চ্যাটবটের আর্থিক পরামর্শ মানার আগে যেসব বিষয় ভাবা উচিত

· Prothom Alo

বর্তমানে দৈনন্দিন প্রয়োজন থেকে শুরু করে আর্থিক পরামর্শের জন্যও আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। তবে এই প্রযুক্তির দেওয়া তথ্যে ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকায় সব সময় সতর্ক থাকা জরুরি। চ্যাটবটের পরামর্শ অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে এর সত্যতা ও যুক্তিগুলো যাচাই করে নেওয়া উচিত।

অনেকেই এখন মাসিক বেতন, বিদ্যুৎ-পানির বিল ও নিয়মিত খরচের হিসাব চ্যাটজিপিটিকে দিয়ে নিজের বাজেট তৈরি করে নিচ্ছেন। এআইয়ের তৈরি করে দেওয়া সেই তালিকাটি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছুটা ঠিকঠাক করে নিলেই খরচে সাশ্রয় করা সম্ভব। চ্যাটজিপিটি ছাড়াও জেমিনি বা ক্লডের মতো চ্যাটবটগুলোর ওপর আর্থিক পরামর্শের জন্য মানুষের এই নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে।

Visit newsbetting.cv for more information.

ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র নিকো ফেলিক্স এ বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য জানিয়েছেন। বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ বাজেট তৈরি করা বা ঋণের হিসাব বোঝার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। জটিল সব আর্থিক বিষয় সহজে বোঝার জন্য এটি অবশ্যই একটি সহায়ক টুল। তবে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, চ্যাটবট কোনোভাবেই একজন পেশাদার আর্থিক বিশেষজ্ঞের বিকল্প হতে পারে না।

এমনকি চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের শর্তাবলিতেও স্পষ্ট বলা আছে, এটি পেশাদার আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি। তাই চ্যাটবটকে একজন সহকারী হিসেবে ভাবলেও এর সীমাবদ্ধতাগুলো ভুলে গেলে চলবে না। ভুল হিসাব ছাড়াও আর্থিক বিষয়ে যে ৫ কারণে চ্যাটবট ব্যবহারের আগে দুবার ভাববেন, চলুন জেনে নিই।

চ্যাটবট কেন বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে তথ্য দেয়
বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ বাজেট তৈরি করা বা ঋণের হিসাব বোঝার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। জটিল সব আর্থিক বিষয় সহজে বোঝার জন্য এটি অবশ্যই একটি সহায়ক টুল।

১. এআইয়ের ভুল যখন নিখুঁত মনে হয়

চ্যাটজিপিটি বা এ ধরনের চ্যাটবটগুলো যখন কোনো আর্থিক পরামর্শ দেয়, তখন তা পড়ে খুব আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় ভুল তথ্যকেও এমনভাবে উপস্থাপন করে যে তা চট করে ধরার উপায় থাকে না। ওপেনএআই তাদের নতুন সংস্করণে ভুলের পরিমাণ কমিয়ে আনলেও বড় ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীকান্ত জগবথুলা মনে করেন, এগুলো মূলত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে চলা যন্ত্র। তাই মানুষের মতো সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা এদের নেই। অনেক সময় চ্যাটবটকে এর দেওয়া তথ্য পুনরায় যাচাই করতে বললে সে নিজেই নিজের ভুল বের করে ফেলে, যা প্রমাণ করে যে টাকার হিসাব বা যেকোনো জরুরি বিষয়ে এদের ওপর অন্ধভাবে ভরসা করা বিপজ্জনক।

২. এআই যখন আপনার সব কথায় সায় দেয়

সাধারণত আপনি যখন কোনো বিশেষজ্ঞ মানুষের কাছে আর্থিক পরামর্শের জন্য যান, তিনি আপনাকে অনেক সময় সোজাসুজি ভুল ধরিয়ে দেন। আপনার টাকা জমানো বা খরচের কোনো ধারণা ভুল হলে তিনি তা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলেন। কিন্তু চ্যাটবটগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো, এরা ব্যবহারকারীর সব কথায় খুব সহজেই রাজি হয়ে যায়। ব্যবহারকারীর মনের মতো কথা বলে তাঁকে খুশি করার একধরনের প্রবণতা এদের মধ্যে দেখা যায়।

চলতি বছর সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের মধ্যে ব্যবহারকারীকে খুশি করার বা অতিরিক্ত প্রশংসা করার একটি প্রবণতা রয়েছে। এই স্বভাবের কারণে ব্যবহারকারী নিজের ভুলগুলো আর সহজে ধরতে পারেন না। বিশেষ করে আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চ্যাটবট যদি ভুল ধারণাগুলোকেও ভালো বলে সমর্থন দেয়, তবে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। মানুষ সাধারণত নিজের চেয়ে অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ আশা করেন। কিন্তু চ্যাটবট যদি সব সময় হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মিলিয়ে চলে, তবে সেই পরামর্শ শেষ পর্যন্ত বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এআই প্রায় অর্ধেক সময় ভুল স্বাস্থ্য পরামর্শ দেয়, নতুন গবেষণা
চ্যাটবটগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো, এরা ব্যবহারকারীর সব কথায় খুব সহজেই রাজি হয়ে যায়। ব্যবহারকারীর মনের মতো কথা বলে তাঁকে খুশি করার একধরনের প্রবণতা এদের মধ্যে দেখা যায়।

৩. ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও এআইয়ের ঝুঁকি

চ্যাটবটগুলো থেকে একদম সঠিক উত্তর পেতে হলে অনেক সময় ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়। অনেকে আর্থিক পরামর্শ পেতে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা খরচের হিসাবের মতো ব্যক্তিগত তথ্য সেখানে আপলোড করেন।

বেশি তথ্য দিলে এআই আপনার খরচের ধরন হয়তো ভালো বুঝতে পারবে। কিন্তু সাধারণ কোনো চ্যাটবটে এমন সংবেদনশীল তথ্য দেওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, সেটিংস পরিবর্তন না করলে আপনার দেওয়া এসব ব্যক্তিগত তথ্য এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। মনে রাখা জরুরি, এই চ্যাটবটগুলো ব্যাংক বা স্বীকৃত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো নিরাপদ নয়।

৪. ভুল পরামর্শের দায় নেবে কে

চ্যাটজিপিটির মতো টুলগুলো কর কমানোর উপায় বা বিনিয়োগের নতুন ধারণা খোঁজার জন্য বেশ ভালো। কিন্তু টাকার বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কোনো পরিকল্পনা তৈরি করার পর তা বাস্তবে কাজে লাগানোর আগে একজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে সেটি যাচাই করে নেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, সেই বিশেষজ্ঞ আপনার অবস্থা বুঝে পরিকল্পনাটি বদলে দিতে পারেন বা ভুল থাকলে তা ঠিক করে দিতে পারেন।

এখানে একটি বড় আইনি দিকও আছে। আপনি যখন কোনো অনুমোদিত আর্থিক বিশেষজ্ঞের কাছে যান, তিনি আইনত আপনার স্বার্থ রক্ষা করতে বাধ্য থাকেন। যদি তিনি আপনাকে ভুল বুঝিয়ে প্রতারণা করেন বা নিয়ম ভাঙেন, তবে তাঁকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য এমন অনেক কড়া নিয়ম আছে। কিন্তু চ্যাটবটের ক্ষেত্রে এমন কোনো নৈতিকতা বা জবাবদিহির জায়গা নেই। তারা ভুল পরামর্শ দিয়ে আপনার বড় কোনো ক্ষতি করে ফেললেও এদের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই।

এআই হাইপ, ভবিষ্যদ্বাণী ও অদৃশ্য প্রতারণার রাজনীতি
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো আর্থিক বিশেষজ্ঞ জানতে পারেন তাঁর গ্রাহক এআইয়ের কাছ থেকেও পরামর্শ নিচ্ছেন, তখন সেই গ্রাহকের প্রতি তাঁর কাজের আগ্রহ কমে যায়।

৫. এআই যখন মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিদ্বন্দ্বী

আপনি কি আপনার আর্থিক বিশেষজ্ঞের দেওয়া পরামর্শগুলো চ্যাটজিপিটি দিয়ে যাচাই করার কথা ভাবছেন? তবে সাবধান, এটি আপনার ও বিশেষজ্ঞের সম্পর্কের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কম্পিউটারস ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নালে এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো আর্থিক বিশেষজ্ঞ জানতে পারেন তাঁর গ্রাহক এআইয়ের কাছ থেকেও পরামর্শ নিচ্ছেন, তখন সেই গ্রাহকের প্রতি তাঁর কাজের আগ্রহ কমে যায়। এমনকি গ্রাহক যদি শুধু বাড়তি তথ্যের জন্য এআই ব্যবহার করেন, তবুও এই প্রভাব দেখা দেয়।

গবেষকেরা মনে করেন, একজন বিশেষজ্ঞ মানুষ যখন তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে কাউকে পরামর্শ দেন, আর সেই পরামর্শ যখন একটি চ্যাটবট দিয়ে যাচাই করা হয়, তখন ওই বিশেষজ্ঞ নিজেকে অপমানিত বোধ করতে পারেন। তাঁদের মনে হতে পারে, গ্রাহক তাঁদের জ্ঞানের চেয়ে একটি যন্ত্রের ওপর বেশি ভরসা করছেন।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: ওয়্যার্ড ডটকমএআই কি কখনো মানুষের চেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে পারবে

Read full story at source