বার্লিনে বিশ্বসংস্কৃতির ‘মহামিছিল’, নজর কাড়লেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা
· Prothom Alo

জার্মানির বার্লিনের রাস্তায় এত মানুষের ঢল সচরাচর দেখা যায় না। আন্তসংস্কৃতি উৎসব উপলক্ষে ২৪ মে (রোববার) বার্লিনের রাজপথে নানা জাতি-সংস্কৃতির লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। ঝকঝকে রৌদ্রময় দিনটিতে বার্লিনে যেন বিশ্বসংস্কৃতির মহামিছিল নেমেছিল। আর এ উৎসবে বরাবরের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন। নিজস্ব সংস্কৃতির রঙিন পোশাক আর নাচে-গানে তাঁরা বার্লিনের রাস্তা মাতিয়ে তোলেন। সবার নজর কাড়েন। কুড়ান বিপুল করতালি।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
জার্মান ভাষায় এ উৎসবের পোশাকি নাম ‘কার্নিভ্যাল ডের কুলটুর’। এবার এ উৎসবের ৩০ বছর পূর্তি হলো। জার্মানিতে বর্ণবাদ-জাতিবৈষম্য, বিশেষ করে এখানে বসবাসরত অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ১৯৯৬ সালে শুরু হয়েছিল এই ‘কার্নিভ্যাল’।
শুরুতে উৎসবটি ছিল ‘প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ’। সেই ‘প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ’ এখন বিশ্বসংস্কৃতির মহামিছিলে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রতীকী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি; বরং তা বেড়েছে। জার্মানি তথা ইউরোপে অভিবাসীবিরোধী জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থীদের রুখতে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উৎসব উপলক্ষে গতকাল বার্লিন শহরের প্রাণকেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্ট অ্যাভিনিউ থেকে কার্ল মার্ক্স অ্যাভিনিউ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে বিশ্বসংস্কৃতির মেলা বসেছিল। বার্লিনের টাগেস স্পিগেল পত্রিকা বলছে, এদিন রাস্তার দুই পাশে প্রায় আট লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল।
বার্লিনের রাজপথে রঙিন পোশাকে প্রবাসী বাংলাদেশি নারী-পুরুষেরাবার্লিনে জড়ো হওয়া লাখো মানুষ বর্ণবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ, জাতিবৈষম্য, সাম্প্রদিয়কতা, অভিবাসীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হন। পাশাপাশি তাঁরা তুলে ধরেন নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি।
বিশ্বসংস্কৃতির এই মিলনমেলায় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের বর্ণাঢ্য পোশাক, গানবাজনা আর নৃত্যের তালে তালে বার্লিন হয়ে ওঠে ছন্দময়, বর্ণিল।
উৎসবে ‘বাংলার উঠান’-এর শোভাযাত্রাবিগত বছরগুলোর মতো এবারও বার্লিনের বেঙ্গলিশে কুলটর ফোরামের উদ্যোগে এ উৎসবে শরিক হয়েছিলেন জার্মানপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। নারীরা লাল শাড়ি, কপালে টিপ, খোঁপায় রঙিন ফুল ও দেশীয় অলংকার পরে উৎসবে অংশ নেন। পুরুষেরা পরেন লুঙ্গি, ফতুয়া। মাথায় বাঁধেন গামছা। তাঁরা জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক, আধুনিক, লোকগীতির সঙ্গে নেচেগেয়ে বার্লিনের রাস্তা মাতিয়ে তোলেন। তাঁরা যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন রাস্তার দুই পাশের মানুষ করতালি দিয়ে, উল্লাস-উচ্ছ্বাসে তাঁদের অভিনন্দন জানান।
বার্লিনের বেঙ্গলিশে কুলটর ফোরাম বলছে, এবারের উৎসবে তাদের উপস্থাপিত বিষয়ের প্রতিপাদ্য ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। তারা ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদিয়কতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের, বাঙালির দৃঢ় অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। প্রতিবছরই এ উৎসবে প্রবাসীদের অংশগ্রহণের পরিসর বাড়ছে। বাড়ছে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জৌলুশ।
নেচেগেয়ে উৎসব মাতিয়ে তোলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাউৎসব উপলক্ষে আগের দিন শনিবার বার্লিনে ‘বাংলার উঠান’ নামে একটি সংগঠনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ছিল। এতে বর্ণিল পোশাকে শিশু-কিশোরেরা অংশ নেয়।
২০০২ সাল থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বার্লিনের এ উৎসবের সহযাত্রী।
বিশ্বসংস্কৃতির এ উৎসবের উদ্যোক্তারা জানান, জার্মানিতে প্রায় এক কোটি অভিবাসী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে এ উৎসব। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ, জাতিবিদ্বেষ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, অভিবাসীবিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে এমন সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে নানা জাতি-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষ বার্লিনের রাস্তপথে সমবেত হয়ে অপশক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান, ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন।