বিদেশের মাটিতে কোম্পানি কিনছে ভারতের কোম্পানিগুলো, দেশে জমছে না ব্যবসা

· Prothom Alo

এপ্রিলের শেষ দিকে ভারতের সান ফার্মাসিউটিক্যালস নিউইয়র্কের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত জৈব প্রযুক্তিভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি অর্গানন অ্যান্ড কোম্পানি অধিগ্রহণে সম্মত হয়। সে জন্য তারা ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়।

বিষয়টি হলো, প্রায় দুই দশকের মধ্যে আর কোনো ভারতীয় কোম্পানি বিদেশের মাটিতে এত অর্থ ব্যয় করে অন্য কোনো কোম্পানি অধিগ্রহণ করেনি। সম্প্রতি এই প্রবণতা বেড়েছে। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর একের পর এক বড় বড় আন্তর্জাতিক চুক্তি করছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই চুক্তি হলো।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

এর মধ্যে টাটা মোটরস একাধিক বিদেশি কোম্পানি কিনেছে। এর মধ্যে আছে তুরিনভিত্তিক যানবাহন কোম্পানি আইভেকো; এই কোম্পানিকে ৪৪০ কোটি ডলারে কিনেছে টাটা মোটরস। সেই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি কোফোর্জের সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এনকোরাকে ২৩৫ কোটি ডলারে কিনেছে টাটা মোটরস। এ ছাড়া ২০২৫ সালের শুরুতে বিমা খাতের মহুরিহ কোম্পানি অ্যালিয়ান্‌জ এসইর ২৩ শতাংশ শেয়ার কিনেছে তারা।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট থর্নটনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৬২টি ভারতীয় কোম্পানি বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণে ১৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে—আগের বছরের তুলনায় যা ৩৪ শতাংশ বেশি।

গ্রান্ট থর্নটনের অংশীদার সুমিত আব্রোল বিবিসিকে বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশি কোম্পানি অধিগ্রহণের পরিমাণ অঙ্কের দিক থেকে ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।

অনেকের মতে, ভারতের কোম্পানিগুলোর এই বিদেশি কোম্পানি অধিগ্রহণের নতুন ঢেউ দুই দশক আগে টাটা গ্রুপের নেতৃত্বে যে বৈশ্বিক অধিগ্রহণের ধারা শুরু হয়েছিল, সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তখন তারা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার ও করাস স্টিলের মতো কোম্পানি কিনে বড় বাজি ধরেছিল।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বিবিসিকে বলেছেন, এবারকার উদ্দেশ্য কিছুটা ভিন্ন। ভারতীয় কোম্পানিগুলো পশ্চিমা সম্পদ কিনছে শুধু বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত কারণে ও প্রয়োজনে।

অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতও ওই সময়ের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। তখন ভারতের শেয়ারবাজার ছিল উঠতি–শক্তিশালী বাজার। কিন্তু এখন দেশটির শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সরে যাচ্ছেন। কমে যাচ্ছে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। এ ছাড়া করছাড় ও উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা সত্ত্বেও বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে।

ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন সম্প্রতি এক নীতি সম্মেলনে বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির মুনাফা বছরে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবু বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় মূলধন গঠিত হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বারবার দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশে সম্প্রসারণের এই প্রবণতা দেখে বোঝা যায়, দেশের ব্যবসা পরিবেশ নিয়ে তারা অসন্তুষ্ট। তারা মনে করছে, বিদেশের মাটিতে ব্যবসায় অধিকতর বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।

মারসেলাস ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের সৌরভ মুখার্জিয়া বলেন, ‘ভারতীয় অর্থ বিদেশে যাচ্ছে। আমাদের পোর্টফোলিওর অনেক কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন কারখানা করছে। সুবিধা হলো, সেখানে শিল্পের জন্য জমি প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে সেখানে কার্যকর মূলধন পাওয়া তুলনামূলক সহজ।’

এই প্রবণতা কেবল বড় করপোরেটেই সীমিত নয়। সান ফার্মার বড় চুক্তি কিংবা শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউনসভিলে বিপুল অঙ্কের তেল শোধনাগার প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে—এসব নিয়ে আলোচনা আছে। বাস্তবতা হলো, আরও অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান একই পথে এগোচ্ছে।

তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ট্র্যাক্সনের সহপ্রতিষ্ঠাতা নেহা সিং বলেন, কোম্পানিগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি ভালো। বৈশ্বিক অর্থায়ন পাওয়াও সহজ—সে কারণে এই সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া গতি পাচ্ছে।

নেহা সিংয়ের মতে, বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারতীয় কোম্পানিগুলো এখন বাজার, ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নয়ন, বৈশ্বিক বিতরণ নেটওয়ার্ক—এসবই একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা করছে। দেশের মাটিতে এসব কিছু গড়ে তুলতে অনেক সময় লাগত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভূরাজনৈতিক চাপ ও শুল্কনীতির জটিলতায় পড়েছে। সে কারণে ঝুঁকি কমাতে ভারতীয় কোম্পানিগুলো দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে সব চুক্তিই সফল হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, করাস স্টিল অধিগ্রহণের পর টাটা স্টিল দীর্ঘ সময় ধরে বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়েছিল। বিশ্লেষকদের আরও পর্যবেক্ষণ, বড় অঙ্কের এসব লেনদেনে এখনো নগদ অর্থের ব্যবহারই বেশি, শেয়ারভিত্তিক বিনিময় তুলনামূলক কম—এতে আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। সান ফার্মার সাম্প্রতিক অধিগ্রহণও সম্পূর্ণ নগদে সম্পন্ন হয়েছে।

এই প্রবণতা থামবে, এমন ইঙ্গিত নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তাতে এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে ভারতের নতুন প্রজন্মের করপোরেট নেতৃত্ব মূলত বিদেশে পড়াশোনা করে আসা; অর্থাৎ তাদের বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা আছে। এই বিষয়ও এই প্রক্রিয়ার পালে হাওয়া দিচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে ডলারের বিপরীতে রুপির ধারাবাহিক দরপতন হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বিনিয়োগ ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে এই বিদেশমুখী প্রবণতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। যদিও স্বল্প মেয়াদে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এর গতি কিছুটা কমে যেতে পারে।

Read full story at source