ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: চার ঢেউয়ে কাঁপবে বিশ্ব অর্থনীতি
· Prothom Alo

ধরা যাক, আগামীকালই ইরান, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল শান্তিচুক্তি করল, হরমুজ প্রণালিও খুলে গেল। তাতেই কি সব শেষ? না, আসলে তাতে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয় না। কারণ, যুদ্ধ শুধু গুলি বা মিসাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, জিনিসপত্রের দাম, দেশের অর্থনীতি আর রাজনীতিতে যে বড় ধাক্কা লাগে, সেই প্রভাব অনেক দিন ধরে চলতে থাকে। এসব প্রভাব পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের আসল প্রভাব শেষ হয় না।
Visit newssport.cv for more information.
ইতিহাসও তা–ই বলে। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রভাব কয়েক দশক ধরে চলেছিল। ইরাকের তেল উৎপাদন যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। এমনকি জাতিসংঘের নির্দেশে কুয়েতকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে ইরাকের সময় লেগেছে ২০২২ সাল পর্যন্ত। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ২০২২ সালে দেখা গেলেও তার প্রভাব এখনো বিশ্বের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে এবং যুদ্ধ শেষ হলেও তা চলতে থাকবে।
ইরান যুদ্ধও এখনই তার খরচ দেখাতে শুরু করেছে। আর এই খরচ দেবে সেসব দেশ, যাদের এই যুদ্ধের সূচনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। এ প্রভাব চারটি বড় ঢেউয়ের মতো বিশ্ব অর্থনীতিকে আঘাত করবে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়বে এমন সব দেশে, যেখানে আগেই রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে, অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল আর মানুষ একের পর এক সংকটে ক্লান্ত। ফলে কিছু সরকার এই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে এ অস্থিরতাকে দেখা হবে সংশ্লিষ্ট দেশের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে, যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব হিসেবে নয়।
প্রথম ঢেউটি সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। তেলের দাম বাড়ে, তার সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বাড়ে, পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে তখন ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি’ নিয়েই আলোচনা হয়, যেন এটাই প্রধান সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল শুরু। জ্বালানি প্রায় সব পণ্যের উৎপাদনের মূল উপাদান। ফলে এর দাম বাড়লে একের পর এক জিনিসের দাম বাড়ে। যেমন সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নির্ভর করে গ্যাসের ওপর। তাই গ্যাসের দাম বাড়লে কয়েক মাসের মধ্যেই সারের দাম বেড়ে যায়।
এর ফলে দুই মৌসুমের মধ্যেই খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ে। অর্থাৎ উপসাগরের একটি জলপথে শুরু হওয়া ধাক্কা শেষ পর্যন্ত কায়রোর রুটির দাম, ঢাকার চালের বাজার কিংবা কেনিয়ার কৃষকের সারের জোগানে এসে পৌঁছায়।
দ্বিতীয় ঢেউটি অনেক কম আলোচিত, কিন্তু আরও গভীর। এটি বাণিজ্যব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন। একবার সংকটের সময় যে পরিবর্তন হয়, তা পরে আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
ইরান ঘিরে বৈশ্বিক বিপর্যয় কি অনিবার্যতৃতীয় ঢেউটি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। উন্নত দেশগুলো এ ধরনের ধাক্কা সামাল দেয় অর্থনৈতিক সুরক্ষা, শক্তিশালী মুদ্রা ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলো আমদানি কমাতে, মুদ্রার অবমূল্যায়ন মেনে নিতে, সারের ব্যবহার কমাতে এবং খাদ্যসংকটে পড়তে বাধ্য হয়। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় পরিবারের মোট ব্যয়ের ৪৪ শতাংশই খাদ্যে খরচ হয়, যেখানে উন্নত দেশে তা হয় মাত্র ১৬ শতাংশ।
চতুর্থ ঢেউটি রাজনৈতিক। সরবরাহব্যবস্থার এই ধাক্কা শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, সমাজ ও রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে। আরব বসন্তের পেছনে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির বড় ভূমিকা ছিল। শ্রীলঙ্কার সরকারের পতন ঘটেছিল মহামারির সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট মিলিয়ে। পাকিস্তানের ২০২২-২৩ সালের অস্থিরতার পেছনেও ছিল বৈদেশিক মুদ্রাসংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়বে এমন সব দেশে, যেখানে আগেই রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে, অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল আর মানুষ একের পর এক সংকটে ক্লান্ত। ফলে কিছু সরকার এই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে এ অস্থিরতাকে দেখা হবে সংশ্লিষ্ট দেশের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে, যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব হিসেবে নয়।
এ পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ দরকার। আঞ্চলিক পর্যায়ে খাদ্য ও সার মজুত রাখা যেতে পারে, যাতে অন্তত ১২ মাসের আমদানি সংকট মোকাবিলা করা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যুদ্ধজনিত ঝুঁকির বিমাব্যবস্থাও গড়ে তোলা দরকার। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নীতিতে পরিবর্তন আনা। বর্তমানে তারা যুদ্ধজনিত ধাক্কাকেও সংশ্লিষ্ট দেশের নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, যা বাস্তবে সঠিক নয়।
উমাইর ওয়াকাস ওমানের ধোফার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ও লজিস্টিকসের সহকারী অধ্যাপক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ