের সফল মানুষ হিসেবে ফিরে আসতে দেখে খুব ভালো লাগছে। সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো তারা তাদের বিদ্যালয়কে ভুলে যায়নি। এই ভালোবাসাই একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় অর্জন।’

বিকেলে অনুষ্ঠানে যোগ দেন কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম। তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পড়ালেখার জায়গা নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গঠনের স্থান। মান্দারগাঁও উচ্চবিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এমন মিলনমেলা সত্যিই প্রশংসনীয়।

বিকেলে র‌্যাফল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিজস্ব পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় শেষ হয় দিনব্যাপী আয়োজন। হীরকজয়ন্তী ও পুনর্মিলনী উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় ‘নীড়ে ফেরা’ নামে একটি স্মরণিকা।

Read full story at source